বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯
অর্থকড়ি
কোরবানির চামড়ার দাম নেই!
কাগজ সংবাদ :
Published : Thursday, 15 August, 2019 at 6:19 AM
কোরবানির চামড়ার দাম নেই!কোরবানীর চামড়া নিয়ে ধরাশায়ী যশোরের মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনেও তারা বিক্রি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। অনেকে দাম না পেয়ে সরাসরি এতিমখানায় চামড়া দিয়েছেন। কেউ আবার রাগে, ক্ষোভে চামড়া মাটিচাপাও দিয়েছেন। অন্যদিকে, ঈদ পরবর্তী যশোরের প্রথম চামড়ার হাটও জমেনি। সামান্য কিছু ব্যবসায়ী হাটে চামড়া আনলেও মনের মত দাম না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ চামড়া ফিরিয়েও নিয়ে গেছেন।
কোরবানি দিয়েছেন এমন অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের দিন সকাল থেকেই বাড়িতে বাড়িতে যেয়ে চামড়ার স্লিপ দিয়ে আসেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। সাথে চামড়ার দামও পরিশোধ করে আসেন। কিন্তু, এ বছর চামড়ার এমন দাম দিয়েছেন যা কল্পনাতীত। এমন দরপতন এর আগে কখনো হয়নি। চামড়ার মূল্য দেয়া হয় মাদ্রাসার এতিম শিক্ষার্থী অথবা এলাকার গরীব ও অসহায় মানুষকে। এই অর্থ কেউ নিজে নেন না। অথচ, কারবারীরা চামড়া নিয়ে রীতিমত প্রতারণা করেছেন অসহায় মানুষের সাথে। সরকার নির্ধারিত মূল্য দূরের কথা এক/দেড় লাখ টাকা মূল্যের গরুর চামড়ার দাম দিয়েছে সর্বোচ্চ দুইশ’ টাকা। ছোট ও মাঝারি মাণের গরুর চামড়ার দাম দেয়া হয়েছে এক থেকে দেড়শ’ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম ৪০/৫০ টাকার বেশি পাওয়া যায়নি।
শংকরপুর ইসহক সড়কের জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গরীব মানুষের হক মেরে খাওয়ার পায়তারা করেছে ব্যবসায়ীরা। সে কারণে আমি চামড়া বিক্রি করবো না। সরাসারি মাদ্রাসায় দিয়ে দেবো’। একই কথা বলেছেন একাধিক ব্যক্তি।
শহরের বিভিন্ন মাদ্রাসা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মানুষ এবার সরাসরি মাদ্রাসায় চামড়া পৌঁছে দিয়েছেন। মাদ্রাসার কোমলমতি শিক্ষার্থীরা সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খেয়েছে। অনেক মাদ্রাসা থেকে এবারো বাড়ি বাড়ি যেয়ে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে যশোর শহরের একটি প্রসিদ্ধ মাদ্রাসার এক শিক্ষক বলেন, ‘অন্যান্যবার বাড়ি বাড়ি গেলে নানা উছিলায় চামড়া দেয়া যাবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়। এবার ব্যতিক্রম ছিল। এবার অনেক বাড়িতে আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে মাদ্রাসার লোকেদের চামড়া দেয়া হয়েছে’।
এদিকে, যশোরের রাজারহাট এলাকায় ১৩ আগস্ট মঙ্গলবার ঈদ পরবর্তী প্রথম চামড়ার হাট ছিল প্রায় জনশূন্য। অল্প কিছু ব্যবসায়ী হাটে চামড়া আনলেও কাক্সিক্ষত দাম না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। চামড়া ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন অনেকে। আবার অনেকে হাটেই চামড়া ফেলে গেছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনেও ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে তাদের। এমন চলতে থাকলে চামড়া পাচার হয়ে যেতে পরে। এছাড়া ঢাকার ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করায় অর্থ সংকটে রয়েছেন তারা।
রাজারহাট দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় চামড়ার হাট। এখানে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী, নাটোরের বড় বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া বেচাকেনা করেন। ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে দুই থেকে আড়াই হাজারের মতো চামড়া এনেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
খুলনার ফুলতলা থেকে ৪৫ পিস গরুর চামড়া নিয়ে এসেছিলেন সুখেন দাস নামে একজন ক্ষুদে ব্যবসায়ী। একটু ছোট সাইজের এই চামড়ার দাম বলা হয় ২০ টাকা করে। তিনি বলেন, ‘পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে চামড়া সংগ্রহ, লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত এবং পরিবহন ব্যয় মিলিয়ে তার প্রতি পিস সাড়ে ৩০০ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। এখন বিক্রিও করতে পারছেন না, আবার ফিরিয়ে নিতে গেলেও আলাদা খরচ। তাই এগুলো ফেলে দেয়া ছাড়া আর কোনও উপায় থাকছে না।’
সাতক্ষীরার কলারোয়া থেকে আসা নূর ইসলাম ছাগলের ৬০টি ও ৮০টি গরুর চামড়া এনেছিলেন। তিনি বলেন, ‘চামড়া ফুট হিসেবে নয়, থামকো দাম করা হয়েছে ১০ টাকা দরে। আর গাই গরুর চামড়া প্রতি পিস ৮০-৯০ টাকা এবং অপেক্ষাকৃত ভালো চামড়ার দাম উঠেছে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।’ তিনি বলেন, ‘লবণ আনা-নেয়া এবং সংগ্রহ বাবদ গরুর চামড়ায় প্রতি পিস খরচ সাড়ে ৫০০ টাকার মতো। এই অবস্থায় বিক্রি করলে জায়গায় ক্ষতি হয়ে যাবে। আবার না বিক্রি করলে তা ফিরিয়ে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করতে আবার খরচ। কী যে করবো, ভেবে পাচ্ছি না।’
ডুমুরিয়ার শান্তনু দাস জানান, তার ১০০ পিস ছাগলের চামড়ায় গড়ে খরচ ৪০ টাকা ও ২০ পিস গরুর চামড়ায় গড়ে খরচ ৫০০ টাকা। কিন্তু আড়তদার বলছেন, গরুর চামড়া তিনিই বিক্রি করবেন ৪০০ টাকা করে।
যশোর খড়কি কওমি মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য জাকির হোসেন পলাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৫-৭ বছর আগেও গরুর একটি চামড়া ১৫০০-১৭০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। অথচ এবার কেউই ৩০০ টাকার বেশি দাম বলছে না। এই দামে বিক্রি করলেও সেই টাকা আগামী কোরবানির ঈদের আগে তারা পরিশোধও করতে পারবেন না বলে জানাচ্ছেন। তিনি বলেন, কোরবানির এই চামড়া এতিমদের হক। সরকার যদি দ্রুত এই বিষয়ে পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে এসব শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
হাটের বড় ব্যবসায়ী এবং জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ মমিনুল মজিদ পলাশ বলেন, ‘আমাদের চামড়ার সবচেয়ে বড় বাজার চীনে। তাদের ওখানে এখন চামড়ার চাহিদা খুবই কম। সে কারণে দামও বেশি পাচ্ছি না, তাই হাটে চামড়াও উঠছে না। এছাড়া ট্যানারি মালিকদের চতুরতাও একটি কারণ। তারা আমাদের কাছ থেকে মাল নিচ্ছে, কিন্তু মূল্য পরিশোধে টালবাহানা করছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এই শিল্প খুব শিগগির লাটে উঠবে।’
যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা চামড়ায় লবণ দেয়ার কাজে ব্যস্ত থাকায় প্রথম দিনের হাট জমেনি। তবে আগামী শনিবারের হাট (১৭ আগস্ট) জমবে। সেক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ ট্যানারি মালিকদের কাছে থাকা বকেয়া টাকা এখনও তারা হাতে পাননি। গত তিন বছর প্রশাসনের নজরদারি যেমন বেড়েছে, তাতে চামড়া পাচারের কোনও শঙ্কা নেই।’



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft