রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোর বিআরটিএ’র গণশুনানী
ভোগান্তির কথা বলে তাৎক্ষণিক সমাধান পেলেন সেবাগ্রহীতারা
কাগজ সংবাদ :
Published : Wednesday, 26 June, 2019 at 6:07 AM
ভোগান্তির কথা বলে তাৎক্ষণিক সমাধান পেলেন সেবাগ্রহীতারামঙ্গলবার বেলা এগারোটা। বিআরটিএ অফিস চত্বরে  ছোট্ট জটলা। জনা পঞ্চাশেক লোকের জমায়েতের বিপরীতে তিনজন বসে আছেন খাতা কলম আর মাইক্রোফোন হাতে। চলতি পথে হঠাৎ চোখ গেলে মনে হবে কোনো পথসভা হচ্ছে এখানে। উৎসাহী কেউ এগিয়ে গিয়ে দেখছে কী হচ্ছে। জেলা ও উপাজেলা প্রশাসন এখন সাপ্তাহিকভাবে আয়োজন করলেও বিআরটিএর সেবা নিয়ে গণশুনানী অনেকের কাছে আনকোরা। তবে, দিন শেষে এই আয়োজনকে সময়পোযোগী ও নান্দনিক বলে আখ্যা দিলেন সেবাগ্রহীতারা। অভিযোগ জানাতে এসে সেবা গ্রহীতারা আয়োজনের উদ্যোক্তার আন্তরিকতা আর বাস্তবতার নিরিখে সমস্যার সমাধানে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
সেবা সহজীকরণ ও জন ভোগান্তি নিরসনে গণশুনানীর আয়োজন করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ যশোর সার্কেল। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিআরটিএ খুলনার উপপরিচালক জিয়াউর রহমান। শুনানীতে সভাপতিত্ব করেন যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক কাজী মো. মোরছালীন।
গণশুনানীতে আগত সেবাগ্রহীতারা দীর্ঘদিন ধরে জেঁকে বসা নানা ধরনের হয়রানির কথা সোজাসাপ্টা বলতে থাকেন। বিআরটিএ আঙিনায় ঘাঁটি গেড়ে বসা দালাল থেকে শুরু করে অফিসের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু কর্মকর্তা কর্মচারীর যোগসাজশে কীভাবে সাধারণ মানুষ সেবার বদলে পরতে পরতে পেতে রাখা জালে জড়িয়ে যান তার সরল ভাষায় উপস্থাপন করতে থাকেন। দূর দূরান্ত থেকে সেবা নিতে এসে ভোর পাঁচটায় সিরিয়ালে দাঁড়ানোর সীমাহীন কষ্ট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাঁই দাঁড়িয়ে সেবা না পাওয়ার যন্ত্রণা, সেবা গ্রহীতাদের সাথে কিছু অসৎ কর্মকর্তা কর্মচারী দুর্ব্যবহার, সময়ক্ষেপণ আর সুকৌশলে বাড়তি টাকা খরচ করে ভিন্নপথে যোগযোগ করার পথ দেখানো সব উঠে আসতে থাকে আলোচনায়। অকপট অপ্রিয় সত্যভাষণে কারো কারো যখন চেহারায় পরিবর্তন দৃশ্যমান তখনও সাবলীলভাবে প্রতিটি বক্তার নাম ঠিকানাসহ অভিযোগ  লিপিবদ্ধ করছিলেন খুলনা বিভাগীয়  উপপরিচালক জিয়াউর রহমান।
কেশবপুর সাগরদাঁড়ি কলেজের প্রভাষক সাধন দাস বলেন, সেবা প্রদান সংক্রান্ত প্রচার ও বিলবোর্ড দৃশ্যমান জায়গায় স্থাপন করতে হবে। যাতে সাধারণ মানুষ জানতে পারে কোন সেবা কার কাছে পাওয়া যাবে এবং তার সেবামূল্য কত। পাশাপাশি কোনো দালালের সাথে যোগাযোগ না করার পরামর্শসহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানিয়ে অনিয়মের বিরুদ্ধে যোগাযোগের নাম্বারসহ প্রচারণা বাড়ানোর পরামর্শ প্রদান করেন।
যশোর পুরাতন কসবা কাজীপাড়ার বাসিন্দা এবিএম জাকির উদ্দিন অভিযোগ করেন, তিনি ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে বিধি মোতাবেক সব শর্ত পূরণ করার পরও সেবা পাননি। প্রতিনিয়ত অফিসে এসে ধর্ণা দিলেও তাতে কেউ কর্ণপাত করেনা। অভিযোগ শোনা তো দুরের কথা তার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণও করেনি অফিসের লোকজন। সেবাগ্রহীতার অনুপাতে অপ্রতুল জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তখন একজন জানান তার ফাইলটি হারিয়ে গেছে। জমা প্রদান করা ফাইল কীভাবে হারালো জানতে চাইলে বলে দেয়া হয়- ‘অত কথা বলার সময় নেই, পারলে ফের আবেদন করো অথবা জায়গা খালি করো।’ ব্যর্থ মনোরথে ফিরে গিয়ে এলাকার এক বড় ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন প্রোপার চ্যানেলে যোগাযোগ না করলে লাইসেন্স পেতে এমনি হয়।
শার্শার লক্ষণপুর থেকে এসেছিলেন হোসেন আলী। তিনি বলেন, তিন বছর ধরে লাইসেন্স পাওয়ার জন্যে জুতোর তলা ক্ষয় করছেন তবু মিলছেনা কাঙ্খিত লাইসেন্সটি। অফিসে আসলে আড়ে ইঙ্গিতে টাকায় চুক্তি করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে তাকে। কেশবপুরের সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের চিংড়া গ্রামের আব্দুল হামিদ বলেন, ‘সিবা নিতি যতবার আইছি ততবারই কয়েছে টাকা বেশি দ্যাও ডেট বাড়ায় দিবানে। বুজবাজ কত্তি পারিনি বিলে কাডডা আজো হাতে পালাম না।’ ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার আড়পাড়ার জাকির হোসেন জানান, ভোর সাড়ে চারটায় বাড়ি থেকে রওনা হয়ে সাড়ে পাঁচটার ভিতরে এসে বহুদিন লাইনে দাঁড়িয়েছেন। পাঁচ ছয় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরও তিনি সেবা পাননি।
যশোর সদর উপজেলার নওদাগ্রামের বাবর আলী অভিযোগ করেন ‘অফিসে আসলি কেউ বসতি কওয়া তো দুরি থাক কতাই কতি চায় না। গাঁটির টাকা খচ্চা করে আইসে বিয়াকুপ হতি হয়। মনে হয় এ কনে আসলাম।’ তার মতো এন্তার অভিযোগ করেন অরুণ শীল,শরিফুল ইসলাম, মশিয়ার রহমান, বিল্লাল হোসেন, খলিলুর রহমান, ফারুক হোসেন, এনামুল হক, আব্দুল হালিম।
সবার অভিযোগের পালা শেষ হলে এক এক করে সমাধানের কথা শুরু করেন খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক জিয়াউর রহমান। শুরুতেই তিনি বলেন, আজকের এ আয়োজনকে দয়া করে কেউ লোক দেখানো ভাববেন না। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ শুনে তার প্রতিকার করা আর তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সেবা প্রদান পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্যেই এই গণশুনানীর উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, সরকার জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে বদ্ধ পরিকর। কম খরচে, কম সময়ে হয়রানিমুক্ত সেবা প্রদানে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। লার্নার লাইসেন্স আবেদন অনলাইনে করা হয়েছে যাতে কারো কষ্ট করে অফিসে না আসতে হয়। তিনি জানান, কালেক্টরেট চত্ত্বরের এই অফিসে জায়গার স্বল্পতা আছে। সে কারণে চাঁচড়ায় তিন একর জায়গা বরাদ্দসহ নিজস্ব ভবন তৈরি মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। স্বল্প সময়েই এটির কাজ শুরু হবে। তবে যতদিন নিজস্ব ভবন না হয় ততদিন বকচরে বিআরটিএ অফিস শিফট করা হবে। যাতে সেবাগ্রহীতা বসার জায়গাসহ বিভিন্ন সুবিধাভোগ করতে পারে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, সেবার মান বাড়াতে দরকার কর্মকর্তাদের সদিচ্ছা আর সেবাগ্রহীতাদের সহযোগিতা। এ দু’টি পূরণ হলেই বদলে যাবে বিআরটিএ’র সেবা প্রদানের প্রচলিত পদ্ধতি। এ জন্যে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি সবাইকে যে কোনো অনিয়মে তার সাথে যোগাযোগ করতে কন্ট্রাক্ট নাম্বার প্রদান করেন। একই সাথে গণশুনানীতে এসে যারা অভিযোগ করেছিলেন তাদের সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধানও করেন।
গণশুনানীতে আগত সেবাগ্রহীতারা ফিরে যাওয়ার সময় এ ধরনের উদ্যোগের জন্যে বিআরটিএ খুলনার উপপরিচালক জিয়াউর রহমানকে সাধুবাদ জানিয়ে এ উদ্যোগ চলমান রাখার অনুরোধ জানান। অনুষ্ঠানে বিআরটিএ যশোর সার্কেলের মটরযান পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুস সোবাহান গাজীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সড়ক পরিবহন নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft