বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
সুঁই সুতোয় বাঁধা পাঁচ লাখ মানুষের জীবন
# কর্মী এক লাখ # সন্তোষজনক মজুরি নেই
মিনা বিশ্বাস :
Published : Monday, 20 January, 2020 at 6:51 AM
সুঁই সুতোয় বাঁধা পাঁচ লাখ মানুষের জীবনগৌরব আছে। রয়েছে সমস্যা। তারমধ্যে আছে সম্ভাবনাও। ঐতিহ্যের যশোরে ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পও। এখানকার শ্রমিকের মেধা, শ্রম ও ঘামে নিপুণ হাতে তৈরি হস্তশিল্প এ অঞ্চলকে আলাদা মর্যাদা এনে দিয়েছে। এ কাজের সাথে যুক্ত রয়েছে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের দু’শতাধিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। যশোরে সুঁচি শিল্পে প্রশিক্ষিত কর্মী কাজ করছে ৯১ হাজার। তবে, কারও কারও দাবি, এক লাখেরও বেশি কর্মী প্রত্যক্ষভাবে এ কাজের সাথে জড়িত। তাদের একজনের ওপর পাঁচজন করে সদস্য নির্ভরশীল হলে পাঁচ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে এই শিল্পে।
ষাটের দশকে সামাজিক ব্যক্তিত্ব আয়শা সরদার সুঁচি শিল্পের সূচনা করেন। পরবর্তীতে তারই সূত্র ধরে এই শিল্প সামনের দিকে এগিয়ে যায়। যার সর্বশেষ অবস্থা আজকের যশোর। শুধু দেশ না, দেশের বাইরেও পছন্দের তালিকায় যশোরের সুঁচি শিল্প স্থান করে নিয়েছে। ধারা, বাঁচতে শেখা, আরআরএফ, ফোঁড়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশে তাদের উৎপাদিত পণ্য পাঠাচ্ছে।
যশোরের সুঁচি শিল্পের গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাহিদা তৈরি করেছে। দৃষ্টি নন্দন ও গুণগতমানের কারণে দেশের গন্ডি পেরিয়ে তা পৌঁছে যাচ্ছে বিদেশেও। যশোরের সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে হস্তশিল্পের কাজ করা হয়। জেলা সমাজসেবা অফিসের রেজিস্ট্রেশনভুক্ত এ শহরের চারশ ছয়টি এনজিও, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অন্তর্ভুক্ত ৫০টি নারী সংগঠন, জেলা সমবায় অফিসের অধীনে ১০টি সমিতির সদস্য এবং জাতীয় মহিলা সংস্থা থেকে বিগত দশ বছরে হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়শ ৯০ জন প্রশিক্ষণার্থী হস্তশিল্পের কাজ করছেন।
এনজিও পর্যায়ে জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন, আরআরএফ, ধারা, আইইডি, জয়তী সোসাইটিসহ কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা। জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে রেজিস্ট্রেশনভুক্ত রয়েছে দোলা হস্তশিল্প, বধূয়া হস্তশিল্প, আয়োজন, ধারা, সোনালী দিন, আলোর পথে, কর্মেই মুক্তি, অপরাজিতা, গ্রামীণ মহিলা উন্নয়ন সংস্থা, প্রেরণা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা, অগ্রণী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা, স্বজন মহিলা উন্নয়ন সংগঠন, কেয়া কুটির, সেভ সোসাইটিসহ মোট ৫০টি প্রতিষ্ঠান। জেলা সমবায় অফিসের অধীনে মেঘদূত কারুশিল্প, অংকুর, যশোর উইমেন বিউটি পার্লার মহিলা সমবায় সমিতি, আয়েশা মুন মহিলা উন্নয়ন সংগঠন, স্বচ্ছ সমবায়, নবজীবন ও চিত্রা সমবায় সমিতি হস্তশিল্পের কাজ করছে। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে রঙ হ্যান্ডিক্রাফট, ফোঁড়, চেতনা হস্তশিল্প, ছোঁয়া হস্তশিল্পসহ এ শহরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট বড় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের এসব সংগঠনে কাজ করছেন অসংখ্য মানুষ। যশোরের সুঁচি শিল্পের প্রসারে প্রতি বছর প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ফোঁড়। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও হস্তশিল্পের কাজ করা হয়।
তবে যে হস্তশিল্প যশোরকে আলাদা খ্যাতি এনে দিয়েছে তারই নেপথ্যের কারিগররা বছরের পর বছর ধরে মজুরি বঞ্চনার শিকার। আলোর ওপাশে যে অন্ধকার এরাই তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এসব কর্মীই থেকে গেছেন অবহেলিত ও উপেক্ষিত। প্রতিটি নকশিকাঁথা, চাদর, ওয়াল ম্যাট, শাড়ি, থ্রিপিছ, ওয়ানপিছ, কুশনকাভার সেলাই করে যথসামান্যই মজুরি পান হাজার হাজার নারী শ্রমিক। দারিদ্র্য ও অভাব অনটন সঙ্গী হওয়ায় জীবন জীবিকার তাগিদে স্বল্প পারিশ্রমিকেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের।
সুঁচি শিল্পের শ্রমিকরা জানান, প্রতিটি ওড়না ৫০ থেকে একশ টাকা, ওয়ানপিছ একশ ৫০ থেকে দু’শ টাকা, ফতুয়া একশ থেকে একশ ৫০ টাকা, পাঞ্জাবি একশ থেকে দু’শ টাকা, শাড়ি দু’শ থেকে পাঁচ’শ টাকা, থ্রিপিছ একশ ৫০ থেকে দু’শ ৫০ টাকা, ওয়ালম্যাট একশ থেকে দু’শ টাকা, বিছানার চাদর আটশ থেকে এক হাজার টাকা, নকশিকাঁথা আটশ থেকে এক হাজার পাঁচশ টাকা পর্যন্ত মজুরি দেয়া হয়।
শহরের পশ্চিম বারান্দিপাড়া এলাকার হস্তশিল্প কর্মী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘প্রতিটি কাজের যে পরিমাণ মজুরি হওয়া প্রয়োজন তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ আমরা পাই। ১৫ বছর ধরে সেলাই কাজের সাথে আছি। জীবনে কোনো দিন ন্যায্য মজুরি পাইনি। একটি অলওভার নকশিকাঁথা বা চাদর সেলাই করে যা পাই, তা কখনও মজুরি হতে পারে না। রাত দিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করে আমাদের এক একটি আইটেম তুলতে হয়।’
একই ধরনের বঞ্চনার কথা বলেন শহরের হুঁশতলা এলাকার মমতাজ বেগম, ঝুমঝুমপুরের শাহানা খাতুন ও রওশন আরা, মোল্লাপাড়ার তাসলিমা আক্তার, ফাতেমা খাতুন ও রাশিদা বেগম, সিটি কলেজপাড়ার তহমিনা সুলতানা ও লোনঅফিস পাড়ার আকলিমা খাতুন।
অন্যদিকে, ‘মজুরি বিষয়ে নারী উদ্যোক্তা ও স্বাধীন মহিলা উন্নয়ন সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ সিরিয়া সুলতানা রিনা বলেন, এটা সঠিক যে হস্তশিল্পের সাথে যুক্ত যারা তারা ন্যায্য মজুরি বঞ্চিত। সবাই একই ধরনের পারিশ্রমিক দেন না। কমবেশি হয়ে থাকে’। আরেক উদ্যোক্তা শাহরিয়ার সিদ্দিকী পল্লবী বলেন, ‘তার অধীনে আড়াইশ’ কর্মী কাজ করেন। আমি তাদের ন্যায্য মজুরি দেয়ার চেষ্টা করেন’।
জেলা সহকারী সমবায় কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, সরকারি-বেসরকারি এবং ব্যক্তি উদ্যোগে সব মিলিয়ে যশোর শহরের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মানুষ কাজ করছেন। এখানকার তৈরি হস্তশিল্প বিদেশেও যাচ্ছে। তবে, অপ্রিয় হলেও সত্য যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাওয়া এসব মানুষ বরাবরই মজুরি বঞ্চিত মধ্যস্বত্তভোগীদের কারণে।
অন্যদিকে, জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে গত ৩০ বছরে দু’হাজার চারশ ৪৬জনকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে বলে জানান উপপরিচালক এটিএম গোলাম মাহবুব। তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠান থেকে যারা প্রশিক্ষণ নেন তারা সবাই হস্তশিল্পের কাজের সাথে যুক্ত। কমবেশি সবাই হস্তশিল্পের কাজ করছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনে হস্তশিল্পের কাজে জড়িত রয়েছেন এক হাজার কর্মী। হস্তশিল্পে ৫০ হাজার পরিবার এই প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। বৈচিত্র্যময় নানা আইটেম তৈরি হয় এ এনজিও থেকে।
নারী, পুুরুষ, হাউজ হোল্ড ও বেবি এ চারটি ক্যাটাগরিতে হস্তশিল্পের কাজ বিভক্ত। নারীদের জন্যে শাড়ি, থ্রিপিছ, ওয়ানপিছ, টুপিছ, ওড়না, কুর্তি, ম্যাক্সি, পুরুষের পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্ট, ট্রাউজার। দু’থেকে ১৮ বছর বয়সীদের জন্যে তৈরি হয় বিভিন্ন ধরনের পোশাক, হাউজ হোল্ড আইটেমের জন্যে বেডকাভার, ওয়ালমেট, ফ্লোরমেট, পার্সব্যাগ, কয়েন ব্যাগ, গ্লাস কোস্টার, কুশনকাভার, টিস্যু বক্স কাভার, রুমাল, স্কার্ফ, জায়নামাজ, মেয়েদের কোটি। এ সকল আইটেমে প্রধানত নকশি, শান্তিপুরী, যশোর স্টিচ, শ্যাডো, অ্যাপলিক, গুজরাটি এ চারটি সেলাইয়ে বুনন করা হয়।
বাঁচতে শেখা ৪৪ বছর ধরে হস্তশিল্পের কাজ করছে। ১৯৮১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৫ হাজার কর্মীকে হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণার্থীরা আরও ৭৫ হাজার কর্মীকে হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণ ও কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক অ্যাঞ্জেলা গমেজ বলেন, ‘আনঅফিশিয়ালি ৪৪ বছর ধরে কাজ করছি। বাঁচতে শেখার প্রশিক্ষিত কর্মী ও তাদের দ্বারা প্রশিক্ষিত কর্মী মিলিয়ে কর্মীর সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যাবে। সংগঠনের কোঅর্ডিনেটর সৌরভ আনসারী বলেন, অ্যাঞ্জেলা গমেজ হস্তশিল্পে এ অঞ্চলের প্রধানের ভূমিকা পালন করছেন। কারণ আজকের যে জাগরণী চক্র বা আরআরএফ শুরুর দিকে তাদের কর্মীরা বাঁচতে শেখা থেকেই প্রথম প্রশিক্ষণ নেন। এভাবে বাঁচতে শেখার প্রশিক্ষিত কর্মীরা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে হস্তশিল্পের কাজে ছড়িয়ে রয়েছেন’।
জয়তী সোসাইটি ও তার অন্তর্ভুক্ত ৫৪টি সংগঠনের অধীনে কাজ করছেন প্রায় দশ হাজার কর্মী। ৫০ হাজার সদস্য তাদের উপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে হস্তশিল্পের কাজ করছেন তনুজা রহমান মায়া। তার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজ করছেন এক হাজার কর্মী। এনজিও ও ফ্যাশন হাউজ ধারার কর্ণধার লিপিকা দাস গুপ্তার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে একশ’ ৫৫ জন কর্মী হস্তশিল্পের কাজ করছেন। আইইডিতে কাজ করছেন পাঁচশ ৩০ জন। শহরের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান দোলা হস্তশিল্প। এতে কাজ করছেন প্রায় এক হাজার একশ কর্মী। আড়াইশ কর্মী নিয়ে হস্তশিল্পের কাজ করছেন নারী উদ্যোক্তা সুফিয়া মাহমুদ রেখা।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সকিনা খাতুন বলেন, মানের কারণেই যশোরের হস্তশিল্পের আলাদা খ্যাতি তৈরি হয়েছে। তবে মজুরি বঞ্চিত এ কাজের সাথে নিয়োজিত কর্মীরা। এ বৈষম্য বন্ধ হওয়া উচিত। 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft