বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি!
সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি কারবার
ফয়সল ইসলাম :
Published : Thursday, 20 June, 2019 at 6:47 AM
সরকারি  হাসপাতালে বেসরকারি কারবারআশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি! যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসেই চলছে একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সরকারি ভবনেই অতিগোপনে এটির কার্যক্রম চলছে। ওই সেন্টার কর্তৃপক্ষের বেতনভুক্ত ও কমিশন ভিত্তিক ডজন খানেক দালাল রয়েছে। এছাড়াও সরকারি হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক লেবাসধারী দালালরাও কাজ করছেন বেসরকারি ওই  ডায়াগনস্টিক সেন্টারের জন্যে। হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগ থেকে প্রতিদিনই অর্ধশতাধিক রোগীকে ভাগিয়ে সেখানে নিয়ে গলাকাটা ব্যবসা করা হচ্ছে। গ্রামের কাগজের অনুসন্ধানে এসব তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাম্পাসের পশ্চিমপাশে পুরাতন ভবনের নিচতলায় ৮টি কক্ষ নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি সংস্থা রিপ্রোডাকটিভ হেলথ সার্ভিস ট্রেনিং অ্যান্ড এডুকেশন প্রোগ্রাম (আরএইচএসটিইএফ)। গর্ভবতী পরিচর্যা, প্রজনন স্বাস্থ্য, এমআর ও পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি সেবা প্রদানের জন্যে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্যে অনুমোদন রয়েছে। জনসাধরণকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনামূল্যে সেবা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাসপাতাল ক্যাম্পাসেই সরকারি ভবনেই চলছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম। ভবন ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্যে সংস্থাটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কোনো প্রকার ভাড়াও দেয়না। এরই মধ্যে ২০১৩ সালে সংস্থাটি প্যাথলজিক্যাল ল্যাব ও আল্ট্রাসনো সার্ভিস চালু করে। বর্তমানে সরকারি হাসপাতাল ভবনেই বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ব্যবসা জমজমাট আকার ধারন করেছে। প্রসূতি বিভাগ, আল্ট্রাসনো ও প্যাথলজি বিভাগে দালাল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ডাক্তারের চেম্বারের সামনে বসে থাকা আয়া ও স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দালালরা। সরকারি রেটে সব টেস্ট করিয়ে দেয়া হবে বলে রোগীদের বোঝানো হলেও নেয়া হচ্ছে দ্বিগুণ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনগুণ টাকা। হাসপাতাল ক্যাম্পাসেই বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলায় কারোরই বোঝার উপায় নেই রোগীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
গতকাল বেলা ১১টার পর ভবনটিতে গিয়ে দেখা যায় গোটা বিশেক নারী রোগী অপেক্ষায় আছেন আল্ট্রাসনো ও বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষা করানোর জন্যে। তাদের মধ্যে ছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের মিঠুনের স্ত্রী মুক্তি (২৫)। তিনি সরকারি হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগের যে টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন তার রেজিঃ নম্বর ১১৩০১৬/২৩। গাইনি বিভাগের ডাক্তারকে রোগী মুক্তির টিকিটে আল্ট্রাসনো করাতে নির্দেশনা দিয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক লেবাসধারী রুপা দালাল নাসিমার মাধ্যমে আরএইচএসটিইএফ’র ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে দেন। সেখানে ৩শ’ টাকা জমা দিয়ে পরীক্ষা করানোর জন্যে অপেক্ষারত ছিলেন মুক্তি। এছাড়াও যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া গ্রামের আবু দাউদের স্ত্রী রোদিয়া (১৯), দুর্গাপুরের আনোয়ারের স্ত্রী মঞ্জুয়ারা (২৭), অভয়নগরের দলিগাতী গ্রামের আশরাফুলের স্ত্রী আয়শা (১৯), মণিরামপুরের যাদবপুর গ্রামের ফিরোজ হোসেনের স্ত্রী বিলকিস খাতুন (৩০) অপেক্ষামান রোগীদের কাছ থেকে ৩শ’ থেকে ৭শ’ টাকা  নেয়া হয়েছে আল্ট্রাসনো ও বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা নিরীক্ষার করার জন্যে। উল্লেখিত রোগীদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা প্রত্যেকে দালালের মাধ্যমে আরএইচএসটিইএফ’র ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এসেছেন। বোঝানো হয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদের টেস্ট করানো হবে। টাকাও কম নেয়া হবে। সরকারি হাসপাতালে আল্ট্রাসনো করাতে ১শ’ ১০ টাকা খরচ হয়, আর তারা যেখানে এসেছেন সেটি সরকারি হাসপাতালের অংশ নয় জানতে পেরে রোগীরা বোকা বনে যান। একই সাথে তারা আরএইচএসটিইএফ’র ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিয়োগকৃত দালাল শামীম, জেসমিন, নাসিমার দিকে আঙ্গুল তুলে বলতে থাকেন কেন ভুল বুঝিয়ে বেশি টাকা নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আনা হলো। দালালরা তখন নিশ্চুপ থাকেন।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আরএইচএসটিইএফ’র পরিচালনা বোর্ডে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ লিটু, টেকনিক্যাল উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার রবিউল ইসলাম। প্রতিষ্ঠানটির যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনাকারী একাউন্টস অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার মনিরুল ইসলামের দাবি সরকারি হাসপাতালের মধ্যে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ব্যবসার অনুমতি দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ও টেকনিক্যাল উপদেষ্টা। তাদের অনুমতি নিয়েই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো লিখিত অনুমোদনপত্র দেখতে চাইলে তারা দেখাতে পারেননি।
মনিরুল ইসলাম স্বীকার করেন প্রতিটি আল্ট্রাসনোর জন্যে দালালদের ১শ’ টাকা করে প্রদান করা হয়। যে ডাক্তার আল্ট্রাসনো করেন তিনি পান ১শ’ টাকা। আর অবশিষ্ট ১শ’ বা ২ থেকে ৩শ’ টাকা প্রতিষ্ঠানের লাভ থাকে। প্যাথলজিক্যাল টেস্টের ক্ষেত্রেও দালালদের কমিশন দেয়া হয়ে থাকে।
আরএইচএসটিইএফ’র ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসা জমজমাট করতে হাসপাতালের বর্হিঃবিভাগ থেকে রোগী ভাগাতে অপেক্ষারত নাসিমা নামে এক দালালকে দুপুর ১টার দিকে হাতেনাতে ধরেন হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ লিটু। তাকে অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে তিরস্কার করে বিদায় করেন। একই সাথে একাউন্টস অ্যান্ড অ্যাডমিন অফিসার মনিরুল ইসলামকে চূড়ান্তভাবে সতর্ক করেন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ও আরএইচএসটিইএফ’র প্রধান উপদেষ্টা ডাক্তার আবুল কালাম আজাদ ও টেকনিক্যাল উপদেষ্টা ডাক্তার রবিউল ইসলাম গ্রামের কাগজকে জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটিকে ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালানোর কোনো অনুমতি দেয়া হয়নি। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি হাসপাতাল ভবন ব্যবহার করে ব্যবসা করতে দেয়ার কোনো বিধানও নেই। কর্তৃপক্ষকে আড়াল করে সম্পূর্ণ  বেআইনিভাবে তারা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে রোগীদের সাথে প্রতারণা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
 




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft