বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯
সারাদেশ
ঋণের দুষ্টচক্রে জিম্মি হয়ে পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের মধ্যবিত্তরা
ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :
Published : Thursday, 4 July, 2019 at 9:16 PM
ঋণের দুষ্টচক্রে জিম্মি হয়ে পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের মধ্যবিত্তরাআয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় দিশেহারা মধ্যবিত্তরা। সংসার চালাতে গিয়ে এরা শুধু হিমশিম খেতে হচ্ছে এমনটাই নয়, রীতিমতো বিপাকে পড়ে আছে। আর সন্তান-সন্ততির পড়াশোনা খরচসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করতে গিয়ে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এক সময় যারা ব্যয় বহন করে সামান্য হলেও পুঁজি সঞ্চয় করতো। এখন তারা ঋণের টাকাও শোধ করতে পারছে না।
আগের চাইতে দ্রব্য মূল্য বেড়েছে কয়েক গুণ। এছাড়া বাড়ি ভাড়াও বেড়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী আয় বাড়েনি অনেকের। এছাড়া মধ্যবিত্তদের কেউ কেউ শেয়ার বাজারে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব। অনেক দিন থেকে তারা দিশেহারা হয়ে আছে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে। সম্প্রতি ঋণ পরিশোধ না করতে পারায় আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ে।
দারিদ্র বিমোচন স্লোগান নিয়ে এনজিওগুলো সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ ও জটিল রোগের ফ্রি চিকিৎসা সহায়তার মত বিভিন্ন লোভনীয় কর্মসূচি থাকায় ঠাকুরগাঁও হয়ে জেলায় নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো আকৃষ্ট হয়ে ঋণের দুষ্টচক্রে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
ফলে জেলার নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো দারিদ্র বিমোচন না হয়ে এক বা একাধিক এনজিও'র ঋণের ফাঁদে আটকে পড়েছে। সর্বহারা ভূমিহীন কৃষক পরিবার নিয়ে কাজ করা এমন সংগঠনের দাবি এনজিওরা দারিদ্র বিমোচন করছেনা তৃণমূল মানুষের রক্তশোষণসহ ঘুম হারাম করে দিয়েছে। সরেজমিনে এ রকম চিত্রই পাওয়া যায়।
সদর উপজেলা নারগুন গ্রামের নারগিস ঋণগ্রস্ত জয়নাল-লিপি দম্পতি। জয়নাল পেশায় ভাড়াটে একজন অটো রিকশাচালক। বর্তমানে তার গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৪০ হাজার, আশা এনজিও ৪০ হাজার, সেস্নাভ বাংলাদেশ ৫০ হাজার, টিএমএসএস ৫০ হাজার ও বিআরডিবি থেকে ৪০ হাজার টাকাসহ মোট ঋণ নিয়েছেন ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। প্রতি সপ্তাহে তার কিস্তি মোট ৫ হাজার ৫শ’ টাকা। এ ঋণ গ্রহীতা রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪শ’ টাকা হিসাবে সপ্তাহে মোট ২ হাজার ৮শ’ টাকা আয় করেন।
এরমধ্যে চাল-ডাল, পান-সুপারিতে খরচ হয় ১ হাজার টাকা থেকে ১২শ’ টাকা পর্যন্ত। হাতে থাকে ১৬শ’-১৮শ’ টাকা। রিকশাচালক জয়নাল সপ্তাহের আয়ের সব টাকা দিয়ে কিস্তি দিলেও পরিশোধ হচ্ছে না তার সাপ্তাহিক কিস্তি।
পার্শ্ববর্তী বাড়ির নিজাম-নয়নতারা দম্পতি। পেশায় ভ্যানচালক। দৈনিক ৭/৮শ’ টাকা হিসাবে সাপ্তাহিক আয় ৪ হাজার ৯শ’ থেকে ৫ হাজার ৬শ’ টাকা পর্যন্ত। বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নেয়া তার সাপ্তাহিক কিস্তি দিতে হয় ১০ হাজার টাকার অধিক।
উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কালুক্ষেত্র গ্রামের নিজাম দরজি-সীমা বেগম ও পাশের গ্রামের মাহাবুল প্যাদা-হাসিনা বেগম একাধিক এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন। তাদের আয়ের চেয়ে সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা বেশি হওয়ায় অন্য এনজিও থেকে নতুন করে ঋণ নিয়ে পুরাতন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন।
জেলার ৫৩ টি ইউনিয়নে জয়নাল, নিজাম, নিজাম দরজি ও মাহাবুল প্যাদাসহ শত শত নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষগুলো ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। অপর দিকে ঋণের কিস্তি দিতে না পেরে প্রতিবছর এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যাচ্ছে।
গত একমাসে উপজেলা সদরের পারুল বেগম, কুলসুম, তহমিনা, রাবেয়া ও শুকানপুকুরি ইউনিয়নের অরুনা বেগম একাধিক এনজিও’র কিস্তি দিতে না পেরে ভিটে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এসব নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো একেকজনে ১০/১২ লাখ টাকা ঋণী বলে জানা যায়।
এ জেলায় ৫৩টি ইউনিয়নে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রায় অর্ধশত এনজিও দারিদ্র বিমোচনের শ্লোগানে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় ঋণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এছাড়া সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যুব উন্নয়ন, বিআরডিবি, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, সমাজ সেবা। এছাড়া বামে বেনামে অনেক সংস্থা উচ্চ গাবে সুদের উপর ঋণ প্রদান করছে অসহায় কৃষকদের।
ঋণগ্রস্ত কয়েকজন মানুষের সাথে কথা বললে তারা জানান, দ্রব্যমূল্য ও পরিবারের খরচ চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে সুদের উপর টাকা নিয়ে সমাধান চেষ্টা করি। পরে সেই সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে সবকিছু হারাতে হচ্ছে।
এনজিওগুলোর মধ্যে আশা, ব্র্যাক, ইএসডিও, টিএমএমএস ওপর গত একসপ্তাহ ধরে জরিপ চালানো হয়। এসব এনজিওদের ব্যবস্থাপকদের সাথে দারিদ্র বিমোচনের বিষয় কথা বললে তারা বলেন, একজন ঋণী প্রথম ঋণ নিয়ে পরিশোধ করে পুনরায় ঋণ নিয়ে থাকে। এতেই ওই ঋণী আগের চেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছে বলে তারা মনে করেন। এটাই হলো তাদের দারিদ্র বিমোচন।
এসব এনজিও, ১৫ জন থেকে ১০০ জনের সদস্য বিশিষ্ট একটি সমিতি করে ঋণ কার্যক্রম শুরু করার লক্ষে। ব্র্যাক এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। বর্তমানে তাদের এ জেলায় বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে। এসব শাখায় ৫০ হাজারের বেশি ঋণ গ্রহীতা রয়েছে। প্রায় ২শ' কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন বলে অফিস সূত্রে জানা গেছে । একটি বেঞ্চ অফিসে গিয়ে পাওয়া যায়নি ম্যানেজারকে মুঠোফোনে এরিয়া ম্যানেজার সাথে কথা বললে তিনি বলেন, মিডিয়া কর্মীকে কোন তথ্য দেয়া যাবে না কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া।
আশা এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি ৩৫ সদস্য বিশিষ্ট সমিতি নিয়ে। বর্তমানে জেলায় লক্ষাধিকের বেশি ঋণ গ্রহীতা রয়েছে।এসব সদস্যের মধ্যে ঋণ দেয়া হয়েছে ২৫০ কোটি টাকা।
জেলা সু'শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ বলেন, ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়াই হল দারিদ্র বিমোচন। বর্তমান অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে সরকার ও সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের সমন্বয় আর্থিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করলে অধিকাংশ লোক ঋণের বেড়াজাল থেকে বেড়িয়ে আসতে পারবে।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান শামীম হোসেন বলেন, এনজিওদের দারিদ্র বিমোচন স্লোগান কাগজপত্রেই রয়ে গেছে। তৃণমূল ভূমিহীন যারা এক সময় ঋণগ্রস্ত ছিলনা এনজিও ঘরে ঘরে গিয়ে তাদেরকে সু-কৌশলে ঋণী করা হয়েছে। এনজিওরা দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক কিস্তি টাকা আদায়ে করায় তাদের (ভূমিহীন দুস্থ মানুষ) আরামের ঘুম হারাম হয়েছে। কিস্তি আদায়ের জন্য থানা পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয় ঋণ গ্রহীতাদেরকে। এমন কি স্বামীর ভিটে বাড়ি স্ত্রীর নামে লিখে নেয় এবং ওই নারীকে ঋণ দিয়ে বসত ঘরের সামনে অমুক এনজিওর দায়বদ্ধ সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়। এনজিওরা দারিদ্র বিমোচন করছেনা বরং তৃণমূল মানুষের রক্ত শোষণ করছে।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft