সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোরের অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় ওষুধের ব্যবসা সহ্রাধিক ফার্মেসির ওষুধ ভয়ঙ্কর
জাহিদ আহমেদ লিটন
Published : Monday, 8 July, 2019 at 1:10 AM
যশোরের অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় ওষুধের ব্যবসা সহ্রাধিক   ফার্মেসির ওষুধ ভয়ঙ্করযশোরের সহ¯্রাধিক ফার্মেসির ওষুধ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। অনিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় ওষুধ রেখে বিক্রি করায় তা সেবনে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হবার আশংকা রয়েছে বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা না করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। 
ফার্মেসিতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ব্যবসায়ীরা তা মানছেন না। এতে নষ্ট হচ্ছে ওষুধের গুনগত মান। এ কারণে ওষুধের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 
ড্রাগ অ্যাক্ট ১৯৪০-এর বিধি ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২ এর শর্তে বলা হয়েছে, সাধারণ তাপমাত্রায় সংরক্ষণযোগ্য ওষুধ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং তাপ সংবেদনশীল ওষুধ সংশ্লিষ্ট লেবেলে নির্দেশিত তাপমাত্রায় সার্বক্ষণিক সংরক্ষণ করতে হবে। ডিপ ফ্রিজে ওষুধ সংরক্ষণ করা যাবে না। ফার্মেসিতে সংরক্ষিত তাপ সংবেদনশীল ওষুধের তালিকা প্রণয়ন করে প্রদর্শন করতে হবে। ড্রাগ লাইসেন্সের ৫ এর ধারায় এসব কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ নির্দেশনা যশোরের কোন ফার্মেসিতে মানা হয় না। ফার্মেসিগুলোতে সাধারণ তাপমাত্রায় ওষুধ রেখে বিক্রি করা হয়। নামমাত্র দোকানে রাখা হয় একটি ছোট্ট ফ্রিজ। তাতে রাখা হয় হাতে গোনা কয়েকটি ওষুধ। বাকি সব ওষুধ থাকে বাইরের র‌্যাকে সাধারণ তাপমাত্রায়। এ ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হচ্ছে ড্রাগ অ্যাক্ট। এর সাথে গুনগত মান নষ্ট হচ্ছে ওষুধের। অথচ দেশের বিভিন্ন কোম্পানির ওষুধের প্যাকেটে বা সিরাপের প্যাকেটে লেখা থাকে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করুন। এক্ষেত্রে এলাট্রল নামের সিরাপের প্যাকেটের গায়ে লেখা রয়েছে আলো ও আর্দতা থেকে দূরে, ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার নীচে রাখুন। এপালডন সিরাপের প্যাকেটে লেখা রয়েছে আলো থেকে দূরে, ঠান্ডা ও শুস্ক স্থানে রাখুন। 
প্রায় প্রতিটি কোম্পানির ওষুধের গায়ে নির্দেশনা লেখা থাকলেও কেয়ার করছেন না যশোরের ওষুধ ব্যবসায়ীরা। তারা এসব ওষুধ বর্তমান সময়ে প্রচন্ড গরমের মাঝেও দোকান ঘরে বা রোদের আলোয় রেখে দিচ্ছেন এবং অবলীলায় বিক্রি করছেন। এতে মানহীন হয়ে পড়ছে ওষুধ। আর সেবন করে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন রোগীরা।  
বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলেছেন, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় না রাখা ওষুধ সুচিকিৎসা নিশ্চিতে বাধা। এ ওষুধ সেবনে যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেটের পীড়াসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে মানুষ। 
তারা বলেছেন, ওষুধের প্যাকেটে লেখা থাকে ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ছায়ায় ওষুধ সংরক্ষণের কথা। কিন্তু আমাদের দেশে গ্রীষ্মকালে গড়ে তাপমাত্রা থাকে ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই অবস্থায় ওষুধগুলো যদি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে না রাখা হয়, তাহলে মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখের আগেই ওষুধ তার সঠিক কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে। 
ওষুধ সাধারণত তিন ধরনের তাপমাত্রায় সংরক্ষণের নিয়ম। বায়োলজিক্যাল বা ভ্যাকসিন-জাতীয় ওষুধ ৪ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ রাখতে হয় ১২ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। কিছু ওষুধ স্বাভাবিক তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা যায়। এর ব্যতিক্রম হলেই সমস্যা। কারখানায় মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন হলেও তাপমাত্রা অনিয়ন্ত্রিত ফার্মেসি থেকে এসব ওষুধ সংগ্রহ করে রোগীরা মানসম্পন্ন ওষুধ গ্রহণ করতে পারছেন না। ফলে রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
যশোরের কয়েকজন ফার্মেসি মালিক বলেন, ইনসুলিন, ভ্যাকসিনসহ আরও কিছু ওষুধ ফ্রিজে রাখা হয়। তবে অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ওষুধ সেলফেই রাখা হয়। অথচ এসব রাখতে হয় ১২ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ওষুধের মান নষ্ট হচ্ছে কিনা, সে বিষয়টি তারা এড়িয়ে যান। এদিকে, শহরের ফার্মেসিগুলোতে ফ্রিজের দেখা মিললেও শহরতলী ও গ্রামাঞ্চলের ওষুধের দোকানে দেখা পাওয়া যায় না। সেখানে কোন ওষুধের তাপ নিয়ন্ত্রণের কোন বালাই নেই। তাপ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তারা জানেন না।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ড্রাগিস্ট এন্ড কেমিস্ট সমিতি যশোর জেলা শাখায় ৮টি উপজেলা এলাকায় সাড়ে ৫শ’ সদস্য অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে সমিতির ভোটার রয়েছেন ৩৭৭ জন। এছাড়া ৮টি উপজেলা এলাকায় গ্রাম্য ডাক্তার সমিতির সদস্য রয়েছেন ৫ শতাধিক। সব মিলিয়ে গোটা জেলায় সহ¯্রাধিক ওষুধ ফার্মেসি রয়েছে। অথচ এসব ফার্মেসিতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। দোকানের খোলাস্থানে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ওষুধ রেখে বিক্রি করা হয়। যা নিয়ন্ত্রণে কোন পদক্ষেপ নেই ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর যশোরের। ফলে ড্রাগ লাইসেন্সের আইন না মেনে প্রশাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও ওষুধ ব্যবসা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে যশোর ড্রাগিস্ট এন্ড কেমিস্ট সমিতি। সমিতির নেতৃবৃন্দ ফার্মেসি মালিকদের ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে ব্যবসা করার অনুরোধ জানাচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ড্রাগিস্ট এন্ড কেমিস্ট সমিতি যশোর জেলা শাখার সহ-সভাপতি আব্দুল হামিদ চাকলাদার ইদুলের সাথে। তিনি বলেন, বর্তমান কমিটির নেতৃবৃন্দ ফার্মেসি মালিকদের এ ব্যবসায় সচেতন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ, ডাক্তারের স্যাম্পল বিক্রি বন্ধ ও প্রতিটি ফার্মেসি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এছাড়া সম্প্রতি ঔষধ প্রশাসন কর্তৃক পাঠানো নোটিশ যশোরের সকল ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।  
এ ব্যাপারে যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন হারুণ অর রশীদ বলেন, ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে বা টিনের ঘরের দোকানে ড্রাগের ব্যবসা করলে অবশ্যই ওষুধের কার্যকারিতা হারাবে। আর দীর্ঘদিন র‌্যাকে ওষুধ রাখা হলে তার কার্যকারিতা হারিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে রোগ প্রতিষেধক হিসেবে সংশ্লিষ্ট ওষুধ কাজ করে না। আমাদের অঞ্চলে বর্তমানে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে অবশ্যই ওষুধ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হবে। নতুবা ওইসব ওষুধ খেয়ে রোগীর কোন কাজ হবে না। ওষুধ রোগ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করবে না। এতে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে। পেটের পীড়াসহ মানুষের নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে যশোরের ড্রাগ সুপার রেহান হাসান বলেন, যেসব ওষুধ ফ্রিজে রাখার নিয়ম রয়েছে। সেসব ওষুধ যেন বাইরে রাখা না হয়। তাতে বর্তমান তাপমাত্রায় ওষুধের কার্যকারিতা হারাবে। এ জাতীয় কোন ঘটনা ঘটলে অবশ্যই পদক্ষেপ নেবে যশোর ওষুধ প্রশাসন।





সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft