বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই, ২০২০
শিক্ষা বার্তা
সর্বস্ব দান করা শান্তিলতাকে সংবর্ধিত করলেন শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনি
মাগুরা স্কুলের নাম বদলে হচ্ছে ইন্দুভূষণের নামে
কাগজ সংবাদ :
Published : Friday, 5 April, 2019 at 6:48 AM

মাগুরা স্কুলের নাম বদলে হচ্ছে ইন্দুভূষণের নামেযশোরের অভয়নগর উপজেলার মাগুরা গ্রামের শান্তিলতা ঘোষ। নামটি সকলেরই জানা। কারণ শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ অবদানের কথা উঠলে তার নাম অগ্রভাগে চলে আসে। তিনি অভয়নগর এলাকায় শিক্ষায় সকলের দেবদূত হিসেবেও পরিচিত। যার সমস্যা দুর্দশা দেখতে স্থানীয় নির্বাহী কর্মকর্তাও (ইউএনও) ছুটে গেছেন তার বাড়িতে। সেই শান্তিলতা ঘোষকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দিপুমনি। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোরের উদ্যোগে এ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সর্বস্বত্যাগী শান্তিলতা ঘোষ। শিক্ষাবিস্তারের স্বার্থে তার সমুদয় সম্পত্তি দান করেছেন যশোরের অভয়নগরের মাগুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে। দ্বীনহীন অবস্থায় বসবাস করলেও অশীতিপর এ শিক্ষানুরাগী নিয়মিত খোঁজ নেন তার বিদ্যালয়ের ছেলে মেয়েদের। লেখাপড়া ঠিকমতো হচ্ছে কিনা। এ রকম এক মানুষকে সম্মান জানাতে আসতে পেরে তিনি  আনন্দিত বলে মন্তব্য করেন। তিনি নিজে কিছু পাওয়ার জন্যে দান করেননি। সমাজের উপকারের কথা ভেবে দান করেছেন। এখন এই সমাজের কিছু দায়িত্ব রয়েছে শান্তিলতার জন্যে। আমাদের তা পালন করতে হবে। আমি মনে করি, এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তারা শান্তি লতার জন্যে কিছু করবেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে জিলা স্কুল অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সহসভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্র্মূল কমিটির চিকিৎসা সহায়ক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডাক্তার উত্তম কুমার বড়–য়া, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির যশোরের সভাপতি হারুন-অর-রশিদ, সাধারণ সম্পাদক সাজেদ রহমান, অভয়নগরের প্রেমবাগ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রভাষক মফিজ উদ্দিন, যশোর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোলাম আযম প্রমুখ। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি শান্তিলতার হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেয়। এছাড়া অনুষ্ঠানে শান্তিলতাকে ক্রেস্ট, মানপত্র, শাড়ি দেয়া হয় এবং উত্তরীয় প্রদান করা হয়। 
মাগুরা স্কুলের নাম বদলে হচ্ছে ইন্দুভূষণের নামে
শান্তিলতা ঘোষ ১৯৩১ সালের ১২ ডিসেম্বরে জন্মগ্রহণ করেন অভয়নগর উপজেলার  প্রেমবাগ ইউনিয়নের মাগুরা গ্রামে। তার পিতা ইন্দুভূষণ বিশ্বাস ও মাতা সুমনা বিশ্বাস। তিন ভাই- বোনের মধ্যে শান্তিলতা ঘোষ প্রথম সন্তান। কিশোরী বয়সেই তিনি তার দুই ভাইকে হারান। পিতা ইন্দুভূষণ বিশ্বাস একজন সংস্কৃতি মনস্ক মধ্যবিত্ত কৃষক ছিলেন। তিনি গ্রামে পালাগান, যাত্রাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। গ্রামে যে সমস্ত ছাত্ররা অর্থাভাবে লেখাপড়া করতে পারতো না তাদের সাহায্য করতেন। এহেন সমাজসেবক সংস্কৃতিমনা শিক্ষানুরাগী ইন্দুভূষণ বিশ্বাস মাগুরা সরকারি 
মাগুরা স্কুলের নাম বদলে হচ্ছে ইন্দুভূষণের নামেপ্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্যে নিঃশর্তে ৩৩ শতক ও বাজার স্থাপনের জন্যে ৫০ শতক জমি দান করেন। শিক্ষামন্ত্রী অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের নামটি শান্তিলতার পিতা ইন্দুভুষণের নামে করার জন্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
শিশু শান্তিলতা গ্রামের পাঠশালায় লেখাপড়া শুরু করে কিন্তু ১৪ বছর বয়সে তাকে বিয়ে দেয়া হয়। যার ফলে আর বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি। যশোর কোতোয়ালী থানার বসুন্দিয়া ইউনিয়নে জগন্নাথপুর গ্রামে বসবাসরত বিদ্যুৎ ঘোষের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের চার বছরের মাথায় তিনি একটি পুত্র সন্তানের জননী হন। কিন্তু জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই সন্তানের মৃত্যু হয়। বিয়ের ১০ বছর পর তার স্বামী কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। স্বাভাবিকভাবেই সন্তানহীন বিধবার প্রতি শ্বশুরবাড়ির লোকদের আচরণ রূঢ় থেকে রূঢ়তর হতে থাকে। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ফিরে আসেন পিতার কাছে। তার কিছুদিন পর পিতা ইন্দুভূষণ মৃত্যুবরণ করেন।
অভিভাবকহীন হয়ে শান্তিলতা ঘোষ বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ওপর ভর করে সংসার নির্বাহ করতে থাকেন। একাকিত্ব কাটানোর জন্যে প্রতিবেশী সুনীল দের ২১ দিনের সন্তান গৌতম দেকে দত্তক নেন। গৌতম তার ছেলে হিসেবেই বেড়ে উঠে। এরইমাঝে গ্রামের লোকজন এলাকার সন্তানদের লেখাপড়ার উন্নয়নের জন্যে একটি মাধ্যামিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এজন্যে শান্তিলতার কাছে জমি চায়। পিতার আদর্শ অনুসরণ করে তিনি তার সমুদয় জমি (৬ দশমিক ৮৬ একর) মাগুরা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামে লিখে দেন। তখন তার আবেদন ছিল স্কুলটি তার পিতা ইন্দুভূষণ বিশ্বাসের নামে করা হোক। কিন্তু স্থানীয় উদ্যোক্তারা গ্রামের নামেই স্কুলটি স্থাপন করেন।
বর্তমানে একটি জীর্ণ কুঠিরে তার কষ্টকর বসবাস। এ অবস্থার মধ্যেও শান্তিলতা ঘোষ নিয়মিত ছুটে আসেন বিদ্যালয়ে; ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া ঠিকমতো হচ্ছে কিনা সেই খোঁজখবর নেন।
২০১৭ সালে তার জীর্ণ মাটির ঘরে বাসা বাধে বিষধর সাপেরা। ভয়ে ঘরে থাকতে না পেরে বিপদে পড়েন শান্তিলতা। এ সংবাদে তৎকালীন অভয়নগর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মনদীপ ঘরাই ছুটে আসেন সরজমিনে দেখতে। তখনই বোঝা যায়, শান্তিলতা ঘোষের নিজস্ব কোনো জমি নেই; সবইতো দান করা বিদ্যালয়ের নামে। তাই ঘর সংস্কার করা বা নতুন করে স্থাপনের জায়গা কোথায় ? তখন মনদীপ ঘরাইয়ের মধ্যস্থতায় স্কুল কর্তৃপক্ষ, ইউপি  চেয়ারম্যান ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ একমত হয়ে বিদ্যালয়ের নামে দান করা জমি থেকে ১ দশমিক ৪৯ শতক জমি গৃহনির্মাণের জন্যে শান্তিলতাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। একইসাথে উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে সরকারি অনুদানসহ উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তির সহায়তায় একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন সরকারি এমএম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু তালেব মিয়া, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন, প্রবীণ শিক্ষক তারাপদ দাস, বিশিষ্ট কলামিষ্ট আমিরুল ইসলাম রন্টু, জেলা পূজা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও  ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির যুগ্ম সম্পাদক যোগেশ চন্দ্র দত্ত প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চলনায় ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা দীপংকর দাস রতন।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft