বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০
সারাদেশ
আজ সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর
এই দিনে আজো আঁতকে ওঠেন উপকুলবাসী
এইচ,এম, হুমায়ুন কবির, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) :
Published : Tuesday, 12 November, 2019 at 6:20 AM
এই দিনে আজো আঁতকে ওঠেন উপকুলবাসীআজ সেই ভয়াল ১২ নভেম্বর। পটুয়াখালীর কলাপাড়াসহ উপকুলবাসীর কাছে এক ভয়াল দুঃস্বপ্নের ও শোকাবহ দিন। ১৯৭০ সালের এই দিনে উপকুলে বয়ে যায় দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রলয়ঙ্করী হ্যারিকেনরুপী ঘুর্ণিঝড় গোর্কি ও জলোচ্ছ্বাস। ওই দিনের ভয়াবহতার কথা মনে হলে আজ ও মানুষ আঁতকে ওঠেন। ওই দিন ছিল রমযানের রোজা। আগের দিন থেকেই টানা বাতাশ ছিল। আকাশ ছিল অন্ধকার। দিনভর পড়ছিল গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। শেষে রাত বঙ্গোপসাগর প্রচন্ড আক্রোশে ফুঁসে উঠেছিল সে দিন। অন্যান্য দিনের মতো কাজ কর্ম শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিল উপকুল বাসী। রেডিওতে ছিলনা তেমন কোনো আগাম সতর্কতা সঙ্কেত। রেডিও ঢাকা কেন্দ্র থেকে সে দিন ২৪ ঘন্টায় মাত্র দুইবার স্বাভাবিক আবহাওয়া বার্তা ঘোষনা করা হয়েছিল। তাতে এ ধরনের কোনো দুর্যোগের সতর্ক বার্তা ছিলনা। ছিল শুধু নি¤œচাপ সৃষ্টির খবর। রাত ১১টার দিকে রেডিও থেকে প্রলয়ঙ্করী হ্যারিকেনরুপী ঘুর্ণিঝড় গোর্কি আঘাত হানার ঘোষনা দেয়া হলেও তা ছিল মানুষের অজানা। ফলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভেসে গিয়েছিল উপকুলের লাখো মানুষ। সারা রাত উপকুলের উপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায় প্রলয়ঙ্করী হ্যারিকেনরুপী ঘুর্ণিঝড় গোর্কি ও জলোচ্ছ্বাস। ¯্রােতের টানে শরীরের পোশাক ভেসে গেছে। কি পুরুষ আর কি নারী লাশ আর লাশ। টুকরা কাপড় পেলে জড়িয়ে অমনি আব্রু ঢেকেছে। মৃতদের বিনা দাপনে কাফনে আর বিনা জানা যায় কবর দেয়া হয়েছে। জোয়ারে পানিকে কচুরিপানার মতো ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষের লাশ ভেসে এসছে। লাসের গন্ধে ভারি ছিল বাতাশ। ওই সময়ের অনেকেই জানান, শেষ রাতে পানি নামতে শুরু করলে প্রচন্ড শীত নেমে এসেছিল। এজন্য প্রসূতি মায়েরা আর শিশুরা এক দমই বাঁচেনি। নোনা পানি আর বালিতে অনেক মানুষ অন্ধ হয়ে গেছে। ভোরের আলো ফুটে উঠতে ১২ নভেম্বর ১৯৭০ চোখে পড়ে, গাছে গাছে বাদুরের মত মানুষ ঝুলছে। কেই মৃত। কেই বেহুশ ঝড়ো হাওয়ার সাথে পাহাড় সমান ঢেউয়ের ¯্রােতে পুরো উপকুলীয় জনপথ ভেসে যায়। স্মরণ কালের সবচেয়ে ভযাবহ এ দুর্যোগে কী পরিমান ক্ষতি হয়েছে তার সঠিক হিসাব বের করা না গেলেও বেসরকারি হিসাবে কয়েক লক্ষাধিক লোকের প্রানহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে সরকারি হিসেবে প্রাণহাণির সংখ্যা বলা  হয়েছে পাঁচ লক্ষ, ঘর বাড়ী বিধবস্ত হয়েছে চার লক্ষ ,গবাদি পশু ও হাঁস মুরগির মৃত্যু সাত লক্ষ আট হাজার ও শিক্ষা প্রতিষ্টান বিধবস্ত হয়েছে কয়েক হাজার। কয়েক লক্ষ মেট্রিক টন ফসল ক্ষতি হয়েছে। ওই জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতায়। কেই গাছের ডালে,কেউ উঁচু মাটির কিল্লায় , কেউ নারার ঘরে মাছায় আশ্রয় নিয়ে কোনো মতে প্রানে রক্ষা পেলেও তিন থেকে চারদিন অভুক্তই কাটাতে হয়েছিল। ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকুলীয় এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়  পটুয়াখালীর, ববিশাল, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, চট্রগ্রাম, লক্ষীপুর ,নোয়াখালী, চাঁদপুরসহ উপকুলবর্তী জেলাগুলো বিস্তীর্ণ এলাকা ধবংসস্তুপে পরিনত হয়েছিল। প্রায় দেড় মাস পর্যন্ত স্বজন হারাদের কান্নায় উপকুলের আকাশÑ বাতাশ ভারী ছিল। তারিকাটা একটি পরিবারের ৯ জন সদস্য । কেউ বেঁচে ছিল না। এ রকম ঘটনা ঘটেছে অনেক। আবার কেউ অলৌকিক ভাবে বেচেঁ ছিল। সে দিনের সেই ভয়াল স্মৃতি কথা স্মরন করে উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নের  নয়াকাটা গ্রামের বৃদ্ধ শাহজাহান হাং (৭৯) বলেন ওই দিন জলোচ্ছ্বাসে তার মা-বাবা চার ছেলে মেয়েসহ পরিবারের সবাই ভেসে গেছেন।ওই জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়ে ছিলেন তিনি নিজেও। তিন দিন পর পানিতে ভেসে থাকার পর এলাকার লোক তাকে উদ্ধার করে। প্রতি বছর ১২ নভেম্বর এলেই নিদিষ্ট কিছু সংগঠন বিভিন্ন কর্মসুচীর মধ্যে দিয়ে দিবসটি স্মরন করে। এ সংগঠন গুলো মিলাদ মাহফিল, কুলখাণি ও নিহতেদের স্মরণে স্মৃতিচারনমুলক আলোচনা অনুষ্টানের আয়োজন করে থাকে। ৪৯ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু উপকুলের মানুষ আজ ও ভোলেনি সেই ভয়াল কালরাতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি। এখন ও উপকুলের অসংখ্য মানুষ খোঁজে স্বজনদের। জাতীয়সংঘ ১২ নভেম্বর ১৯৭০ পর পরই আন্তর্জাতিক রেডক্রস ফেডারেশনের নেতৃত্বে বাংলাদেশে ঘুণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসুচি গ্রহন করে। কলাপাড়া উপকুলীয় মানুষ এর পর থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতন হতে থাকে। কিন্তু এ সচেতনার পরিমান ৩০ ভাগ। বাকি ৭০ ভাগ এখনও অসচেতন । গত কয়েক বছর এ উপকুলীয় অঞ্চলে কয়েকবার আঘাত হেনেছে। আর ১৯৭০ সালের যে সাইক্লেন শেল্টার রয়েছে তা একেবারেই ঝুঁকিপুর্ন। এতে নেই নারী ও শিশু নিরাপওার ব্যবস্থা। শেল্টার গুলোতে খাবার পানির ব্যবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা পয়ঃনিস্কাশনের ব্যবস্থ নেই। নেই সচেতনতামুলক কর্মকান্ড। এ ক্ষেত্রে উপকুলীয় এসব মানুষগুলোকে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত করে রেখেছে। এ অঞ্চলে প্রতি বছরই গোর্কি, সিডর, আইলা, নারগিস,মহাসেন, বুলবুল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রান হারায় হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু তাদের নিরাপওার জন্য নির্মাণ করা হয়নি প্রয়োজনীয় সংখ্যক সাইক্লোন শেল্টার। যে গুলো নির্মান করা হয়েছে তার একটি থেকে আরেকটির দুরত্ব কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ মাইল। আবহাওয়ার বিপদ সংকেত পেয়ে অধিক দুরত্বে অবস্থিত সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নিতে যাওয়ার পথে ¯্রােতে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। উপজেলার আয়তন,জনসংখ্যা ও বর্তমানে ব্যবহার উপযোগী সাইক্লোন শেল্টার গুলোর অবস্থান দুর্যোগকালিন সময়ে মানুষের আশ্রয়ের জন্য অপ্রতুল। এ উপজেলার বর্তমানে জনসংখ্যা অনুযায়ী কমপক্ষে ২০০ সাইক্লোন শেল্টার নির্মানের প্রয়োজন বলে মনে করে স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে দুর্যোগকালে থাকতে হবে জীবনের ঝুঁকিতে। উপজেলার ১২ টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় মানুষের জন্য দুর্যোকালে প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে ২০টি করে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মান করা প্রয়োজন। মানুষের জানমাল রক্ষার জন্য মাটির কেল্লা সংস্কার করা দরকার এবং আরো নতুন মাটির কেল্লা নির্মান করা গেলে দুর্যোগকালে জীবনের ঝুঁকি কমে আসবে। সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আবার ও বেড়ে গেছে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানার আশঙ্কা। আতঙ্ক বেড়ে গেছে কলাপাড়া উপজেলার সারে ৪ লাখ মানুষের মধ্যে। কলাপাড়াবাসীর নদীÑসাগর ,জলোচ্ছ্বাস নিত্য সঙ্গী। তার উপর জলবায়ু পরিবর্তনে উপকুলীয় অঞ্চল বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে প্রতিনিয়ত। এ অবস্থায় উপকুলীয় বাসীদের নিরাপদে রাখতে সরকারের প্রতি সকল রকম প্রস্তুতির ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন উপকুলবাসী। একই সাথে আগামী দিন গুলোর ঘুর্ণিঝড় তথা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় এ দিনের শোককে শক্তিতে পরিনত করার জন্য নেয়া হোক যাবতীয় উদ্যোগ।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft