বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
বাঘারপাড়ায় শিক্ষার আলো জ্বালাচ্ছে আজাদের বাতিঘর
চন্দন দাস, বাঘারপাড়া (যশোর) থেকে :
Published : Thursday, 11 July, 2019 at 6:17 AM
বাঘারপাড়ায় শিক্ষার আলো জ্বালাচ্ছে আজাদের বাতিঘরবাতিঘর শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে একটি বিচ্ছুরিত আলোকচ্ছটা। একসময় রাতে জাহাজের গতিপথ নির্ণয়ের জন্যে এই আলোক নির্দেশিকা ব্যবহৃত হতো। কোনও মানুষ যদি জ্ঞানের আলো ছড়ায়, মানুষের চোখ খুলে দেয়ার পথ দেখায়, সমাজকে আলোকিত করতে চায়, আমরা তাকে ‘বাতিঘর’ বলতেই পারি।
আজাদ আলী এমনই একজন মানুষ, যিনি সমাজে অবহেলিত শিশুদের জ্ঞানের আলো ছড়াতে দিবানিশি পরিশ্রম করছেন। তিনি একজন তরতাজা যুবক, যার কাজ হচ্ছে অর্থনৈতিক কারণে শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরে যাওয়া শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা, শিক্ষার উপকরণসহ তাদের আলোকিত করা। যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার মহিরণ গ্রামের বাসিন্দা আজাদ। তিনি এই উপজেলার তিনটি গ্রামের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কল্যাণার্থে নিজগ্রাম মহিরণে গড়ে তুলেছেন বাতিঘর সমাজ উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। যেখানে প্রায় ১০০ শিশুকে পড়ানো হয় নামমাত্র টাকায়। ৫০ টাকায় প্রাইভেট (অনেক শিশুর কাছ থেকে এ টাকা নেয়া হয় না) পড়ার পাশাপাশি প্রতি মাসে শিক্ষা উপকরণ পেয়ে খুশি এসব শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া এ সংগঠনের পক্ষে (পৌরসভা এলাকা বাদে) মহিরণ দোহাকুলার আংশিক ও শালবরাট গ্রামের পিএসসি, জেএসসি বা জেডিসি এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নিয়মিত দেয়া হয় শিক্ষা উপকরণ। তিনজন শিক্ষক স্বেচ্ছায় এসব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত রয়েছেন।
লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিবেশ উন্নয়ন, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের ব্যবস্থাসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মকান্ডেও সম্পৃক্ত করা হয় তাদের। আর নিরক্ষর ব্যক্তিদের সাক্ষর করাতে সহায়তা করে থাকে এ সংগঠনটি। এ পর্যন্ত ১৯ জন সাক্ষর জ্ঞান লাভ করেছেন তাদের কাছ থেকে। এছাড়া এ পর্যন্ত উপজেলার ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ১৫ জন গুণী মানুষকে সংবর্ধণা দিয়েছে আজাদের বাতিঘর। এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যাশাও রয়েছে সেচ্ছাসেবী এ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আজাদ আলীর।
দোহাকুলা গ্রামের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র খালিদ হাসান জানায়, এখানে পড়ি তাই আমাদের অন্য জায়গায় প্রাইভেট পড়তে হয় না। ক্লাসের পড়ার বাইরে অনেক কিছু শিখতে পারি। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র শালবরাট গ্রামের রিফাত হাসান জানায়, ক্লাস থ্রি থেকে সে এখানে পড়ছে মাসে ৫০ টাকা দিয়ে। প্রতিমাসে বিনামূল্যে খাতা-কলম পেয়ে থাকে সে।
২০১৩ সাল থেকে স্বেচ্ছায় এখানে শিক্ষাদানে নিয়োজিত রয়েছেন যশোর এমএম কলেজের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স করা যুবক ইসতিয়াক আহমেদ। তিনি বলেন, এটি আজাদ ভাইয়ের একটা মহতী উদ্যোগ। এর সাথে থাকতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি।  
অভিভাবক মহিরণ গ্রামের মাহফুজুর রহমান জানান, এখানে লেখাপড়ার মান অনেক ভালো। এখানে ৫০ টাকায় যেভাবে পড়ানো হয়, অন্যত্র এক হাজার টাকায়ও এমন গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয় না। তার দুই মেয়ে নাজমুন নাহার ও টিবুন নাহার এ প্রতিষ্ঠানে পড়ে ভালো রেজাল্ট করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা এখন ৬ষ্ঠ ও ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। এছাড়া একমাত্র ছেলে ৪র্থ শ্রেণির ছাত্র মুজাহিদুল ইসলাম এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র। আরেক অভিভাবক জাকির হোসেন জানান, একগাদা টাকা দিয়ে প্রাইভেট পড়ানোর সঙ্গতি নেই। তাই ৫০ টাকায় মেয়েকে এখানে প্রাইভেট পড়িয়েছি। মেয়ে ৫ম শ্রেণিতে এ-প্লাস পেয়েছে।
২০১০ সালের কথা। যশোর সরকারি এমএম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে থাকাকালে স্বপ্নের শুরু বাঘারপাড়া উপজেলার মহিরণ গ্রামের নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আজাদ আলীর। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তানদের অর্থাভাবে লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার খবর তাকে পীড়া দেয়। অনেকটা দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই সিদ্ধান্ত নেন তার নিজ এলাকার দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু একটা করার। আর সেখান থেকেই শুরু। এ কাজে আজাদকে উৎসাহ যোগায় স্থানীয় কিছু যুবক। গঠন করা হয় ২৫ জনের একটি গ্রুপ। তারা মাসিক ১২ টাকা করে চাঁদা তুলে তা জমাতে থাকে। দু’বছর পর বেশকিছু টাকা জমে। এ টাকা দিয়ে পরিত্যক্ত জায়গায় তৈরি করা হয় দুটি টিনশেড ঘর। সেখানে পড়ানো হয় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের। সকাল সাড়ে ৬ টা থেকে সাড়ে ৮ টা পর্যন্ত। স্কুল শুরুর আগে ছেড়ে দেওয়া হয় তাদের। এছাড়া পরীক্ষার দুই মাস আগে থেকে পিএসসি পরীক্ষার্থীদের বিশেষ নজরদারিতে রাখতে শুরু করে তারা। এসময় সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পড়ানো হয় এসব শিক্ষার্থীদের।
যশোর এমএম কলেজ থেকে ২০১৫ সালে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করার পর আজাদ একটি কোম্পানিতে কিছুদিন চাকরি করেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে চাকরিটি ছেড়ে দিতে হয়। নানা প্রতিকুলতার মাঝেও সংগঠনটির ধারাবাহিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছেন আজাদের বন্ধু-স্বজনরা। পাশে থেকে উৎসাহ দিয়ে আসছেন ঢাকায় একটি ক্যান্সার হাসপাতালের সেবিকা হিসেবে কর্মরত আজাদের স্ত্রী নাসরিন সুলতানা। আজাদ আলী সম্প্রতি ঢাকায় রাইড শেয়ারিংয়ের (উবার) ব্যবসা শুরু  করেছেন। রাজধানীতে বসেই সংগঠনটির তদারকি করে থাকেন। মাসে ৫ থেকে ৬ বার এলাকায় আসেন শিশু শিক্ষার্থীদের সাথে সময় কাটাতে। আজাদ বলেন, আমি কৃষক পরিবারের সন্তান। দরিদ্র পরিবারের সীমাবদ্ধতার কথা আমার অজানা নয়। এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অর্থের অভাবে ঠিকমত লেখাপড়া করতে পারে না। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতেই পরিবারের হিমিশিম খেতে হয়। প্রাইভেট বা কোচিং করার সামর্থ না থাকায় তাদের অনেক মেধাবী শিশু ঝরে পড়ে। ওইসব শিশুদের কথা চিন্তা করেই এ উদ্যোগ। প্রথমে কাজটি কঠিন মনে হলেও এখন বেশ ভালো লাগছে। নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ও বন্ধু-স্বজনদের সহায়তায় চালানো হয় বাতিঘরের কার্যক্রম।
সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, আজাদ আলীর এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। অনেকে যা পারেন না-আজাদ তা পেরেছেন। একটি এলাকার শিক্ষার মান উন্নয়ন হলে সে এলাকার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি হয়। বাতিঘর সে কাজটিই করছে।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft