বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
এবার ব্যাংক কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করলেন কেশবপুরের বহুলালোচিত ইউপি চেয়ারম্যান আনিস
ভাতা ভোগীদের টাকা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ
আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ, কেশবপুর
Published : Friday, 15 May, 2020 at 9:07 PM
এবার ব্যাংক কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করলেন কেশবপুরের বহুলালোচিত ইউপি চেয়ারম্যান আনিসপ্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারি ভাতা প্রদান কাজে বাধা ও ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে কেশবপুরের ত্রিমোহিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আনিসুর রহমান আনিসের বিরুদ্ধে। সরকারি নির্দেশনার বাইরে ভাতা প্রদানে অস্বীকৃতি জানানোয় ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করেছেন তিনি। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট একাধিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।  
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে অগ্রাধিকার প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম সামাজিক নিরাপত্তাবলয়ের সকল প্রকার (বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী) ভাতা প্রদানের অংশ হিসেবে ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে সারা দেশে একশ’টি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। বুধবার সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক কেশবপুরের ত্রিমোহিনী ইউনিয়ন পরিষদে ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ভাতা প্রদান করছিলেন। এসময় একাধিক ভাতাভোগীর কার্ডের সমস্যা থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদেরকে উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন। এসময় তারা ইউপি চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান আনিসকে জানান। চেয়ারম্যান ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তাদের সরকারি নির্দেশনার বাইরে ভাতা প্রদান করতে বলেন। কিন্তু, ব্যাংক কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তাদের অপারগতা প্রকাশ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন চেয়ারম্যান। তিনি ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তাদের একটি ঘরে আটকে রেখে রাখেন এবং অশালীন ব্যবহার করেন। এসময় একজন কর্মকর্তার ব্যাগে থাকা ভাতার টাকা ছিনতাই হতে পারে ভেবে তিনি কৌশলে আত্মরক্ষা ও সেই অর্থ রক্ষায় পালিয়ে চলে আসেন।
খবর পেয়ে ব্যাংক এশিয়ার কেশবপুর উপজেলা সমন্বয়কারী অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদেরকে উদ্ধার করেন। মোস্তাফিজুর রহমান চেয়ারম্যান আনিসের নিকট ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তাকেও চেয়ারম্যান মারপিট করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে জানা গেছে। এসময় সেখানে উপস্থিত ৫ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বরের সহযোগিতায় ব্যাংক এশিয়ার কর্মকর্তারা আত্মরক্ষার জন্য সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। তারা ঝুঁকিপূর্ণ ও অনিরাপদ হওয়ায় ত্রিমোহিনী ইউনিয়নের ভাতা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এ কারণে ওই এলাকার শতাধিক ভাতাভোগী ভাতা নিতে এসে ফিরে গেছেন। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৬ ফেব্রæয়ারি চেয়ারম্যান এস এম আনিসুর রহমান আনিস উপজেলার রঘুরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বুড়িহাটি গ্রামের আব্দুল লতিফ ও তার শ্যালক ত্রিমোহিনী ইউনিয়নের গোপালপুর বাজারের কপোতাক্ষ ফার্মেসির প্রোপাইটর নজরুল ইসলামকে তার বাহিনী দিয়ে তুলে এনে মারপিট করে আহত করেন। এছাড়াও ওই চেয়ারম্যানের হাতে সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাকে মারপিট করে আহত করার অভিযোগ রয়েছে।
বহুল বিতর্কিত ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে সমালোচিত চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস একবার ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলও খেটেছেন। তারপরও তার অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তার মতের বিরুদ্ধে গেলেই ব্যাংক কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক সহকর্মী ও সাধারণ মানুষকে তিনি মারপিট করতে কুণ্ঠিত হন না।
এলাকাবাসী জানান, উপজেলার ত্রিমোহিনী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান যুগ্ম আহবায়ক আনিছুর রহমান ২০১৬ সালে ২৮ মে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে ত্রিমোহিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালের ৬ মার্চ চেয়ারম্যানের বাড়ির এলাকায় সরকারি খাস জমিতে প্রাচীর তৈরিতে বাধা দেয়ার ঘটনায় চেয়ারম্যান আনিস ভূমি অফিসে ঢুকে সাতবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা বিষ্ণুপদ মল্লিকের মুখ চেপে ধরে বাম কানের ভেতর মোটরসাইকেলের চাবি ঢুকিয়ে র্নিযাতন চালায় ও বেদম মারপিট করে। আহত ওই কর্মকর্তার বাড়ি মণিরামপুর উপজেলার পদ্মনাথপুর গ্রামে। ওই দিন রাতে উপজেলার ত্রিমোহিনী বাজারে অভিযান চালিয়ে আনিসুর রহমানকে আটক করে ডিবি পুলিশ। এসময় তার প্যান্টের পকেট থেকে ১২০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানায়। এ ঘটনায় ডিবি পুলিশের পিএসআই এজাজুর রহমান তার বিরুদ্ধে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে কেশবপুর থানায় একটি মামলা করেন। যার নং-০৮।
অপরদিকে, সরকারি কাজে বাধা দানের অভিযোগে তহশীলদার বিষ্ণুপদ মল্লিক চেয়ারম্যানসহ তার সহযোগী  তিনজনকে আসামি করে থানায় আরও একটি মামলা করেন। যার নং-০৭।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, গত ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মারপিটসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছেন। তার পরিষদের কয়েকজন মেম্বরকে নিয়ে তিনি এলাকায় একটি বাহিনী গড়ে তুলে চাঁদাবাজি, বিভিন্ন শালিসের নামে সরকারি কর্মকর্তা ও তার দলীয় নেতাকর্মীদের মারপিট করে আসছেন। ২০১৬ সালের ৭ অক্টোবর জমিজমা সংক্রান্ত শালিসের নামে চেয়ারম্যান আনিস শাহাপুর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সোবহান গাজীকে ত্রিমোহিনী বাজারে প্রকাশ্যে কাঠেরচলা দিয়ে পিটিয়ে পঙ্গু করে দেয়। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে তিন মাস চিকিৎসার পর সোবহান গাজী বাড়ি ফিরে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয়রা জানান, তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েই এলাকায় স্বঘোষিত শাসক হিসেবে ঘোষণা দেন। যার কারণে বর্তমানে এলাকায় চলছে চেয়ারম্যান বাহিনীর অপশাসন। মাছের ঘের দখল, চাঁদাবাজি, গাছকাটা, গাছ বিক্রি-সবই আনিস বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটলেও এলাকায় মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। এসব বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসকের নিকট একাধিকবার লিখিত অভিযোগও করা হয়েছে।
এবিষয়ে জানার জন্য ত্রিমোহিনী ইউপি চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আনিসুর রহমান আনিসের ব্যবহৃত মোবাইলের নম্বরে কল দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো কিছু না বলেই কল কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার তার মোবাইলে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি।  
এ বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার (আর্থিক অন্তভূক্তি বিভাগ) যশোর জোলার এরিয়া ম্যানেজার সৈয়দ রানা পারভেজ  গ্রামের কাগজকে বলেন, কেশবপুরের ত্রিমোহিনী ইউপি চেয়ারম্যান এস এম আনিসুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারি ভাতা প্রদান কাজে বাধা প্রদান করেছেন। সরকারি নির্দেশনার বাইরে গিয়ে ভাতা প্রদান করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তিনি ব্যাংক কর্মর্তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন। এবিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ প্রশাসনের একাধিক দপ্তরে অভিযোগ করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ওই এলাকায় ভাতা প্রদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে ভাতা প্রদান শুরু করা হবে।
উপজেলা সমাজসেবা অফিসার তরিকুল ইসলাম গ্রামের কাগজকে বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। তবে যদি কারও ভাতার কার্ডে কোনো সমস্যা থাকে তাহলে ব্যাংক থেকে টাকা দিতে পারবে না। যে কোনো সমস্যা হলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা ভাতার কার্ড ঠিক করে দিতে পারবো।’
উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুসরাত জাহান গ্রামের কাগজকে জানান, ‘এ বিষয়ে একটি অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft