শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৯
ওপার বাংলা
পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি আতঙ্কে আত্মহত্যা করছে মানুষ
কাগজ ডেস্ক :
Published : Wednesday, 2 October, 2019 at 7:45 PM
পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি আতঙ্কে আত্মহত্যা করছে মানুষঅন্নদা রায়ের বয়স যখন মাত্র ১১ মাস তখন তার বাবা-মা বাংলাদেশের রংপুরে তাদের পৈত্রিক আবাস ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন। সেবছরটি ছিল ১৯৮১ সাল। পরিবারটি দাবি করে যে, ‘মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে সেসময় বসবাসে স্বাচ্ছন্দ্য-বোধ না করার কারণে বাঙালি হিন্দু হিসেবে ভারতে পাড়ি জমান তারা।’
পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে আসার পর ৩৮ বছর কেটে গেছে, অন্নদার বাবা-মা আর বড় ভাই তাদের ভাষায় ‘সেই অশুভ পদক্ষেপকে’এখন অভিসম্পাত করেন।
গত ২০ সেপ্টেম্বর বাড়ির অদূরে একটি রেল ক্রসিংয়ের পিলারে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় অন্নদার মরদেহ। ভারতে তিন দশক বসবাসের পরও নাগরিকত্ব প্রমাণের কোন নথি যোগাড় করতে না পেরে হতাশ এবং দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন এই হতভাগ্য মানুষটি।
‘যখন থেকে আসামে অবৈধ নাগরিক সনাক্তের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখন থেকে আমাদের পরিবার প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। যদিও আমাদের ভারতে ভোট দেয়ার অধিকার রয়েছে, আমাদের কখনোই কোন জমি কিংবা কোন নথি ছিল না। এ নিয়ে অন্নদা বেশ চিন্তিত ছিল এবং বলতো যে আমাদের হয়তো বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে,’বলেন বড় ভাই দক্ষদা রায়।
কিছুদিন পরে, অন্নদার গ্রাম থেকে প্রায় ৫৯০ কিলোমিটার দক্ষিণে, আরেক জন লোক রাতে খাবারের সময় তার স্ত্রীকে বলেন, ‘বাবার জমির মালিকানার দলিল পুনরুদ্ধার করতে পারিনি। আমাদেরকে হয়তো গ্রেপ্তার করে বন্দিশিবিরে রাখা হবে। শুধু ওই দলিলেই একমাত্র কোনো বানান ভুল ছাড়া পারিবারিক উপাধির উল্লেখ থাকার সম্ভাবনা আছে।
৩৬ বছর বয়সী কামাল হোসাইন মণ্ডল পেশায় ইঁট ভাঁটার একজন শ্রমিক। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সোলাদানা গ্রামে বাস করতেন তিনি। ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে এই জেলাতে বাংলাদেশ থেকে বহু হিন্দু এবং মুসলিম অভিবাসী এসে আশ্রয় নিয়েছে। কামাল গর্বের সাথে নিজেকে একজন ইউটিউবের সংবাদ আসক্ত হিসেবে দাবি করতেন। নিজের সদ্য কেনা স্মার্ট ফোনে সংবাদ দেখতেন তিনি।
পশ্চিবঙ্গে এনআরসি'র সম্ভাব্যতা নিয়ে একের পর এক সংবাদ তাকে এতো বেশি হতাশ করে তোলে যে তিনি আত্মহত্যা করেন। পুলিশের কাছে করা অভিযোগে এমনটা জানায় তার পরিবারের সদস্যরা।
কামালের পূর্ব-পুরুষরাও একই গ্রামে বাস করতো। তবে তার বাবা তাদের সর্বশেষ জমিটুকুও বিক্রি করে দেয়ার পর তিন ছেলের কাছে এই স্থানান্তর প্রমাণের আর কোন নথি অবশিষ্ট থাকেনি। সরকারি দপ্তরের বার বার যাওয়া-আসা করার পরও সরকারি পরিচয়পত্রে পরিবারটির নামের মাঝের অংশটি সংশোধন করায় কোন সহায়তা মেলেনি।
‘আমার স্বামী এদিক-সেদিক অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছে, কিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি। আমি তাকে শান্ত হতে বলতাম। ভারতে আমরা সুরক্ষিত বলেও তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি কিন্তু সে কিছুই শুনতে চাইতো না। নিজের বাবাকে কবর দেয়ার পর আমার দুই ছেলে ভালো ভাবে খায়ও না, ঘুমায়ও না,’ছোট ছেলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে এসব বলছিলেন ২৭ বছর বয়সী কহিরুন নাহার।
রাজ্যকে ‘অবৈধ নাগরিক’মুক্ত করার লক্ষ্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যের ১৯ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব সম্প্রতি বাতিল করা হয়েছে। বিতাড়িত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকে আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ নিহতদের স্বজন এবং অধিকার কর্মীদের।
এনআরসি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আতঙ্ক চোখে পড়ার মতো। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান অমিত শাহ-সহ এর শীর্ষ নেতারা এবছর নির্বাচনে জয়ের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেশব্যাপী এনআরসি কার্যকরের পক্ষে জোরালো মত দিচ্ছেন।
অমিত শাহ, যিনি অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘ঘুণ পোকার’ সাথে তুলনা করেছেন তিনি পার্লামেন্টে এক ঘোষণায় বলেন, ‘দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি থেকে অনুপ্রবেশকারীদের উৎখাত করা হবে।’
এনআরসি নিয়ে দলীয় নেতাদের এই অতি আবেগে কারণে উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানার মতো বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা এনআরসি'র জোয়ারে যোগ দেয়ার বিরোধিতা করেছেন।
আসামের বাইরেও এনআরসি বাস্তবায়ন ছাড়াও, কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকত্ব বিলে সংশোধন আনার চেষ্টা করছে। নতুন এই আইনে, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে আসা অ-মুসলিম অভিবাসীদের জন্য নাগরিকত্ব পাওয়া সহজ করা হতে পারে।
প্রস্তাবিত আইনটি এখনো পার্লামেন্টে পাস হয়নি। কিন্তু মুসলিমদের বাদ দেয়ার কারণে এটিকে অনেকে ‘বিভক্তিমূলক’বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ, মুসলিমদের বাদ দেয়া হলেও হিন্দু, শিখ, জৈন, পার্সি, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভারতে অভিবাসন করেছে কিংবা ভারতে থাকার সময় যাদের নথির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
বিলের পক্ষে সমর্থনকারীরা বলেন, নতুন আইন থেকে মুসলিমদের বাদ দেয়া হয়েছে কারণ প্রতিবেশী দেশে যারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে হত্যার শিকার হওয়াও হুমকি থেকে পালিয়ে এসেছে শুধুমাত্র তাদেরকেই ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হবে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় রয়েছে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস(টিএমসি) যা কিনা নয়া দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি'র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।
তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে এনআরসির মতো যেকোনো পদক্ষেপ রুখবে তার সরকার। আসামে এনআরসি ‘বাস্তবায়ন’নিয়ে আলোচনা করতে সম্প্রতি মমতা ব্যানার্জি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাথে দেখা করেছেন।
আসামের মতো এনআরসি কার্যকর নিয়ে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গে এক ডজনের মতো আত্মহত্যার ঘটনার ঘটলে বাসিন্দাদের ভয় দূর করতে গত সপ্তাহে এক ভিডিও বার্তা প্রচার করেন মমতা।
ভিডিওতে মমতা বলেন,‘গুজব ছড়িয়ে পড়েছে কারণ সব রাজ্যেই প্রতি ১০ বছরে এক বার করে জরিপ চালানো হয়, এবং এজন্য অনেক সময় রেশন কার্ড দরকার হয়। দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন যে জরিপ কি। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে কারণ এর মাধ্যমে রাজ্যের সব মানুষকে গণনা করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটা এনআরসি সংশ্লিষ্ট নয়। এটা ধর্ম কিংবা বর্ণ সম্পর্কিতও নয়। এটা ভোটার তালিকা তৈরির জন্য করা হয়েছে, তাই অনেক সময় জিজ্ঞাসা করা হতে পারে যে, পরিবারের লোকের পেশা কি। জরিপের কর্মকর্তারা আপনার বাড়িতে গেলে, দয়া করে জেনে রাখবেন যে, এটা রাজ্যের রেকর্ড রাখার জন্য করা হচ্ছে, আর কিছু নয়।’
রাজ্যের ভোটার এবং নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করা হয় যাতে তারা সরকারের কল্যাণ প্রকল্পের আওতাধীন হতে পারে তারাও পরোক্ষভাবে নাগরিক সনাক্তকরণের এই গুজব ছড়ানোতে সহায়তা করেছে।
পিতামাতার ও নিজের জন্মের বিস্তারিত তথ্য নতুনভাবে নিবন্ধিত কিংবা যাচাই করতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার বাসিন্দা পশ্চিমবঙ্গের সরকারী দফতরের বাইরে প্রতিদিনই ভিড় করছেন।
এনআরসি পশ্চিমবঙ্গে, হিন্দু এবং মুসলিম উভয়ের মাঝেই উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ৬২ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষক প্রতাপ নাথ বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে বশিরহাট শহরে একটি হিন্দু নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বাস করেন। একমাত্র বড় বোন ছাড়া যিনি সীমান্তের ওপাশে খুলনায় থাকেন, প্রতাপ নাথের পুরো পরিবার ১৯৬৮ সালে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আসে।
‘মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, মালদা বা জলপাইগুড়ির মতো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর ২৫% বাসিন্দা বাংলাদেশ থেকে অভিবাসনের মাধ্যমে এসেছে। এটা হিন্দু কিংবা মুসলিম বলে নয়, বৈধ নথিপত্রের দিক থেকে দেখলেও আমাদের কাছে সবকিছু আছে, তাহলে তারা কিভাবে আমাদের অবৈধ বলে তাড়াতে চায়। আমার প্রতিবেশীর থেকে আমার কাছে একটি কম আছে বলে?’ রাগান্বিত হয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেন।
৯ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের চতুর্থ বৃহৎ জনবহুল রাজ্য যার এক তৃতীয়াংশ জনগণ মুসলিম।
এরআগে ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি(বিজেপি) ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের বিতাড়িত করা হবে, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রস্তাবিত নতুন আইনে অ-মুসলিমদের সুবিধা দেয়ার বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
চলতি বছরের অগাস্টে, কিছু মুসলিম সংগঠন প্যামফলেটস বিতরণ, সেমিনার অনুষ্ঠান এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের আহ্বান জানায় যে তারা যাতে তাদের পরিচয়পত্র তৈরি রাখে, এই শঙ্কায় যে, ‘যদি এনআরসি হঠাৎ তাদের উপর চড়াও হয়’।
একটানা মৌসুমি বৃষ্টি উপেক্ষা করে, মোহাম্মদ নাসিরুল্লাহ তার নতুন রেশন কার্ড নিতে বারাসতে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন। রেশন কার্ড সরকারের একটি জনকল্যাণ কর্মসূচি যাতে কম মূল্যে খাদ্য-পণ্য দেয়া হয়।
কার্ড পাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে যে আজ আমি আমার হজ পালন করেছি।’
মোহাম্মদ নাসিরুল্লাহ আরো বলেন, ‘আসামে অবৈধ নাগরিকদের জন্য বন্দি শিবির নির্মাণ শুরু হওয়ার পর থেকে, চূড়ান্ত তালিকায় থাকা মুসলিমদের জীবন আর স্বাভাবিক নেই। আমাদের সব নথি অক্ষত রাখতে হবে, অনেকে ভাবতে পারে যে আমাদের মধ্যে অনেকেই অবৈধ নাগরিক।’
এদিকে, রাজ্যের প্রত্যন্ত শহর ও গ্রামে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পরিচয় সনাক্ত করার যে ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, তা অব্যাহত রয়েছে।
অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী মনে করেন, অবৈধ নাগরিক সনাক্তকরণের এই পুরো ধারণাটি অযৌক্তিক।
তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ বাংলাদেশি অভিবাসীর কাছে আমরা যাকে উত্তরাধিকারের দলিল বলি যেমন- তাদের পিতামাতার জন্ম সনদ, তাদের পূর্বপুরুষের জমির রেকর্ড ইত্যাদি নেই। আর পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে এই ধরনের লাখ লাখ মানুষ রয়েছে। সূত্র: বিবিসি বাংলা



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft