শুক্রবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৯
আন্তর্জাতিক সংবাদ
কাশ্মীরীদের রাখা হয়েছে ৭শ কিলোমিটার দূরের বন্দি শিবিরে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :
Published : Friday, 20 September, 2019 at 4:43 PM
কাশ্মীরীদের রাখা হয়েছে ৭শ কিলোমিটার দূরের বন্দি শিবিরেভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পাঁচ অগাস্ট কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ার পর থেকে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের আন্দোলনকর্মী, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীসহ হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়।
এমনকি অনেককে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের কারাগারে স্থানান্তরও করা হয়। বিবিসি হিন্দি’র সংবাদদাতা ভিনিত খারে উত্তর প্রদেশের এমনই একটি কারাগার পরিদর্শন করেছেন।
আগ্রায় শুক্রবার সকালটা ছিল গরম ও গুমোট। উত্তর প্রদেশের এই জনাকীর্ণ ও ধুলাবালিময় শহরটি তাজমহলের আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত।
মাঝে মধ্যে হালকা বাতাস এই গরম আবহাওয়াকে সহনীয় করে তুলেছিল – তবে কাশ্মীর উপত্যকা থেকে আসা অসংখ্য নারী-পুরুষের পক্ষে এই আবহাওয়া মোটেই সহনীয় ছিল না।
কেননা কাশ্মীরে যেখানে সেপ্টেম্বর মাসের তাপমাত্রা ১৮ সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি থাকে। সেখানে আগ্রায়, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি স্পর্শ করেছে।
আগ্রার কেন্দ্রীয় কারাগারের বন্ধ গেটের বাইরে একটি বিশাল ওয়েটিং হলে বসে আছেন কাশ্মীরের এই মানুষেরা।
পরিবারের কারাদণ্ড পাওয়া সদস্যদের সাথে অল্প সময় সাক্ষাতের পালা কখন আসবে তার জন্য সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছেন।
ভারতীয় জনতা পার্টি নেতৃত্বাধীন সরকার কাশ্মীরকে স্বায়ত্তশাসন দেয়া বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা দেয়ার আগে ওই অঞ্চলটিকে অচল করে দিয়েছিল- মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক, ল্যান্ডলাইন এবং ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দেওয়া হয়; এবং গৃহবন্দী করা হয় আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক নেতাদের।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উপত্যকাটিতে দফায় দফায় বিক্ষোভ হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী প্রায়ই বিক্ষোভকারীদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।
এবং সরকারের এই অকস্মাৎ পদক্ষেপের জেরে ওইদিন কাশ্মীরের হাজার হাজার আন্দোলনকর্মী এবং অন্যান্য লোকজনকে তাদের বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীর থেকে কয়েক শতাধিক বন্দীকে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের কারাগারে স্থানান্তর করেছে।
কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৮০ জনেরও বেশি বন্দীকে আগ্রায় পাঠানো হয়েছে।
কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা আগ্রা কেন্দ্রীয় কারাগারটি ভীষণ গরম আর দুর্গন্ধে ভরা।
টয়লেটের দুর্গন্ধ ওয়েটিং হল থেকেও পাওয়া যাচ্ছিল। যেখানে পরিবারগুলো বসে অপেক্ষা করছেন তাদের স্বজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য। এই দুর্গন্ধের কারণে তাদের বেশিক্ষণ ধরে অপেক্ষা করাও হয়ে পড়েছিল বেশ কঠিন।
“এখানে খুবই গরম। আমি এখানেই মরে যাব,” অপেক্ষায় থাকা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে একজন নিজের জামা দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে এভাবেই তার পরিস্থিতির কথা ব্যাখ্যা করেন।
স্মিত হাসি দিয়ে বলেন, “আমার নাম জিজ্ঞেস করবেন না। আমরা নয়তো ঝামেলায় পড়তে পারি।”
তিনি এসেছেন কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে পুলওয়ামা শহর থেকে। তিনি তার ভাইয়ের সাথে দেখা করার অপেক্ষায় ছিলেন, যাকে চার অগাস্টের রাতে নিরাপত্তা বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, “তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তা আমাদের জানানো হয়নি।”
“কেন তাকে তুলে নেওয়া হয়েছিল সেটাও জানি না। নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছোঁড়ার সাথে তার কোনও যোগসূত্র নেই। তিনি একজন সাধারণ গাড়িচালক ছিলেন।”
ভাইয়ের খোঁজ জানতে তিনি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সাথে বার বার দেখা করেন। সে সময় তাকে বলা হয়েছিল যে তাঁর ভাইকে শ্রীনগরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এরপর অনেক চেষ্টা করার পরে তিনি জানতে পারেন যে তার ভাইকে আসলে আগ্রায় আনা হয়েছে।
তিনি ২৮ আগস্ট আগ্রার পৌঁছালেও জানতে পারেন যে তার কথা প্রমাণ করতে কাশ্মীরের স্থানীয় পুলিশের কাছ থেকে একটি “যাচাইকরণের চিঠি” বা ভ্যারিফিকেশন লেটার আনতে হবে। তাই তিনি আবারও পুলওয়ামায় যান এবং চিঠিটি নিয়ে আগ্রায় ফিরে আসেন।
“আমার ভাইয়ের বয়স ২৮ বছর। সে শিক্ষিত – এমনকি তাঁর মাস্টার্স ডিগ্রীও রয়েছে, কিন্তু এখন জেলখানায় থাকার কারণে তার এই সমস্ত কিছুই অকেজো হয়ে পড়েছে।”
আবদুল ঘানির দুর্দশাও প্রায় একই রকম। এই দিনমজুর শ্রমিক তার ছেলে এবং ভাগ্নের সাথে দেখা করতে কাশ্মীরের কুলগাম শহর থেকে আগ্রা পর্যন্ত ট্রেন এবং বাসে যাত্রা করে এসেছেন – তাকে জানানো হয়েছিল যে এখানে ওই দু’জনকেই রাখা হয়েছে।
“তাদের দু’জনকে রাত দুইটার দিকে গভীর ঘুমের মধ্যে তুলে নিয়ে যায়। কেন তাদেরকে সেদিন তুলে নেওয়া হয়েছিল তার কারণ কেউ আমাদের জানায়নি। তারা কখনই নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর নিক্ষেপ করেনি।”
মি. ঘানি “ভেরিফিকেশন লেটার” সাথে না আনায় বেশ দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিলেন।
“আমি জানতাম না যে আমাকে এ ধরণের কোন চিঠি আনতে হবে,” তিনি বলেন।
তিনি আরও জানান যে, তাকে ইতিমধ্যে আগ্রায় ভ্রমণের জন্য ১০,০০০ রুপি ব্যয় করতে হয়েছে। এবং পুনরায় ভ্রমণের সামর্থ্য তার নেই।
কয়েকটা বিরক্তিকর ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরে, তাদের গেটের ভেতরে যাওয়ার সময় আসে।
তাদের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকেই তাজা আপেল নিয়ে এসেছেন। যেটা কিনা কাশ্মীরের সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ফল।
মি. ঘানির আর্জি মঞ্জুর হওয়ার পর তাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছিল। এক ঘণ্টা পরে তিনি হাসি মুখে বের হয়ে আসেন।
“আমার ছেলে অনেক উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু আমি তাকে বলেছি যে বাড়িতে সবকিছু ঠিকঠাক আছে।”
“আল্লাহর শুকরিয়া, আমি তাঁর সাথে এখানে দেখা করতে পেরেছি। পনেরো দিন পর আমি আবার আসব।”
সন্ধ্যা নাগাদ ওয়েটিং হলটি প্রায় খালি হয়ে পড়ে, তখন আমি লক্ষ্য করলাম যে একজন নারী এবং একজন পুরুষ জেলখানার গেটের দিকে খুব দ্রুত গতিতে দৌড়ে আসছে।
তারা শ্রীনগর থেকে দিল্লি গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে আগ্রায় পৌঁছান।
কর্মকর্তাদের কাছে একটি অনুরোধপত্র জমা দেওয়ার পরে তাদেরকে ২০ মিনিটের জন্য তাদের ভাইয়ের সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়।
“আমরা আরও কিছুক্ষণ আগে এলে ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য ৪০ মিনিটের মতো সময় পেতাম,” বলেন তারেক আহমেদ দার। তার কারাবন্দী ভাইয়ের তিনটি সন্তান রয়েছে।
কেবলমাত্র মঙ্গলবার এবং শুক্রবারেই দেখা করার অনুমতি রয়েছে, সুতরাং মি. দার যদি এই সুযোগটি হারাতেন তবে তাকে আরও চার দিন অপেক্ষা করতে হত।
“আমি ভাইয়ের সাথে কথা বলেছি। তাঁর স্ত্রী, তিন সন্তান এবং আমাদের বাবা-মা তাকে অনেক মিস করেন,” মিঃ দার আরও বলেন। “এটি তাদের পক্ষে মেনে নেয়া শক্ত। এখন আমি তাকে দেখেছি, আমি তাদের বলব যে তিনি ভাল আছেন।”
সূত্র: বিবিসি



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft