সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
এবার ভাঙা হবে আলী মঞ্জিল
জনস্বার্থে ঐতিহ্যবাহী ভবনটি সরাতে নোটিশ
আসাদ আসাদুজ্জামান :
Published : Thursday, 4 July, 2019 at 6:38 AM
এবার ভাঙা হবে আলী মঞ্জিলযশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানায় ভৈরব পাড়ের অবৈধ স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়ার পর এবার প্রাচীনতম ভবন আলী মঞ্জিল ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি জুলাই মাসেই এটি অপসারণ করা হতে পারে।
তবে ঐতিহ্যবাহী এ ভবনটি অবৈধ স্থাপনা হিসেবে ভাঙা হবে না। ভবনটি জরাজীর্ণ বিবেচনা করে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তায় এটি অপসারণের জন্য যশোর পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ভবনের মালিক ও ভাড়াটিয়াদের নোটিশ দিয়েছেন। সে নোটিশে সাড়া দিয়ে সংশ্লিষ্টরা ভবন অপসারণে বিগত জুন মাস পর্যন্ত সময় নেন। ফলে চলতি জুলাইয়ের যে কোন দিন এটি ভাঙার কাজ শুরু হবে।
একসময় যশোরে যে ক’জন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন চাঁদ আলী বিশ্বাস। তিনি ব্রিটিশ আমলে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাশ করে ‘গোল্ড মেডল’ পান। সে সময় তিনি নায়েবের চাকরিও করতেন। শুধু অগাধ সম্পদের মালিকই ছিলেন না তিনি, সমাজ সেবায় ও মানব কল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রাখায় ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘নাইট’ খেতাব দিয়েছিলো বলে তাঁর বেঁচে থাকা আত্মীয়-স্বজনের দাবি।
তারা বলেন, চাঁদ আলী বিশ্বাসরা ছিলেন পাঁচ ভাই। তাঁর অপর চার ভাই হলেন মান্দার আলী বিশ্বাস, বেলায়েত আলী বিশ্বাস, আহম্মদ আলী বিশ্বাস ও মোহাম্মাদ আলী বিশ্বাস। এ চার ভাই সেই আমলে ঠিকাদারী করতেন। তারা যশোর সেনানিবাস ও যশোর বিমান বন্দর নির্মাণ কাজেও ঠিকাদারী করেছিলেন। সেখানে তারা জমিদাতাও ছিলেন। পাঁচ ভাইই ছিলেন যৌথ পরিবারের সদস্য। যে কারণে যশোরে তাঁদের এজমালি সম্পত্তি ছিলো অনেক। পালবাড়ি, নওদাগাঁ, পুরাতনকসবা, পোষ্ট অফিস পাড়া, দড়াটানা প্রভৃতি এলাকায় জমাজমির অন্ত ছিলো না। দড়াটানায় ভাইদের ঠিকাদারী ব্যবসার চেম্বার এবং নিজেদের একটি সেই আমলের আধুনিক ভবন গড়তে ১৯৪১ সালে চাঁদ আলী বিশ্বাস ‘আলী মঞ্জিল’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। ভবনটি গড়তে পালবাড়ি এলাকায় নিজেদের জমিতে দীঘি খনন করে সেই মাটি দিয়ে ইট প্রস্তুত করতে পাশেই ইট ভাটা গড়ে তোলেন। সে ইটেই ১৯৫০ সালে দড়াটানায় ‘আলী মঞ্জিল’ নির্মাণ কাজ শেষ হয়। জনশ্রুতি আছে, সে সময় এই আলী মঞ্জিল দেখতে দুর-দুরান্তের বহু গ্রাম থেকে গরু গাড়ি ভরে শত শত মানুষ আসতেন দড়াটানায়।
চাঁদ আলী বিশ্বাসের ভাই মান্দার আলী বিশ্বাসের ছেলে যশোরের সাবেক এমপি রওশন আলী আইন পেশায় প্রথম চেম্বার খোলেন এই আলী মঞ্জিলের দো’তলায়। পরবর্তীতে সেই চেম্বারই বৃহত্তর যশোর জেলা আওয়ামী লীগের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সাবেক এমপি রওশন আলীর ছেলে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট আবু সেলিম রানা জানান, তার বাবা ১৯৫৪ সালে আইন পেশায় যোগ দেন। তিনি প্রথমে সাবেক এমপি খালেদুর রহমান টিটোর বাবা বৃহত্তর যশোর জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হাবিবুর রহমানের সেরেস্তায় জুনিয়র হিসেবে কাজ শুরু করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বড় চাচা চাঁদ আলী বিশ্বাসের অনুরোধে আলী মঞ্জিরের দো’তলায় বিশাল চেম্বার খুলে বসেন। সে সময় তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে শহরের বারান্দীপাড়ায় ভাড়ার বাসায় থাকতেন। জমিজমা ভাগাভাগি হলে এমপি রওশন আলী পান প্রধান ডাকঘরের সামনে বর্তমান বাসভবনের জমিটি। সেখানে তিনি একটি একতলা বাড়ি তৈরী করে ১৯৬২ সালে বসবাস শুরু করেন এবং এ বাড়িতেই চেম্বার খোলেন। সেই থেকে আলী মঞ্জিলের দো’তলায় তাঁর চেম্বারটি আওয়ামী লীগের অফিস হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। সেই অফিস এবং পোষ্ট অফিস পাড়ার রওশন আলীর বাসভবন ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পরে স্বাধীনতা বিরোধী এবং অবাঙালীরা লুটপাট করা ছাড়াও পুড়িয়ে দেয়। ১৯৭২ সাল থেকে আবার আলী মঞ্জিলে আওয়ামী লীগের অফিস চালু হয়। তবে কখনোই আওয়ামী লীগের অফিস ভাড়া দেয়া লাগতো না। চাঁদ আলী বিশ্বাসের মৃত্যুর পর তাঁর মেয়ে শামসুন্নাহার আলী মঞ্জিলের উত্তর অংশের মালিকানা পান এবং তিনি ১৯৮৪ সালে এ ভবনের নিচতলার ভাড়াটিয়া বিশিষ্ট বন্দুক ব্যবসায়ী সৈয়দ সাইদুল হকের কাছে বিক্রি করে দেন। এরপর আওয়ামী লীগ অফিস তিন তলায় স্থানান্তর করা হয়।
শুধু আওয়ামী লীগ অফিস নয়, ঐতিহ্যবাহী এ ভবনে ন্যাপ, গণফোরামসহ অসংখ্য রাজনৈতিক দলের অফিস এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি-বর্গের চেম্বার ছিলো। অনেক কেন্দ্রীয় নেতা এ ভবনে এসে সভা-সমাবেশ করেছেন বহুবার। একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্থ মৌসুমী প্রিন্টিং প্রেস ছিলো এ ভবনের নিচতলায়। উদীচী যশোর জেলা সংসদ এই ভবনে ছিলো দীর্ঘদিন। সেই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি এবার ভেঙে ফেলা হবে।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু স্বাক্ষরিত একটি নোটিশ আলী মঞ্জিলের বর্তমান মালিক ও ভাড়াটিয়াসহ মোট ১১ জনকে দেয়া হয়। ১৬.০২. ০১২.২০১৩. ৬৩৪ (১২) নম্বর স্মারকের ঐ নোটিশে বলা হয়, ‘আপনাদের ভবনটি পুরাতন এবং জরাজীর্ণ। উক্ত ভবনের ছাদ এবং দেওয়ালে বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরে বিপদজনক অবস্থা ধারন করেছে। ভবনটি যে কোনো মুহূর্তে ধ্বসে পড়ে বসবাসকারীসহ পার্শ্ববর্তী ভবন এবং পথচারীদের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। অতএব অবিলম্বে উক্ত ভবনে বসবাস বন্ধ করে নোটিশ প্রাপ্তির ১৫ দিনের মধ্যে উক্ত জরাজীর্ণ ভবনটি ভেঙে সরিয়ে নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার জন্য বলা হলো’।
এ নোটিশ পাওয়া ১১ জন হলেন, সৈয়দ সাইফুল হক, শিরিন আক্তার, ফারুক আহম্মেদ তরু, বদরুল আলম, তবিবর রহমান/নুরুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, হাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, তফিকুর রহমান ও আজিজুল ইসলাম। তারা সকলেই নোটিশ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
বিষয়টি নিয়ে সৈয়দ সাইফুল হকের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এই প্রতিবেদককে জানান, নোটিশ পাওয়ার পর পৌর মেয়রের কাছে সময় চেয়েছেন। সময়মতই এটি অপসারণ করা হবে।
এ ব্যাপারে যশোর পৌরসভার মেয়র জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু বলেন, ফেব্রুয়ারিতে তাদেরকে ১৫ দিনের মধ্যে ভবনটি ভেঙে সরিয়ে নেয়ার নোটিশ দেয়া হলে তারা অফিস দোকান ইত্যাদি স্থানান্তরের জন্য জুন মাস পর্যন্ত সময় চান। সে পর্যন্ত তাদেরকে সময় দেয়া হয়েছে। এরপর তারা নিজ উদ্যোগেই ভবনটি ভেঙে সরিয়ে নেবে বলে কথা দিয়েছেন।
জনাব রেন্টু আরো বলেন, এ ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন গড়লে পৌরবাসী দু’ধরনের সুবিধা পাবেন। প্রথমত, এটি ধ্বসে বা ভেঙে পড়ে জনগণের জান-মালের ক্ষতি করবে না। দ্বিতীয়ত, এটি ভেঙে যখন নতুন ভবন গড়বেন, তখন মালিক পক্ষকে রাস্তা থেকে ৫ ফুট ছেড়েই প্লান করতে হবে। যাতে শহরবাসী একটি প্রশস্ত রাস্তা পাবেন এবং এখানে আর যানজট লাগবে না।  



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft