বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোর-খুলনা ও বেনাপোল মহাসড়ক ডাবল লেন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার কাজে গোজামিল
জাহিদ আহমেদ লিটন :
Published : Tuesday, 6 August, 2019 at 6:17 AM
সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার কাজে গোজামিলযশোর-বেনাপোল ও খুলনা মহাসড়ক উন্নয়নের সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার কাজ গোজামিল দিয়ে চলছে। উন্নয়নের চরম দুর্ভোগ যশোরবাসী পোহালেও কাঙ্খিত মানে কাজ হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। সড়ক দুটির ৭৬ কিলোমিটার নতুন করে ভিত তৈরির কাজে পুরাতন ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। আর নতুন বালির পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে পুরাতন রাস্তা খুঁড়ে উঠানো মাটি মিশ্রিত বালি ও স্থানীয় ভিত বালি।
গত এক বছর যাবৎ এ অনিয়ম চললেও কর্তৃপক্ষের তেমন কোন পদক্ষেপ কারো চোখে পড়েনি।
সূত্র জানায়, যশোর-খুলনা মহাসড়কের ৩৮ কিলোমিটার উন্নয়নে ৩২১ কোটি টাকা ও যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ৩৮ কিলোমিটার উন্নয়নে ৩২৮ কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে বরাদ্দ করা হয়। সড়ক দুটিই নতুন করে ডাবল লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। খুলনা মহাসড়কটি শহরতলীর পালবাড়ি মোড় থেকে শুরু হয়ে অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ার রাজঘাট পর্যন্ত নতুন করে নির্মিত হচ্ছে। আর বেনাপোল মহাসড়কটি শহরের দড়াটানা মোড়ের মুজিব সড়ক থেকে শুরু হয়ে বেনাপোল চেকপোস্ট নোম্যান্স ল্যান্ড পর্যন্ত যাবে। দুটি সড়কই দু’পাশে ৫ ফুট করে বাড়ানো হচ্ছে।
যশোরবাসীর অভিযোগ, এ অঞ্চলে সড়ক পথে চলাচলে এক সময়কার যন্ত্রণার নাম ছিল যশোর-খুলনা ও বেনাপোল মহাসড়ক। এ দুটি সড়কে চলাচল করতে গিয়ে মানুষকে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সে যন্ত্রণার কোন ভাষা ছিল না। বছরের পর বছর মানুষকে এ সড়কে যাতায়াতে যন্ত্রণার আগুনে পুড়তে হয়েছে। বড় বড় গর্ত ও খানা খন্দে ভরা ছিল সড়ক দুটি। যানবাহন চলাচলে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে। টায়ার ফেটে, এক্্েরল ও স্প্রিংপাতি ভেঙ্গে রাস্তার পাশে উল্টে পড়েছে। হরহামেশা দুর্ঘটনায় বাস যাত্রীরা আহত হয়েছেন ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ওই সময়কার এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য যশোর সড়ক বিভাগ নতুন ফর্মুলা আবিস্কার করে। তারা সড়কের বড় বড় গর্তে আদলা ইট ফেলে ও পিচ উঠে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্থ অংশে ইটের সোলিং করে খানিকটা চলাচল উপযোগী করে। বর্তমানে যশোরবাসী সে যন্ত্রণা থেকে খানিকটা মুক্তি পেয়েছে। চলছে যশোরের আলোচিত মহাসড়ক দুটির উন্নয়ন কাজ। বর্তমানে এ কাজের এক-তৃতীয়াংশ শেষ হয়েছে বলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দাবি করেছেন।সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার কাজে গোজামিল
যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, যশোর-খুলনা ও যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ৩৮ কিলোমিটার করে মোট ৭৬ কিলোমিটার ডাবল লেনের উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে ৬৪৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে বেনাপোল সড়কে ব্যয় ৩২৮ কোটি টাকা ও খুলনা সড়কে ব্যয় ৩২১ কোটি টাকা। খুলনা সড়কটি শহরতলীর পালবাড়ি মোড় থেকে চাঁচড়ামোড় হয়ে নওয়াপাড়ার রাজঘাট পর্যন্ত যশোর অংশের ৩৮ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন কাজ গত জুলাই মাস থেকে শুরু হয়েছে। সড়কটি দুটি প্যাকেজে উন্নয়নের কাজ করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ও খুলনার তাহের এন্ড ব্রাদার্স, মাহবুব এন্ড ব্রাদার্স, তমা কনস্ট্রাশন এন্ড কোং।
তিনি বলেন, সড়কটি বর্তমানে ২৪ ফুট চওড়া রয়েছে। এটি আরো ১০ ফুট উন্নীত করে ৩৪ ফুট চওড়া ও দুই লেন করা হবে। এক্ষেত্রে সড়কের নতুন করে ভিত তৈরি করা হচ্ছে। সড়কটি সাড়ে ৪ ফুট থেকে ৫ ফুট গর্ত করে প্রথমে বালি ফিলিং, পরে বালি ও খোয়া এবং শেষে বালি ও পাথর মিশিয়ে ভরাট করা হবে। এরপর বিটুমিন সারফেজ ৫ ইঞ্চি দিয়ে কাজ শেষ করা হবে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে কাজ শেষ করার নিদের্শনা রয়েছে।  
নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন আরো জানান, যশোর-বেনাপোল সড়কটিও ডাবল লেনে উন্নীত হচ্ছে। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এর কাজ শুরু হয়েছে। ডাবল লেনের অর্থ চার লেন নয়। সড়কটি সর্বসাকুল্যে ১০ফুট চওড়া হচ্ছে। মাঝখানে কোন ডিভাইডার থাকছে না। দুটি প্যাকেজে সড়কটির ৩৮ কিলোমিটার জুড়ে এ উন্নয়ন কাজ করা হবে। মোট ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি ২৪ ফুট থেকে ৩৪ ফুটে উন্নীত করা হচ্ছে। সড়কের দু’পাশেই ৫ ফুট করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আর সড়কটি খুঁড়ে সাড়ে ৪ থেকে ৫ ফুট গর্ত করে ভিত তৈরি করা হচ্ছে। এ গর্তে প্রথমে বালি ফিলিং ও পরে খোয়া ও পাথর মিশ্রিত বালি ফিলিং এবং পরে ৩ থেকে ৫ ইঞ্চি বিটুমিন সারফেজ (পিচ ও পাথরের আস্তরণ) দেয়া হচ্ছে। এ কাজও চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবার নির্দেশনা রয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, বেনাপোল সড়কের পুরনো ঐতিহ্যবাহী গাছগুলো রেখেই ডাবল লেন করা হচ্ছে। তবে গাছ থাকার কারণে সড়কটির কোন কোন অংশে চওড়া কমবেশী হচ্ছে। যেখানে গাছ নেই, সেখানে সর্বোচ্চ ৩৪ ফুট চওড়া হবে ও যেখানে গাছ রয়েছে সেখানে সাধ্য অনুযায়ী চওড়া করা হবে। এ কারণে সড়কটি সমান্তরাল চওড়া হচ্ছে না।
এদিকে, সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক দুটির কাজের শুরুতেই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘাপলাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়ক উন্নয়নের এ কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্রের কোন নিয়মনীতি মানছেন না। তারা গোজামিল দিয়ে ইচ্ছামত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঠিকাদাররা সড়কের পুরনো বৃটিশ আমলের লোনা ধরা ইট ও খোয়া তুলে সেটাই আবার ভেঙ্গে গর্তে ব্যবহার করছেন। যা তারা কোনভাবেই ব্যবহার করতে পারেন না বা দরপত্রে বলাও হয়নি।
এছাড়া, সড়কটি ৫ ফুট গর্ত করে ভিত তৈরির নির্দেশনা থাকলেও সেটা করা হচ্ছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তিন থেকে ৪ ফুটের গর্ত তৈরি করে তা সড়ক খুঁড়ে উঠানো ইট-খোয়া-মাটি মিশ্রিত বালি দিয়েই ভর্তি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সড়ক দুটির গোটা ৭৬ কিলোমিটারেই নতুন ইট বালি, খোয়া ব্যবহার না করে খুঁড়ে উঠানো মালামালই ফের ভরাট করা হয়েছে।
এ অঞ্চলের জনগনের বহু কাঙ্খিত এ দুটি সড়কের নির্মাণ কাজে এ জাতীয় ঘাপলা হওয়ায় স্থানীয় জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। গত এক বছর যাবৎ সড়ক নির্মাণ কাজের কারণে পার্শ্ববর্তী দোকানী, ব্যবসায়ীসহ এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তারা খুঁড়ে রাখা সড়কে যাতায়াতের কষ্ট ও ধুলো ময়লার যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। বিনিময়ে তারা একটি মানসম্মত সড়ক তৈরির আশা করেছিলেন। কিন্তু সেটাও তারা পাচ্ছেন না। পরিবর্তে অনিয়মে চলা দুটি সড়ক উপহার পেতে যাচ্ছেন। যার স্থায়ীত্ব নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন। নিয়ম মেনে সড়ক নির্মাণ করা না হলে সেটি বেশিদিন স্থায়ী হতে পারে না বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন।
এ ব্যাপারে যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, সড়ক উন্নয়নের এ কাজ দুটি যে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানই করুক না কেন, কোনভাবেই তাদেরকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। সিডিউল অনুযায়ী সকল কাজ বুঝে নেয়া হচ্ছে। যদিও যশোর সড়ক বিভাগে লোকবল সংকট রয়েছে। তারপরও সড়কের কাজ শুরুর সাথেই এসও এবং এসডিও নিয়োগ দেয়া হবে। তারাই সড়ক দুটির সকল কাজের দেখভাল করছেন। এছাড়া জরুরী প্রয়োজনে তিনিসহ সড়ক বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তারা নির্মাণস্থল ভিজিট করছেন ও তাৎক্ষণিকভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।
তিনি আরো বলেন, আমরা নিয়মানুযায়ী সড়কের পুরনো ইট খোয়ার মান ভালো থাকায় পরীক্ষা করে কিছু কিছু ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছি। সেক্ষেত্রে ইটের ভেল্যুয়েশন করে মোট বিল থেকে এ টাকা বাদ দেয়া হবে। তবে ঠিকাদার এ কাজের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন ইট খোয়া ও বালি ব্যবহার করছেন। আর রাস্তার পুরনো ইট খোয়া বালি তারা ধোপাখোলা ও রুপদিয়া রামনগর এলাকায় ভেন্ডিং স্টেশনে জড়ো করে রেখেছেন। তারপরও যদি সড়কের সব ইট খোয়া এখানে ব্যবহার করে থাকেন, সেক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো বলে জানান নির্বাহী প্রকৌশলী মোয়াজ্জেম হোসেন।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft