শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৯
সারাদেশ
খাস কামরায় বিচারকের সামনে আসামিকে হত্যা
কাগজ ডেস্ক :
Published : Monday, 15 July, 2019 at 5:08 PM
খাস কামরায় বিচারকের সামনে আসামিকে হত্যাকুমিল্লা আদালতে বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে একটি হত্যা মামলার আসামিকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছে অপর আসামি। গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌসের আদালতে এ ঘটনা ঘটে। মামলার আইনজীবী অ্যাসিস্টেন্ট পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) নূরুল ইসলাম এ কথা জানান।
নিহত ফারুক কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কান্দি গ্রামের অহিদ উল্লাহর ছেলে। ঘাতক হাসান কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার ভোজপাড়া গ্রামের শহিদ উল্লাহর ছেলে।
আইনজীবী (এপিপি) নূরুল ইসলাম জানান, ২০১৩ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের কান্দি গ্রামে হাজী আব্দুল করিমকে হত্যার ঘটনা ঘটে। সোমবার ওই মামলার জামিনে থাকা আসামিদের হাজিরার দিন ধার্য ছিল। বেলা ১১টার দিকে এ মামলার আসামিরা আদালতে প্রবেশের সময় ৪নং আসামি ফারুককে ছুরি নিয়ে তাড়া করে ৮নং আসামি হাসান। এ সময় জীবন বাঁচাতে ফারুক বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে যায়। হাসান সেখানে ঢুকে টেবিলের ওপর ফেলে ফারুককে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে।
ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ফারুককে ওই কক্ষের ফ্লোরে ফেলেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এ সময় আদালতে অন্য একটি মামলার হাজিরা দিতে আসা কুমিল্লার বাঙ্গরা থানার এএসআই ফিরোজ এগিয়ে গিয়ে হাসানকে আটক করে। এ সময় আদালতকক্ষে বিচারক, আইনজীবী ও অন্য আসামিদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গুরুতর আহত ফারুককে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।  
কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম জানান, একই মামলার এক আসামি অন্য আসামিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। আসামিকে আটক করা হয়েছে।
হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিলেন প্রত্যক্ষদর্শী
পুরো হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিয়ে কুমিল্লার পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) নুরুল ইসলাম জানান, ‘অন্যান্য দিনের মতোই কাজ শুরু হয়েছিল কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। শুনানির তারিখ অনুযায়ী অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (তৃতীয়) আদালতে ছয় বছর আগের একটি হত্যা মামলার তিন আসামিকে হাজির করা হয়। গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে বিচারক এজলাসে আসেন। চেয়ারে বসে মামলার কাগজপত্র হাতে নেন। ঠিক ওই সময় মামলার চার নম্বর আসামি ফারুককে ছুরিকাঘাত করে আট নম্বর আসামি হাসান। জীবন বাঁচাতে ফারুক এজলাসে উঠে পড়েন, বিচারকসহ আইনজীবীরা ছোটাছুটি শুরু করেন। দৌঁড়াতে থাকে ফারুকও। বিচারকের খাস কামরার দিকে ছুটে যান তিনি। পেছন পেছনে দৌঁড়ে আসে হাসানও। এসে ফারুককে বিচারকের টেবিলের ওপর ফেলেই ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে হাসান। আদালতে অন্য একটি মামলার হাজিরা দিতে আসা কুমিল্লার বাঙ্গরা থানার এএসআই ফিরোজ এগিয়ে গিয়ে হাসানকে আটক করেন’।
এই ঘটনার পর বিচারক, আইনজীবী, আদালতপাড়াসহ পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলেও জানান এপিপি। এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।  
হত্যাকারী হাসান ও নিহত ফারুক একই মামলার আসামি ও সম্পর্কে মামাতো-ফুফাতো ভাই। নিহত ফারুক কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কান্দি গ্রামের অহিদ উল্লাহর ছেলে। ঘাতক হাসান কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার ভোজপাড়া গ্রামের শহিদ উল্লাহর ছেলে।
এপিপি নুরুল ইসলাম জানান, ২০১৩ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের কান্দি গ্রামে হাজী আব্দুল করিম হত্যার ঘটনা ঘটে। সোমবার ওই মামলার জামিনে থাকা আসামিদের হাজিরার দিন ধার্য ছিল। এ মামলায় ফারুক ও হাসানসহ তিন আসামি আদালতে হাজির হয়। বাকি পাঁচ আসামি পালাতক। রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী না থাকায় সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। তবে, বিচারক কাজ শুরুর আগেই চোখের পলকে হত্যাকা- ঘটে যায়। তিনি বলেন, ‘আদালতের ভেতরে থাকা দুই-তিন জন পুলিশ চেষ্টা করলে অভিযুক্তকে আটকাতে পারতেন। কিন্তু তাদের কোনও ভূমিকাই ছিল না।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার
কী কারণে হত্যা
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ নেওয়াজ সুলতানা বলেন, ‘সম্পত্তির বিরোধ নিয়ে ২০১৩ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের কান্দি গ্রামে হাজী আব্দুল করিমকে হত্যা করা হয়। আব্দুল করিম আসামি হাসানের নানা। নিহতের ফারুকের দাদা। হত্যাকা-ের পরই একটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলার চার নম্বর আসামি ছিল ফারুক। ২০১৫ সালে মামলার চার্জশিট হওয়ার সময় ফারুকের দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে হাসানের নাম উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে ওই মামলায় হাসানকে ৮ নম্বর আসামি করা হয়।’
এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘ফারুকের উদ্দেশে হাসান বলে, তোর কারণে আসামি হয়েছি। একথা বলার পরই ফারুককে ছুরিকাঘাত করে হাসান। এতে বোঝা যায়, ফারুক কেন জবানবন্দিতে হাসানের নাম বলেছে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রতি হাজিরায় দেখতাম তারা একসঙ্গে এসে হাজিরা দিয়ে আবার চলে যায়। কখনও এমন বিরোধের কথা শুনিনি। তাদের মধ্যে অন্য কোনও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে কিনা, আমি বলতে পারবো না।’
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় প্রশ্ন
কাঠগড়া ও এজলাস অতিক্রম করে বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে আসামি হত্যার ঘটনায় আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন যেমন উঠেছে, তেমনি অভিযোগ উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও। এ প্রসঙ্গে কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আদালতে বিচারপ্রার্থীসহ সবার নিরাপত্তায় নির্দিষ্ট পরিমাণের কিছু পুলিশ মোতায়েন থাকে। জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে শুরু করে ১৭ উপজেলার পৃথক প্রত্যেকটি আদালতে দুই থেকে তিন জন পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকেন। আসামি আনা-নেয়াই তাদের কাজ। আদালত প্রাঙ্গণে প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণের মানুষ আসা-যাওয়া করে। সবার নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের জনবল সংকট রয়েছে।’
পুলিশ সুপার আরও বলেন, ‘আদালতে আইনজীবীদের সঙ্গে পুলিশের কিছু সমস্যা রয়েছে। সেই বিষয়গুলোসহ অন্যান্য সমস্যা জেলা জজের সঙ্গে বসে মীমাংসা করা হবে। এছাড়া, আদালতে কিভাবে আরও নিরাপত্তা বাড়ানো যায়, সেই বিষয়েও কথা হবে।’
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে বিচারকও
এই হত্যাকা-ের ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে খোদ বিচারকের মনেও। এই প্রসঙ্গে কুমিল্লা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালতের বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌস বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো আমি খাস কামরা থেকে এজলাসে উঠে বিচার কাজ পরিচালনা করি। আজ সকাল ১১টায় এজলাসে উঠে আমি ওই হত্যা মামলাটির কাগজপত্র হাতে নেই। ঠিক ওই সময় চিৎকার শুরু হয় বাঁচাও বাঁচাও করে। এমন সময় দেখতে পেলাম একজন অন্যজনকে ধাওয়া করছে। আইনজীবী, বিচারপ্রার্থীসহ সবার মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এরপর দেখলাম আমার খাস কামরায় ঢুকে এক আসামি অন্য আসামিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করছে। এই হত্যার শিকার আমি, আমার কোনও সহযোগী বা কোনও আইনজীবীও হতে পারতেন। আমরা আসলেই নিরাপত্তায়হীনতায় আছি। আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?’
পুলিশের কমিটি
এই হত্যাকা- খতিয়ে দেখতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. সাখাওয়াত হোসেনকে। অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) তানভীর সালেহীন ইমন এবং ডিআইও-১ মাহবুব মোর্শেদ।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft