মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
এ যেন জীবনের শেষ কেনাকাটা!
সরোয়ার হোসেন
Published : Monday, 18 May, 2020 at 10:11 PM
এ যেন জীবনের শেষ কেনাকাটা!জৈষ্ঠ্যের কাঠফাটা রোদ আর প্রচÐ ভ্যাপসা গরম, কিন্তু কে কেয়ার করে? এ যেন জীবনের শেষ কেনাকাটা! তাই শেষ বাজারে মানুষের প্রচুর ভিড়। মার্কেটে পা ফেলার জায়গা নেই-দম বন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা। কিন্তু থামার উপায় নেই, সবার যেন ‘হন্যে অবস্থা’। গতকাল যশোরের বাজারে ছিল স্মরণকালের এমন বিরল দৃশ্য।
‘১০ মে শপিংমল খোলার পর এমন ভিড় আর কখনো হয়নি। সাধারণত চাঁদ রাতেও বাজারে এত ভিড় থাকে না। সবাই ঈদের শেষ কেনাকাটায় ব্যস্ত। যেকোনোভাবেই হোক বিকেল চারটার মধ্যেই সবকিছু কিনে বাড়ি ফিরতে হবে! মানুষের এই মব নিয়ন্ত্রণ করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেখতে হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধিও’-মঙ্গলবার ঈদের আগে যশোরে শেষ কেনাকাটার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে উপরোক্ত কথাগুলো বলেন যশোর সিটি প্লাজা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি শফিকুর আজাদ।
তিনি জানান, সিটিপ্লাজা শপিংকমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানা হচ্ছে। তবে, অন্যান্য জায়গার অবস্থা খুবই করুণ। বাজারে মানুষের উপস্থিতি এত যে ইচ্ছা করলেও অনেকে এটা মানতে পারবে না।
কার্যত সোমবার যশোরের বাজারে মানুষের ঢল নেমেছিল। শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ, সুস্থ থেকে অসুস্থ-কে না এসেছিলেন বাজারে! করোনার প্রভাব নিয়ন্ত্রণে যশোরের প্রশাসন আজ মঙ্গলবার থেকে শপিংমল ফের বন্ধ ঘোষণার করায় সবাই শেষ কেনাকাটায় এক প্রকার হুমড়ি খেয়ে পড়েন। প্রতিটি ঈদের আগে যশোরের বাজারের যে পরিস্থিতি হয় সোমবারও দোকান খোলা রাখার শেষ দিনে এসে একই পরিস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অভিজাত বিপণীবিতান থেকে শুরু করে কালেক্টরেট মার্কেট-সবখানেই ছিল সেই চিরচেনা দৃশ্য। ফুটপাতও ছিল দোকানি আর ক্রেতাদের উপস্থিতিতে জমজমাট। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। ধনি থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত এমনকি নি¤œবিত্ত-সবাই এসেছেন পরিবার পরিজন নিয়ে নতুন পোশাক, জুতা, স্যান্ডেল আর প্রসাধনী কিনতে। বাজারে কে কার শরীরের ওপর গিয়ে পড়ছেন তার কোনো খেয়ালই ছিল না। সবাই আগে কিনে আগে বাড়ি ফিরতে ব্যস্ত। ক্রেতাদের সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছেন দোকান কর্মচারীরা। আবার নির্ধারিত সময় বিকেল চারটার পরও দেখা গেছে স¤্রাট, লিবার্টি, গ্যালারি, টম অ্যান্ড জেরির মত বড় বড় দোকান খোলা । এ নিয়ে অন্য দোকানিদের মনেও ছিল ক্ষোভ।
যশোর কালেক্টরেট মার্কেটের পুরাতন কাপড়ের দোকানের কর্মচারী শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘মানুষের কাছে টাকা নেই কে বললো। মার্কেটের অবস্থা দেখেতো মনে হচ্ছে না করোনার কারণে দেশে কোনো অভাব আছে।’
তিনি জানান, ‘দোকান খোলার আগেই মার্কেটে কাস্টমার আসা শুরু হয়েছে। এভাবে সারাদিন হাজার হাজার কাস্টমারে সরগরম ছিল কালেক্টরেট মার্কেট, নিক্সন মার্কেট, টাউনহল ময়দান আর সামনের ফুটপাত। সবখানেই মানুষে গিজগিজ করছিল। তীব্র গরমের মধ্যেও কারও উৎসাহের কোনো ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়নি।’
এদিকে, একদিন সময় দিয়ে দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়ায় পরিস্থিতি এমন হয়েছে বলে মনে করেন ফোঁড়-এর স্বত্ত¡াধিকারী মামুনুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘বন্ধ যখন করাই হলো তখন আজ (সোমবার) থেকেই বন্ধ করা উচিত ছিল। রোববার বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর তা মুহূর্তেই সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তা সাধারণ মানুষের আর জানতে বাকি ছিল না। সকাল হতে না হতেই মানুষ বাজারে হামলে পড়ে একদিনের সুযোগ কাজে লাগাতে। এতে বরং আরও ক্ষতি হলো। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আশঙ্কা নিয়েই এখন সবাইকে আতঙ্কে থাকতে হবে।’
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যশোর শহরের বড়বাজার, চৌরাস্তা, আরএন রোড, কালেক্টরেট মার্কেট, মুজিব সড়ক ঘুরে মানুষের মাত্রাতিরিক্ত ভিড় লক্ষ্য করা যায়। মানুষের উপস্থিতিতে এসব এলাকার দোকানগুলোর মধ্যে প্রবেশ করাই দায় হয়ে পড়ে। প্রতিটি দোকানেই দেখা যায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা বসে মানুষ পোশাক, জুতা বা অন্যান্য জিনিস পছন্দ করছেন। মানুষের চাপ এত ছিল যে একজনের পেছনে একাধিকজনকেও অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। একমাত্র সিটিপ্লাজা ছাড়া কোথাও কোনো স্বাস্থ্যবিধির বালাই ছিল না। অধিকাংশ দোকানে প্রবেশ করতে কোনো হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হয়নি। ক্রেতাদের অধিকাংশের মুখেও ছিল না কোনো মাস্ক। হাতে ছিল না গøাভসও। যাদের মাস্ক ছিল দোকানিদের সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে তাদের মুখ থেকে তা নীচে নেমে গেছে সেদিকেও খেয়াল ছিল না কারও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে যশোরের প্রসিদ্ধ একটি কাপড়ের দোকানের এক কর্মচারী বলেন, ‘ভাই সবাইতো আর এসে একটা শাড়ি দেখেই নিয়ে যায় না। এক একজন কমপক্ষে দশটা দোকান ঘুরে ৫০ থেকে ৬০টা শাড়ি দেখে একটা বা দুটো কিনেছে। বাকিগুলো এভাবেই একাধিক কাস্টমারের হাতে হাতে ঘুরেছে।’
স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা বলতেই আর এক দোকানি বলেন, ‘রাস্তায় তো দেখে এলেন কী অবস্থা। শুধু মানুষ আর মানুষ। বেশিরভাগই মেয়েরা। একজনের সাথে চারটা লেপ্টে আছে যেন। দু’মাসের বাচ্চা থেকে শুরু করে বুড়ো-জুয়ান কে আসেনি! তারা দোকানে ঢোকার পর আর আমাদের কিছু করার থাকছে না। আর কার হাতে করোনা নেই, কার হাতে আছে তা আমরা বুঝবো কেমন করে। মানুষের স্বাস্থ্য কী দেখবো, আমরা নিজেরাইতো করোনার ঝুঁকিতে আছি।’
মার্কেটের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো যশোর শহরে। চৌরাস্তা, দড়াটানা, আইনজীবী সমিতির মোড়-সবখানেই সকাল থেকেই ছিল তীব্র যানজট। রিকশা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেলের উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ পায়ে হেঁটে চলাচল করতেও যন্ত্রণার শিকার হয়েছেন।
সিটিপ্লাজা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও ফোঁড়ের স্বত্ত¡াধিকারী মনে করেন, এভাবে দোকান খোলা আর বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি। এই পরিস্থিতি হতে পারে তা সচেতন নানা মহল থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু, কেউ কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ফলে, যা হওয়ার তাই হয়েছে। শুধু সোমবারের ঈদ বাজারের কারণে পুরো যশোর এমনকি আশপাশের জেলাগুলোর মানুষ করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেল।
ব্যবসায়িক দিক দিয়েও দোকান খোলা ও হঠাৎ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন শফিকুর আজাদ। তিনি বলেন, ‘দোকান খোলা রাখার সিদ্ধান্তের পর ব্যবসায়ীরা জানতো ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এটা চালু থাকবে। সে কারণে সব ব্যবসায়ীই ঢাকা বা অন্যান্য মোকাম থেকে মালামাল কিনেছেন। সবাই আশা করেছিলেন টানা প্রায় দু’মাস বন্ধের পর যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিয়ে কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দেয়া যাবে। মাঝপথে দোকান বন্ধ হওয়ায় ব্যবসায়ীরা যে ক্ষতির সম্মুখিন হলেন তা মরার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে গেল।’


 
 



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft