বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২০
শিক্ষা বার্তা
শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ, অভিভাবক মহলে প্রশংসিত
অ্যাকশনে যবিপ্রবি
এম. আইউব :
Published : Friday, 15 March, 2019 at 6:44 AM
অ্যাকশনে যবিপ্রবিদীর্ঘদিন ধরে বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে শৃঙ্খলায় ফেরানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি)। আর এ কারণে অ্যাকশন শুরু হয়েছে এখানে। যবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ এই অ্যাকশন শুরু করেছেন। ধারাবাহিক অ্যাকশনে ইতোমধ্যে ১৭ শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র। বন্ধ করা হয়েছে সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছিল এটি সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত থাকবে। কর্তৃপক্ষের এ ঘোষণায় অভিভাবকেরা আশায় বুক বেধেছিলেন। তারা খানিকটা নির্ভার হয়েছিলেন তাদের সন্তানদের নিয়ে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলায় সন্তানেরা জড়াবে না বলে আশ্বস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি হয়নি। একটি মহল কৌশলে যবিপ্রবিতে রাজনীতির বিষবাষ্প ঢুকিয়ে দেয়। এরপর খুন হন রিয়াদ নামে প্রতিভাবান এক শিক্ষার্থী। সেই যে বিশৃঙ্খল অবস্থা শুরু হয় তা দিন দিন বেড়েছে বৈ কমেনি।
সর্বশেষ ক্যাম্পাসে র‌্যাগিং সংক্রান্ত ব্যানার নামানোকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ডক্টর ইকবাল কবির জাহিদকে হুমকি দেয়া হয় গত ৮ জানুয়ারি। এ ঘটনায় ১২ জানুয়ারি মানববন্ধন করেন শিক্ষকরা। ওই মানববন্ধনে একজন নেত্রীর নেতৃত্বে হামলা করা হয় বলে দাবি শিক্ষকদের। প্রতিবাদে শিক্ষকরা ধর্মঘট শুরু করেন। এ অবস্থায় ২৪ জানুয়ারি ভিসির উপস্থিতিতে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শিক্ষকদের ক্লাসে ফেরার অনুরোধ জানানো হয়। এরই মধ্যে একজন কর্মচারী নেতাকে হুমকি দেয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। যার ফলে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ফের ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রিজেন্টবোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৯ ফেব্রুয়ারি। সভা থেকে শিক্ষকদের কাজে ফেরার আহবান জানানো হয়। ওইদিন শিক্ষকদের দাবি পূরণ হয়নি উল্লেখ করে ২৪ টির মধ্যে ২০ বিভাগের চেয়ারম্যান তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একইসাথে শিক্ষকরা বিকেলের শিফটে দুটো থেকে পাঁচটা পর্যন্ত ধর্মঘট পালন করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ১১ মার্চ শিক্ষকরা সভা করে শর্ত সাপেক্ষে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন।
এমন অবস্থায় এসে যবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ মাদক সেবন ও মাদকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্টতার দায়ে চার বিভাগের আটজন ছাত্রকে ছয় মাসের জন্যে বিশ^বিদ্যালয়ের শহীদ মসিয়ূর রহমান হল থেকে বহিষ্কার করেছে। হলের প্রভোস্ট বডির সভায় মাদক সেবন ও মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে তাদের বিরুদ্ধে এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। বহিষ্কৃত ছাত্ররা হচ্ছেন, ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র তানভীর মাহমুদ ফয়সাল (রোল-১২১১২১) ও তানীম আহমেদ (রোল-১২১১১৭), একই বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র আক্তারুজ্জামান আপন (রোল-১৫১১২২), ইংরেজি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র কে এম শাহেদ (রোল-১৬১৬০২), ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ইখতিয়ার ইমাম আনান (রোল-১৬০৭০১), বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং (বিএমই) বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র দেবায়ন দাস জয় (রোল-১৬১৯৮১৮), অভিক মজুমদার (রোল-১৬১৯০৭) ও নিলয় চন্দ্র মন্ডল (রোল-১৬১৯১১)। এরমধ্যে তিনজন শিক্ষার্থী অনাবাসিক হওয়ায় তাদেরকে এক হাজার টাকা জরিমানাসহ ছয় মাসের মধ্যে হলে প্রবেশ ও রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ করা হয়।
ব্যবস্থা গ্রহণ এখানেই শেষ না। শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্দেশ্যে র‌্যাগিং ও যৌন হয়রানির দায়ে আরো নয়জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছেন কর্তৃপক্ষ। একই সাথে আরও তিনজনকে নোটিশ দেয়া হয়েছে। র‌্যাগিং, যৌন নিপীড়ন ও বিকৃত যৌনাচারে বাধ্য করার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দু’জনকে আজীবন, একজনকে দু’বছর এবং অপর ছয়জনকে এক বছরের জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এছাড়া, তাদের অপরাধের বিষয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ও ভুক্তভোগী সবাই যবিপ্রবির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাদের বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হয়। তদন্ত কমিটি ভুক্তভোগী ১২ জনসহ মোট ৪০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে ঘটনার সত্যতা পায়। একইসঙ্গে যারা জড়িত তাদের সঙ্গেও তদন্ত কমিটি কথা বলে। এ ঘটনায় জড়িত ছাত্ররা তদন্ত কমিটির সঙ্গে অসংলগ্ন, ঔদ্ধ্যত্বপূর্ণ আচরণ করেন এবং তদন্ত কমিটি দেখে যে র‌্যাগিংয়ে জড়িত ছাত্ররা যে অপরাধ করেছে এ বিষয়ে তারা যথাযথ অনুতাপ বা দুঃখ প্রকাশ করেনি। একই সঙ্গে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ করায় র‌্যাগিংয়ের শিকার ছাত্রদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহারে বাধ্য করানো হয়। এ সংক্রান্ত ফোনকলের রেকর্ডও তদন্ত কমিটির হাতে রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। র‌্যাগিংয়ের শিকার হওয়া একজন ছাত্রকে চিকিৎসা পর্যন্ত নিতে হয়। ভুক্তভোগী অন্যরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং স্বাভাবিক হতে পারছেন না বলে সূত্র জানিয়েছে। ফলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে র‌্যাগিং রোধ ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কমিটি জড়িতদের প্রশাসনকে বহিষ্কারের সুপারিশ করে। এরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আচরণবিধির ৩ এর (এ ও বি) অনুযায়ী বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।      
এ ঘটনায় আজীবন বহিষ্কৃত ছাত্ররা হচ্ছেন, দ্বিতীয় বর্ষের অলি উল্লাহ (রোল-১৭১৩১২) ও মাহমুদুল হাসান (রোল-১৭১৩৩৪), দু বছরের জন্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র রজিবুল হক রজব (রোল-১৫১৩৩০), এক বছরের জন্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবদুল কাদের (রোল-১৫১৩২৩), এক বছরের জন্যে বহিষ্কৃত হয়েছেন দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আল মুজাহিদ আফ্রিদি (রোল-১৭১৩২৮),শহিদুল ইসলাম (রোল-১৭১৩১৪), রোকনুজ্জামান রোকন (রোল-১৭১৩০৫), অনুপ মালাকার (রোল-১৭১৩৩০) এবং শামীম বিশ্বাস (রোল-১৭১৩৩৭)।
একইসঙ্গে এ ঘটনায় পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবু বক্কর সিদ্দিকী (রোল-১৫১৩১৯), দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র শতদল পাল (রোল-১৬১৩০২) ও ইমরান হোসেনকে (রোল-১৭১৩২০) চূড়ান্তভাবে সতর্ক করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন র‌্যাগিংসহ শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কর্মকান্ডে জড়িত থাকবে না মর্মে তাদের আইনানুগ অভিভাবক এবং তিনি নিজে তিন শ’ টাকার ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকার না দিলে ওই তিনজন ছাত্রকেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে জানানো হয়।  
এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) সব ধরনের ছাত্র রাজনীতি (মিছিল-মিটিং-সভা-সমাবেশ-ক্লাস থেকে শিক্ষার্থীদের ডেকে আনা) স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। রিজেন্ট বোর্ডের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।  
এদিকে, উচ্ছৃঙ্খল ও অছাত্রসুলভ আচরণ প্রমাণিত হওয়ায় যবিপ্রবির ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী এসএম একরামুল কবির দ্বীপকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
কেবল বহিষ্কার আর ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ক্ষ্যান্ত হননি কর্তৃপক্ষ, অবৈধ জিনিসপত্র উদ্ধারের কাজও করছেন। ইতোমধ্যে শহীদ মসিয়ূর রহমান হলের ৩১৬ নম্বর কক্ষ থেকে চারটি বড় রামদা, ড্যাগার, ছুরি, লাটিসোটা, লোহার পাইপ ও বিপুল পরিমাণ রেল লাইনের পাথর উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রভোস্ট ও প্রক্টর বডির উপস্থিতিতে সিলগালাকৃত শহীদ মসিয়ূর রহমান হলের ৩১৬ নম্বর কক্ষ খোলা হয়। কক্ষে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের সন্ধান পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দিলে তারা এসে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করে নিয়ে যায়।  
যবিপ্রবিতে শিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কর্তৃপক্ষের এ ধরনের পদক্ষেপ অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলেছে। তাদের দাবি, শিক্ষার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে যা যা করার তার সবকিছু করতে হবে। তা না হলে যবিপ্রবি তার ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলবে। এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে মেধাবী শিক্ষার্থীরা। 



আরও খবর
সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft