বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
চৌগাছাবাসীর কাছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিউজিয়াম ও ভাস্কর্য আর স্বপ্ন নয়
শাহানুর আলম উজ্জ্বল, চৌগাছা (যশোর) থেকে :
Published : Thursday, 11 July, 2019 at 6:17 AM
চৌগাছাবাসীর কাছে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিউজিয়াম ও ভাস্কর্য আর স্বপ্ন নয়যশোরের চৌগাছার রণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত সিংহঝুলী ইউনিয়নের মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গনটি গৌরবোজ্জ্বল হতে চলেছে। এ অঞ্চলের দেশপ্রেমী, মুক্তিযোদ্ধা ও গণমানুষের কাঙ্খিত স্বপ্ন এখন পূরণের পথে। আর এই স্বপ্নটি পূরণ করছে বর্তমান সরকারের মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়। ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিউজিয়াম নির্মানের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্যের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আর এই মিউজিয়াম ও ভাস্কর্যটি নির্মিত হলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এলাকার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে পারবে বলে এলাকাবাসী জানান।
সারাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্ত¯œাত স্মৃতি বিজড়িত স্থান সংরক্ষণের জন্য বিগত মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তারই আলোকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে তালিকা আহবান করা হয়। বিগত সংসদ সদস্য যশোর-২ চৌগাছা-ঝিকরগাছা আসনের অ্যাড. মনিরুল ইসলাম মনির মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণ ও রামকৃষ্ণপুর এলাকার বদ্ধভূমির নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠান। এই তালিকা যাচাই বাছাই শেষে দুটি ঐতিহাসিক স্থানের জন্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের নাম দেয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিউজিয়াম। এছাড়া ভাস্কর্য নির্মাণের জন্য আরো একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। গত ১৪ এপ্রিল সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফুল আলম ঐতিহাসিক যুদ্ধক্ষেত্র সিংহঝুলী ইউনিয়নের মুক্তিনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ভিত্তি প্রস্তরের উদ্বোধন করেন। ইতোমধ্যে স্মৃতি মিউজিয়াম ও ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মিউজিয়াম ও ভাস্কর্যের বিষয়টি জানতে গেলে, এলাকার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানা স্মৃতি তুলে ধরেন। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাসিনুর রহমান বলেন, এই গ্রামটির নাম জগন্নাথপুর। গ্রামটিসহ এলাকা হানাদারমুক্ত হয় ২২ নভেম্বর। তিনি বলেন, মিত্র বাহিনী ও মুক্তি বাহিনী এবং পাক সেনাদের যুদ্ধের গোলাগুলি ও রসদ ফুলিয়ে গেলে তুমুল যুদ্ধসহ এই মাঠে মল্লযুদ্ধ (হাতাহাতি) হয়। উভয় পক্ষ অস্ত্রের বাট, বেয়নেট, কিল, ঘুষি, লাথি এমনকি কুস্তাকুস্তির মাধ্যমে পরস্পরের সাথে যুদ্ধ করে। যুদ্ধের ধরণ ও প্রকৃতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেটা যুদ্ধের ইতিহাসে দেশের আর কোথাও হয়নি। এ দিন তীব্র লড়াইয়ের পর পাকিস্থানী সৈন্যরা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। সে কারনে এই মাঠটি ঐতিহাসিক। এছাড়া এখানকার যুদ্ধে পাকসেনাদের ৭টি ট্যাংক ধ্বংস করে দেয় মিত্র ও মুক্তি বাহিনী। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মিউজিয়াম ও ভাস্কর্য নির্মিত হলে আমাদের জাতীয় জীবনে ব্যাপক সাড়া পড়বে। নতুন প্রজন্মসহ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।
গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মোশারফ হোসেন বলেন, জগন্নাথপুরের যুদ্ধ ছিল ভয়াবহ। এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় এই গ্রামে। তিনি বলেন, দফায় দফায় যুদ্ধের পর মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের পরাস্থ করার জন্য শুরু করা হয় আকাশযুদ্ধ। মুহুর্তের মধ্যে পাক জঙ্গি বিমান জগন্নাথপুর মাঠসহ চৌগাছার আকাশ প্রকম্পিত করে তোলে। মুর্হুমুহু গুলিতে বিধস্থ করার চেষ্টা করা হলেও ভারতীয় বিমানের কাছে পরাস্থ হয় পাক বিমান। তিনি আরো বলেন, বারবার বাঁধার মুখে পাক বিমান চৌগাছার আকাশে বেশিক্ষণ উড়তে পারেনি। মিত্র বাহিনী দুটি বিমানকে ভূপাতিত করে দুজন পাইলটকে আটক করে। ২২ নভেম্বর পুনরায় শুরু হয় কামান যুদ্ধ। এই যুদ্ধে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর অতর্কিত হামলায় পাক সেনারা দিশেহারা হয়ে বিদ্ধস্ত ৭টি ট্যাংক, বাকসো ভরা মার্কিন চাইনিজ অস্ত্রসস্ত্র ফেলে রেখে যশোর সেনানিবাস অভিমুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক ও গ্রামের বাসিন্দা ইজারুল ইসলাম বসির বলেন, এই যুদ্ধে কমপক্ষে দুই থেকে আড়াই’শ পাকসেনা মৃত্যুবরণ করে। এছাড়া এলাকার ৫৭ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ জনগন শহীদ হন। তাদের মধ্যে ১৯ জন নিহতের নাম আমরা জানতে পেরেছি। তিনি বলেন, নিহতরা হলেন সুজাউদ্দৌলা, আসাদুজ্জামান মধু, আব্দুর রাজ্জাক, আবুল হোসেন, রেজাউল হোসেন, করিমন নেছা, মহিউদ্দীন, রহিমা খাতুন, ভানু বিবি, ছইরন নেছা, দেওয়ান মুন্সি, কফিল উদ্দীন, বিশু মন্ডল, খোকা বারিক, আলতাপ হোসেন, জহির উদ্দীন, হাসান আলী, আয়শা আক্তার ও তাহের আলী।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাজান আলী, সিনিয়র শিক্ষক আক্কাচ আলী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক লিয়াকত আলী বলেন, এই এলাকার যুদ্ধের কথা মনে হলে গা শিউরে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মিউজিয়াম ও ভাস্কর্য নির্মিত হলে এলাকার নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে পারবে। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে এমন পরিকল্পনার জন্য বর্তমান সরকারকে তাঁরা ধন্যবাদ জানান।
ভাস্কর্য নির্মানের বিষয়ে চিত্র ও ভাস্কর্য শিল্পী আতিয়ার রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্পে ভাস্কর্যের কোন নামকরণ করা হয়নি। কিন্তু শিল্পীসত্তা থেকে আমি ভাস্কর্যটির নাম দিয়েছি ‘দূর্বার’। ইতোমধ্যে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ইতোপূর্বে নানাভাবে বিকৃতি করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহন করে তা বাস্তবায়ন করছেন। এ সময় তিনি ভবিষ্যতে স্থাপনা নির্মানের পর সেটি সংরক্ষণ ও রক্ষাবেক্ষনের জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান।
যশোর-২ চৌগাছা-ঝিকরগাছা আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ডাঃ নাসির উদ্দিন বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা ও নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশকে পেয়েছি। সেই গৌরবময় ইতিহাস আমাদের সকলকে জানতে হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার চাচ্ছেন প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দেশের মানুষ জানতে পাক। কেননা একটি গোষ্টি বারবার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে জাতির সাথে বেইমানি করেছে। তাই সেটা আর করতে দেয়া যাবে না। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি মিউজিয়াম ও ভাস্কর্য নির্মিত হলে ছেলে-মেয়েরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft