বুধবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৯
অর্থকড়ি
সরকারিভাবে ধান কেনার দাবি, হতাশায় সারাদেশের কৃষক
কাগজ ডেস্ক :
Published : Friday, 17 May, 2019 at 6:25 AM
সরকারিভাবে ধান কেনার দাবি, হতাশায় সারাদেশের কৃষক  বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সারাদেশে কৃষকের মধ্যে ক্ষোভ-হতাশা বিরাজ করছে। ক্ষোভের কারণে বিভিন্ন এলাকার চাষিরা জমি থেকে ধান কাটতে চাচ্ছেন না। আবার দাম কম হওয়ায় খরচ না ওঠার হতাশার কারণে রাজপথে ধান ঢেলে দিয়ে অবরোধ হচ্ছে কোথাও কোথাও। বর্তমানে সারাদেশে কৃষকের মধ্যে ধানের দাম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল কেনার জন্যে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে।
রংপুর-লালমনিরহাট মহাসড়কের সাতমাথায় ধানের ন্যায্য মূল্যের দাবিতে ধান ঢেলে মহাসড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে কৃষক সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ কৃষকরা। বৃহস্পতিবার দুপুরে তারা এ কর্মসূচি পালন করে।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন কৃষক সংগ্রাম পরিষদের উপদেষ্টা পলাশ কান্তি নাগ, আহ্বায়ক আব্দুস সাত্তার বাবলু, সদস্য আব্দুস সাত্তার প্রামাণিক, কৃষক আবু তালেব, আতোয়ার মিয়া বাবু, নিপীড়ন বিরোধী নারী মঞ্চের আহ্বায়ক নন্দিনী দাস, সদস্য সানজিদা আকতার প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে একজন শ্রমিকের মজুরির চেয়ে এক মণ ধানের দাম কম। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ধান চাষ করে উৎপাদন ব্যয়ের অর্ধেকও উঠছে না। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে।
এসময় প্রতি হাটে হাটে ক্রয়কেন্দ্র খুলে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারকে ধান কেনার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, সরকার ১১শ’৪০ টাকা মণ দর ঘোষণা করার পরও খোলা বাজারে কেন মূল্য বিপর্যয় ঘটেছে তা সরকারকে খুঁজে বের করতে হবে। তা না হলে কৃষকরা বাঁচবে না। কৃষক না বাঁচলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়বে। অতিদ্রুত ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না হলে আগামীতে ধান চাষ না করার শপথ নিয়েছেন তারা। এই কর্মসূচিতে কৃষকরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় হাটে হাটে ক্রয়কেন্দ্র খোলার দাবি জানান।
এদিকে, ধানের দাম কম হওয়ায় টাঙ্গাইলে পাকা ধান কাটছে না কৃষক। বিক্ষুব্ধ এক কৃষক তার ক্ষেতের পাকা ধানে আগুন লাগিয়ে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, একজন মজুরির যে দাম তাতে এক মণ ধান বিক্রি করেও পাওয়া যাচ্ছে না। তার উপর রমজান মাসে মজুর পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এসব কারণে বিক্ষুব্ধ কৃষক পাকা ধান না কেটে আগুন ধরিয়ে দেন। খবর পেয়ে ওই এলাকার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে আগুন দেয়া জমির ধান কেটে ওই কৃষকের বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে।
এই অবস্থা কেবল রংপুর, টাঙ্গাইল না, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও। এই এলাকার কৃষক সংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা ন্যায্য মূল্যে ধান কেনার জন্যে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছে। হতাশাগ্রস্ত কৃষক সরাসরি সরকারিভাবে ধান কেনার দাবি জানাচ্ছে। তাদের বক্তব্য, সরকারিভাবে ধান কেনা না হলে তাদের খরচ উঠবে না। আর খরচ না উঠলে ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন কৃষক। এ অবস্থা থেকে যতদ্রুত সম্ভব চাষিকে বের করে আনতে হবে।  
গত কয়েক বছরের মধ্যে এবারের মৌসুমে ধানের সবচেয়ে ভালো ফলন হয়েছে। ফলন ভালো হলেও হাসি ফুটেনি কৃষকের মুখে। কারণ ধানের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহেও বাজারে নতুন ধান স্থানভেদে ৬শ’ থেকে ৬শ’৫০ টাকা মণে বিক্রি হয়েছে। আর এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন চিকন ধান মাত্র ৫শ’ থেকে ৫শ’৫০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ধানের দর কমেছে ২৩ থেকে ২৫ শতাংশেরও  বেশি। বেশিরভাগ হাট থেকে কৃষকরা ধান নিয়ে ফেরত যাচ্ছেন। কারণ প্রত্যাশিত দামে বিক্রি হচ্ছে না ধান। এই চিত্র সারাদেশের।
ধানের বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মূলত কৃত্রিম। ফড়িয়া আর চালকল মালিকরাই মুনাফা লুফতে এ পরিস্থতি তৈরি করেছে। সারাদেশের ধান-চালের বাজারে ফড়িয়ারা গুজব ছড়াচ্ছে, সরকার বিদেশ থেকে বেশি চাল আমদানি করায় গুদামে জায়গা নেই। তাই এবার বেশি ধান-চাল কিনতে পারবে না। চালকলের মালিকেরা ধান ওঠার সময় ধান না কেনার ভান করে দামটা কমিয়ে রেখে সস্তায় ধান কেনার কৌশল গ্রহণ করেন। এবার তারা একজোট হয়ে একেবারেই ধান কিনছেন না বলা চলে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধান-চালের দাম নির্ধারণে মধ্যস্বত্বভোগীদের একচ্ছত্র আধিপত্যের ফলে দেশে ধান উৎপাদনে নিয়োজিত কৃষকরা যেমন ন্যায্যমূল্য  থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি বেশি দামে চাল কিনে সাধারণ  ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অন্যদিকে ধান থেকে চাল তৈরি প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্যবসায়ী ও মিলাররা সেই ধান কেনেন কৃষকের বিক্রির দামের চেয়ে দেড় গুণ  বেশি দিয়ে। এতে মিলারদের ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় ধানের দামের ৫০ শতাংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমই ত্রুটিতে পরিপূর্ণ। এ কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংগ্রহের লক্ষ্য ব্যর্থ হয়েছে।
কৃষকরা বলছেন, গোলাভরা ধান এবার ফলেছে সত্যি, কিন্তু তাদের পকেট খালি। প্রতি মণ ধান উৎপাদন খরচের চেয়ে ২শ’ থেকে ২শ’৫০ টাকা কমে বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের। প্রতি মণ ধান উৎপাদনে ৭শ’ থেকে ৭শ’৫০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ধান বিক্রি হয়েছে ৫শ’ থেকে ৫শ’২০ টাকায়। সরকার ভারত থেকে চাল আমদানি অব্যাহত রাখায় কৃষক ধানের দাম পাচ্ছেন না বলে মনে করছেন এই ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থা চলতে থাকলে ধান উৎপাদনে কৃষক আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন বলে মনে করছেন অনেকেই।
এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, ফলন ভালো হলে দাম পড়ে যায়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটা আমরা জানি। চাল রপ্তানি করে দাম বাড়ানো যায়। তবে, এ নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারণ, হঠাৎ সংকট দেখা দিলে ভয়ংকর বিপদ হবে। আমরা চিন্তা করছি কৃষকদের জন্যে কিছু একটা করার। সারাদেশে বোরো ধান কাটা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দিতে। ধানের দাম নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের নীতিমালার সঠিক প্রয়োগের অভাবেই ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। সরকারের প্রত্যক্ষ নজরদারি না থাকায় কথিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনছে। ফলে, সংগ্রহ মূল্য বাড়ালেও উৎপাদক কৃষকরা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি দাম থেকে। সরকার এবার বোরো মৌসুমে ধান কিনবে মাত্র দেড় লাখ টন। আর কৃষক ধানই বিক্রি করেন। ফলে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার সরকারি উদ্দেশ্য প্রথমেই ধাক্কা খায়। ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে বাজার ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
তাদের মতে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বিদ্যমান বাস্তবতার সমন্বয়ে এটি সাজাতে হবে। কৃষকের অবস্থা দিন দিন রুগ্ন হবে আর হাজার হাজার চালকল বড় মুনাফা করবে,  সেটি কাম্য নয়। এটি রোধে গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে বাজার অদক্ষতা দূর করে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানকে কার্যকর করে তোলা। পাশাপাশি আমাদের কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে হলে প্রক্রিয়াজাত ও বাণিজ্যিকীকরণ অপরিহার্য। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প  দেশে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও রপ্তানির ভিত্তিতে নতুন নতুন সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে। যথাযথ বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব থেকে পূর্ণ সুবিধা গ্রহণ এ খাতের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। কৃষির যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। কৃষকের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে তাদের সংগঠিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকদের ঠকাতে পারবে না সহজে।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft