শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোরে মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান কর্মসূচি
অনুসন্ধান : পেছনের গল্প
আসাদ আসাদুজ্জামান :
Published : Wednesday, 5 December, 2018 at 2:01 AM
অনুসন্ধান : পেছনের গল্পটেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (সাসটেইনঅ্যাবল ডেভেলপমেন্ট গোলস্) অর্জনের ক্ষেত্রে মা ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাসের জন্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান কর্মসূচি। পল্লী অঞ্চলের দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তাদের দুঃখ, দুর্দশা লাঘব, মা ও শিশু মৃত্যুহার  হ্রাস, মা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন করার উদ্দেশ্যে এবং সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রত্যাশায় সরকার মাতৃত্বকাল ভাতার প্রতি গুরুত্বারোপ করে।
২০০৫ সালে এ কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। প্রথম অবস্থায় বেসরকারি সংস্থা ড্রপের উদ্যোগে পাইলট আকারে অতি দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান কর্মসূচি শুরু হয়। এতে সাফল্য পাওয়ায় ২০০৭-২০০৮ অর্থ বছরে রাজস্বখাত হতে সরকারিভাবে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে কর্মসূচি বাস্তবায়ন হচ্ছে। সেই থেকে এ কর্মসূচির নামকরণ করা হয় “দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান” কর্মসূচি। রাজস্বখাত হতে ২০০৭-২০০৮ অর্থ বছরে ১৭ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে দেশের ৩ হাজারটি ইউনিয়নের প্রতিটিতে ১৫জন করে ৪৫ হাজার মাকে ৩শ’ টাকা করে ভাতা প্রদানের মাধ্যমে সূচনা হয় কর্মসূচিটির। ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে করা হয় ৫শ’ টাকা। এ অর্থবছরে সমগ্র দেশের ৪ হাজার ৫শ’ ৪৭ টি ইউনিয়নের ২ লাখ ২০ হাজার ভাতাভোগীকে ১শ’ ৩২ কোটি টাকা মাতৃত্বকাল ভাতা প্রদান করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বরাদ্দ দেয়া হয় ১শ’ ৬৯কোটি ৪০ লাখ টাকা। যা বিতরণ করা হয় ৬৪টি জেলার ৪শ’ ৮৮টি উপজেলার অন্তর্গত ৪ হাজার ৫শ’ ৪৭ টি ইউনিয়নের ২ লাখ ৬৪ হাজার ভাতাভোগীর মাঝে।
জনগণের কল্যাণে সরকারের এ মহতী উদ্যোগ তৃণমূল পর্যায়ের একশ্রেণীর মানুষ অনেকক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হতে দেয় না বলে অভিযোগ ওঠে। যশোরে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অহরহ ঘটেছে অনিয়ম,স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি।
দৈনিক গ্রামের কাগজ দপ্তরে এ প্রকল্পের যশোর জেলার কর্মকা- নিয়ে আসতে থাকে নানা অভিযোগ। এক পর্যায়ে এমন ধারণা বদ্ধমূল হতে থাকে যে, সত্যিই এই প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে জেলার সুবিধাভোগীদের মধ্যে ব্যাপক অনুসন্ধান ও জরিপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামের কাগজ। গুণগত মান বজায় রেখে জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা এবং মানসম্পন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরীতে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া হয়। গঠন করা হয় আটটি অনুসন্ধান টিম। টানা ১০ মাস ধরে এসব টিম ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েছে।
জেলার আটটি উপজেলায় যে সাত হাজার চারশ’ ৫৯ জন নারী মাতৃত্বকালীন ভাতা পেয়ে থাকেন, তাদের মধ্যে থেকে জরিপ পরিচালনার আন্তর্জাতিক মানদ- মেনে প্রতিটি উপজেলা থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও সবশেষে সুবিধাভোগী বাছাই করে এই জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা করা হয়। এক্ষেত্রে লিখিত প্রশ্নপত্রে বাছাইকৃত সুবিধাভোগী মায়েদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলায় এক হাজার তিনশ’ ৪৩ জন, অভয়নগরে ছয়শ’ ৩২, বাঘারপাড়ায় সাতশ’ দুই, চৌগাছায় আটশ’ ৬৯, ঝিকরগাছায় নয়শ’ ৭৯, কেশবপুরে আটশ’ ৬৯, শার্শায় আটশ’ ৮০ জন এবং সদর উপজেলায় এক হাজার একশ’ ৮৫ জন মা এই সুবিধা পাচ্ছেন। এদের সকলকেই এই জরিপের ‘টার্গেট গ্রুপ’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এই তদন্তমূলক জরিপে জেলার আটটি উপজেলাকেই অন্তর্ভূক্ত করা হয়, যেগুলো জনসংখ্যা ও আকারের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে সমশ্রেণীভূক্ত হলেও, বাহ্যিকভাবে বৈচিত্রপূর্ণ। শুরুতে নমুনা সংগ্রহে প্রচলিত গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করে জরিপের জন্য তিনশ’ ৮৪ জন সুবিধাভোগী নারীকে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হবে বলে নির্ধারণ করা হয়; যা ‘রাউন্ডেড ফিগার’ হিসেবে চারশ’ হতে পারে। তবে শেষপর্যন্ত সাক্ষাৎদাতার সংখ্যা চারশ’ চারে পৌঁছায়।
এসব সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও গবেষণায় গ্রামের কাগজের মোট ১৬ জন অংশ নেন। তারা হলেন, দেওয়ান মোর্শেদ আলম, রফিকুল ইসলাম, এম আইউব, ফয়সল ইসলাম, উজ্জ্বল বিশ্বাস, এস এম আরিফ, মিনা বিশ্বাস, স্বপ্না দেবনাথ, মোতাহার হোসাইন, নূর ইমাম বাবুল, সাজ্জাদুল কবীর মিটন, আশিকুর রহমান শিমুল, শিমুল ভূঁইয়া, আজিজুর রহমান জিকো, এম.জিহাদ ও আব্দুল্লাহ-আল- ফুয়াদ।
যশোর জেলার ৯৩টি ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ৩২টি ইউনিয়নকে বেঁছে নেয়া হয়। যার প্রতিটি থেকে সুবিধাভোগী নারীকে নমুনা হিসেবে বাছাই করা হয়। প্রত্যেক উপজেলার সুবিধাভোগীর সংখ্যানুপাতে ইউনিয়নের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়। যথাযথভাবে পুরো ইউনিয়নকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্য -পাঁচটি ব্লকে বিভক্ত করা হয়- যার প্রতিটিকে প্রাথমিক নমুনায়ন ইউনিট-পিএসইউ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নমুনায়নের তৃতীয় ও সবশেষ স্তরে প্রতিটি পিএসইউ থেকে সুবিধাভোগী বাছাই করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে অন্তত ১৭ জন করে উত্তরদাতা বাছাই করা হয়, যা নির্ধারণ করা হয় সুবিধাভোগীর সংখ্যানুপাতে। যেমন- ব্লক-২’এ যদি সুবিধাভোগীর সংখ্যা ব্লক-১’এর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ব্লক-২ এর সংগৃহীত নমুনার আকারও বড় করা হয়েছে।
উপযুক্ত মানদ- অনুযায়ী উত্তরদাতাদের সকলেই ছিলেন মাতৃত্বকালীন ভাতা গ্রহণকারী নারী। প্রতিটি পিএসইউতে কিছু আরম্ভস্থল নির্ধারণ করা হয়, সুবিধাভোগী পরিবারের সদস্যদের প্রাপ্তি সাপেক্ষে। প্রত্যাশিত বিরতি দিয়ে উপযুক্ত সুবিধাভোগীর পরিবারের সাথে আবারো যোগাযোগ করা হয়। অনিচ্ছা কিংবা অনুপস্থিতিজনিত কারণে উত্তরদাতা না পাওয়া গেলে সেক্ষেত্রে কাঙ্খিত নমুনা পুনস্থাপন করা হয়েছে কাছাকাছি বসবাসরত সুবিধাভোগীর মাধ্যমে।
প্রত্যেক পরিবার থেকে একজন উত্তরদাতার সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। বাছাইকৃত পরিবারে একাধিক উত্তরদাতা থাকলে, দৈবচয়ন ভিত্তিতে একজনকে বেছে নেয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানটি শেষ করতে প্রায় ১০ মাস সময় লেগেছে গ্রামের কাগজ টিমের। মাঠ পর্যায়ে জরিপ শুরু হয় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে। দুই মাস সময় ধরে গ্রামের কাগজের মোট ১৬ জন প্রতিবেদক আটটি দলে ভাগ হয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নমালার ভিত্তিতে প্রতিটি উপজেলায় ভাতাভোগী মায়ের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে একজন গবেষকের সহায়তা নিয়ে সেই সব প্রশ্নের উত্তরের উপর ভিত্তি করে একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হয়। সেই তথ্য আরো যাচাই-বাছাই এবং সংশোধনের পর জরিপ ফলাফল চূড়ান্ত করা হয়।
সেই জরিপ ফলাফলের উপর ভিত্তি করে গ্রামের কাগজের প্রতিবেদকরা আবারো মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে নামেন। এই পর্যায়ে জরিপে বেরিয়ে আসা অসংগতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণ ও তথ্য-প্রমাণ খোঁজার পাশাপাশি যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের মতামতও সংগ্রহ করেন তারা। একাজে আরো তিন মাস সময় পেরিয়ে যায়। তবে এই সময়ের মধ্যে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে তথ্য ও দলিল সংগ্রহ করা হয়।
দ্বিতীয় দফা অনুসন্ধানের পর বিষয়ভিত্তিক প্রতিবেদন লেখা এবং তা সম্পাদনার কাজ শুরু হয়। প্রতিবেদনের বস্তুনিষ্ঠতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে এই পর্যায়েও দফায় দফায় সংশোধন এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন দেখা দেয়। সব কিছু শেষ করে জরিপ ফলাফলের ওপর ইনফোগ্রাফিক তৈরি এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে করতে নভেম্বর লেগে যায়। যা পড়ে পাঠক বস্তুনিষ্ঠতা পাবে বলে অনুসন্ধানকারীসহ গ্রামের কাগজ পরিবারের বিশ্বাস।একটি কথা বলে রাখা ভালো যে,অনুসন্ধানী এ রিপোর্টটির সকল প্রকার তথ্য উপাত্ত ,প্রমাণাদি গ্রামের কাগজ দপ্তরে সংরক্ষিত আছে। স্থানাভাবে অসংখ্য ছবি আর প্রমাণ চিত্র ছাপানো সম্ভব হয়নি।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft