বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
রাজশাহীতে ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম, সরবরাহ করছেন দলীয় নেতারা
রাজশাহী ব্যুরো :
Published : Tuesday, 14 January, 2020 at 8:06 PM
রাজশাহীতে ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম, সরবরাহ করছেন দলীয় নেতারারাজশাহীতে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহে কৃষক এবং চালকলের তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে জানা যায়।  রাজশাহী প্রায় প্রতিটি উপজেলায় এখন খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহ করছেন ব্যবসায়ীরা। চালের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বন্ধ চালকল রয়েছে চুক্তিবদ্ধের তালিকায়। ধানের মতো চালও সরবরাহ করছেন দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ফলে প্রকৃত চাষি এবং চালকল মালিকরা সরকারের কাছে ধান-চাল বিক্রির সুবিধা পাচ্ছেন না। পকেট ভরছে দলীয় নেতা আর ব্যবসায়ীদের।
রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে জানা গেছে, গত ২০ নভেম্বর থেকে জেলায় চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। তা চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে ১ ডিসেম্বর থেকে। চালও সংগ্রহ করা হবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। রাজশাহী জেলা ও মহানগরের মোট ৮ হাজার ১৫০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে। আর চাল সংগ্রহ করা হবে ৪ হাজার ২৭৬ মেট্রিক টন। ধান কেনা হচ্ছে প্রতি কেজি ২৬ টাকা দরে। আর চালের দাম প্রতি কেজি ৩৬ টাকা।
রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানা থেকে ৩ টন ধান কেনা হবে। আর জেলার পবা উপজেলা থেকে ৯৮৯ টন, দুর্গাপুরে ৫৬৮, বাঘায় ১৪০, চারঘাটে ৪৫৩, মোহনপুরে ২৮৮, বাগমারায় ৮৩, তানোরে ২ হাজার ৪০০, গোদাগাড়ীতে ২ হাজার ৫৯৮ এবং পুঠিয়ায় ৬২৮ মেট্রিক টন ধান কেনা হবে। আর নগরীর বোয়ালিয়ায় চাল কেনা হবে ৩০৯ মেট্রিক টন। এছাড়া পবায় ৮২২, গোদাগাড়ীতে ১ হাজার ৭২০, তানোরে ৫৭০, মোহনপুরে ১১৯, বাগমারায় ১৭৩, দুর্গাপুরে ১৫৯, পুঠিয়ায় ২৬৭, বাঘায় ৪৬ এবং চারঘাটে ৯১ মেট্রিক টন চাল কেনা হবে।
এবার রাজশাহীর প্রতিটি স্থানেই ধান এবং চাল কেনার ক্ষেত্রে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, উপজেলা পর্যায়ে ধান সরবরাহকারী কৃষকের তালিকা তৈরিতে যে লটারি করা হয়েছে তা ¯্রফে লোকদেখানো। প্রকৃতপক্ষে ধান দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং তাদের অনুসারিরা। কৃষকের নাম ব্যবহার করে তারাই ধান সরবরাহ করছেন খাদ্যগুদামে। কোথাও কোথাও রাতের অন্ধকারেও ধান ঢোকানো হচ্ছে খাদ্যগুদামে।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পীরগাছা গ্রামের এক কৃষক আফাজ আলীর নাম উঠেছিল লটারিতে। আফাজ জানান, লটারির বিষয়টি তিনি জানতেনই না। নারায়ণপুর গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি তাকে ফোন করে বিষয়টি জানান। ওই ব্যক্তিই তার নামে ধান সরবরাহ করছেন। ধান দেয়ার সময় আফাজকেও উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। এ জন্য তাকে ২ হাজার টাকা দিয়েছেন ওই ব্যক্তি। ধন্দহ গ্রামের এমন আরও পাঁচজন কৃষক পাওয়া গেছে। তারা ধান চাষ করলেও কেউই ধান দিতে পারেননি। আবার জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান ধানই চাষ না করেই কিন্তু তার নাম রয়েছে ধান সরবরাহকারীদের তালিকায়। তিনি খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করছেন। পুঠিয়া উপজেলা থেকেও প্রতিদিন এ ধরনের অভিযোগ আসতে আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ওলিউজ্জামান বলেন, যারা ধান চাষ করেছিলেন তাদের নিয়েই আমরা লটারি করেছিলাম। তালিকাটা দিয়েছিল কৃষি বিভাগ। এখন লটারিতে নাম আসার পর যদি কোনো কৃষক তার কার্ড বিক্রি করে দেন তাহলে কিছু করার নেই। তারপরেও ধান দেয়ার সময় কৃষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চালকলের তালিকা তৈরিতে ভয়াবহ অনিয়ম হয়েছে। ধান সরবরাহের জন্য তালিকা উপজেলা সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি লোক দেখানো লটারির মাধ্যমে করলেও চালকলের তালিকা করেছে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। অভিযোগ পাওয়া গেছে, বন্ধ চালকলের সঙ্গেও চুক্তি করা হয়েছে। এদের মাধ্যমে চাল সরবরাহ করছেন খাদ্য বিভাগের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তারাই। এর মাধ্যমে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নাজমুর ভুঁইয়াও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানেও তার কার্যালয়ে অনিয়ম পাওয়া গেছে।
গত ২ জানুয়ারি জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুদক। এ সময় অটোরাইস মিলের উৎপাদন সক্ষমতা না থাকা সত্তে¦ও সক্ষমতার সনদ দেয়া এবং চালকল মালিকদের সাথে যোগসাজশ করে চাল সংগ্রহসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পান দুদক কর্মকর্তারা। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন জানান, তারা যে সমস্ত অনিয়ম পেয়েছেন সেগুলো প্রতিবেদন আকারে ঢাকায় তাদের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে যে নির্দেশনা দেয়া হবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার তানোর উপজেলার ২৯টি চালকলের সঙ্গে এবার চাল সংগ্রহের চুক্তি করা হয়েছে। এসব চালকলের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি চালকলে চাল উৎপাদন হয়। তানোর পৌরসভার জিওল-চাঁদপুর এলাকায় অবস্থিত আব্দুল গণি মিয়ার চালকল দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর ধরেই বন্ধ। কিন্তু প্রতিবছর তার সঙ্গে চুক্তি করা হয়। এবারও বাদ যায়নি। শুধু গণি মিয়ার চালকল নয়। গোটা জেলায় এভাবেই অনেক বন্ধ চালকল চুক্তিবদ্ধ চালকলের তালিকায়।
এদিকে ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে অনেক কৃষকই জানেন না তার নাম উঠেছে লটারিতে। এসব নামের বিপরীতে ধান সরবরাহ করছেন প্রভাবশালী নেতারা। আবার কোনো কোনো কৃষক জানতে পারলেও এক থেকে দেড় হাজার টাকা দিয়ে ওই কৃষককে সন্তুষ্ট থাকতে বলছেন নেতারা। ফলে লাভবান হচ্ছেন নেতারা।
ধান সংগ্রহে অনিয়মের ব্যাপারে রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নাজমুল ভুঁইয়া বলেন, কৃষকের তালিকা তো আমরা করি না। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটি লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করে। তারা যে তালিকা দেন সেই তালিকা অনুযায়ীই ধান সংগ্রহ করা হয়। আর চালকলের অনিয়মের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি খাদ্য নিয়ন্ত্রক। তিনি বলেছেন, বিষয়টা নিয়ে দুদক তদন্ত করছে। এ অবস্থায় কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft