শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোর বিদ্যুৎ বিভাগ
আম্পানে ক্ষতি ১০ কোটি টাকার
জাহিদ আহমেদ লিটন ও এস এম আরিফ
Published : Friday, 29 May, 2020 at 11:10 PM
আম্পানে ক্ষতি ১০ কোটি টাকার ঘূর্ণিঝড় আম্পানে যশোরের বিদ্যুৎ সেক্টরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দশ কোটি টাকা। ঝড়ে লন্ডভন্ড হয়েছে দশ হাজার কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন। বিকল হয়েছে ১২০টি ট্রান্সফরমার। পরিবর্তন করা হয়েছে আড়াই হাজার ইন্সুলেটর ও পাঁচশ’টি ফিটিংস। একইসাথে বৈদ্যুতিক পোল পরিবর্তন করা হয়েছে এক হাজারটি। যা নিয়ে রীতিমত হিমশিম খেয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ ও ওজোপাডিকো কর্তৃপক্ষ। এ কাজ করতে গিয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ঈদ আনন্দ বা কোন ঘুম ছিল না। তবে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক তৃতীয়াংশ গ্রাহক এখনো অন্ধকারে রয়েছেন। তাদের প্রায় নয় হাজার কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
গত ২০ মে রাতে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আম্পান সাতক্ষীরার সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হানে। এরপর তা যশোরাঞ্চলের উপর দিয়ে বয়ে যায়। একশ’ থেকে ১৪০ মাইল গতিসম্পন্ন এ ঘূর্ণিঝড় এরআগে যশোরাঞ্চলের মানুষ দেখেনি। ঝড়ের প্রভাবে গোটা জেলা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। দেয়াল ও গাছ চাপায় ১৩ জন মানুষ প্রাণ হারান। আহত হন অন্তত অর্ধশত। এছাড়া শত শত ঘর-বাড়ি ভেঙ্গে যায় ও উপড়ে যায় হাজারো গাছপালা। করোনা পরিস্থিতির মাঝে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ চরম সমস্যায় নিপতিত হন। তারা ঘরবাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন।
ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় আম্পান যশোরের বিদ্যুৎ সেক্টরও তছনছ করে দিয়েছে। ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ বিভাগ ২০ মে রাত ৮টা নাগাদ গোটা জেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পরদিন দুপুর নাগাদ শহরে এ বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে চালু হতে থাকে। কিন্তু গ্রামাঞ্চল থাকে অন্ধকারে। ২১ মে ভোর থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে লাইনম্যানরা ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ ও উত্তরণে মাঠে নেমে পড়েন। এসময় থেকে তারা এক নাগাড়ে কাজ চালিয়ে ২৬ মে থেকে শহরাঞ্চলে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হয়। তবে পল্লী বিদ্যুতের এক তৃতীয়াংশ গ্রাহক থেকে যায় অন্ধকারে। এসময়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাসহ সাধারণ কর্মচারীদের কোন ঈদ আনন্দ, পরিবার বা ঘুম ছিল না। তারা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে রাত-দিন কাজ করেছেন।
যশোর ওজোপাডিকো সূত্রে জানা যায়, গোটা জেলায় বিদ্যুৎ বিভাগের এক কোটি ৩২ লাখ ৯৩ হাজার ১৯২ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে বৈদ্যুতিক লাইনের তার। ঘূর্ণিঝড়ে জেলার বিভিন্নস্থানে মোট ১২০ কিলোমিটার তার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈদ্যুতিক লাইনের এসব তার বেশিরভাগ গাছ পড়ে ও কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙ্গে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ জেলায় লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া ১২০ কিলোমিটার তার পুন:স্থাপন করেছে। একইসাথে ভেঙ্গে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক পোল পরিবর্তন করেছে ৮১টি ও সোজা করা হয়েছে ৮৬টি। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার নষ্ট হওয়ায় পরিবর্তন করা হয়েছে ২১টি। এরমধ্যে ২৫০ কেভিএ ৩টি, ২০০ কেভিএ ১১টি ও ১০০ কেভিএ ৭টি। পরিবর্তন করা হয়েছে ইন্সুলেটর ১৮৬টি ও ফিটিংস পরিবর্তন করা হয়েছে ৯০টি। যশোর বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-১ ও বিভাগ-২ এর আওতায় বিভিন্ন এলাকায় এ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যা সচল করতে দুটি বিভাগের কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। বিদ্যুতের ক্ষয়ক্ষতির এ তালিকা ২৭ মে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে, যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪ কোটি ৪১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। যশোর সদরসহ পাঁচটি উপজেলায় এ ক্ষতি হয়েছে। এসব এলাকায় তাদের গ্রাহক সংখ্যা ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭২ জন। ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙ্গে যাওয়া পোল পরিবর্তন করা হয়েছে ৫৫২টি ও হেলে পড়া পোল সোজা করা হয়েছে ৭১৩টি। ট্রান্সফরমার পরিবর্তন করা হয়েছে ৪৯টি। মিটার পরিবর্তন করা হয়েছে তিন হাজার ৪৬০টি। ক্রস আর্ম নষ্ট হয়েছে ৪৩০টি। ইন্সুলেটর নষ্ট হয়েছে এক হাজার ৭৭০টি। সাড়ে আট হাজার কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইনের এক হাজার ৪১০টি স্থানে তার লন্ডভন্ড হয়েছে। যা পুন:স্থাপন ও মেরামত করা হয়েছে। বিপুল পরিমান এ ক্ষয়ক্ষতি যশোর সদর, শার্শা, ঝিকরগাছা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলা এলাকায় ঘটেছে। যা উত্তরণে এখনও তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এ ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিপুল পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যা নিরুপনে কর্তৃপক্ষ এখনও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কর্তপক্ষ ধারণা করেছে এ ক্ষতির পরিমাণ চার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর, নড়াইল, লোহাগড়া, কালিয়া উপজেলা এলাকায় এখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। ঘূর্ণিঝড়ে এসব এলাকার ৩০২টি বৈদ্যুতিক পোল ভেঙ্গে পড়ে। এ সমিতির প্রায় সাড়ে আট হাজার কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইনের দেড় হাজার স্থানে তার ছিঁড়ে নষ্ট হয়। যার বেশিরভাগই পরিবর্তন ও মেরামত করা হয়েছে। নষ্ট হয়ে যায় ৫০টি ট্রান্সফরমার। ক্ষতিগ্রস্ত এসব বৈদ্যুতিক লাইন মেরামতের জন্য ২১ মে ভোর থেকে জেনারেল ম্যানেজারসহ কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। যদিও গত দশ দিনে কর্তৃপক্ষ তাদের ৪ লাখ ৮২ হাজার ২শ’ গ্রাহকের ঘরে বিদ্যুৎ পৌছে দিতে পারেননি। তারা বলেছেন ২ থেকে ৫ ভাগ গ্রাহক এখনও বিদ্যুৎ সুবিধার বাইরে রয়েছেন। আগামী দু’একদিনের মধ্যে তারা সরবরাহ পেয়ে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কর্মকর্তারা।
এসব ব্যাপারে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর জেনারেল ম্যানেজার আব্দুল মান্নান এবং সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার অরুণ কুমার কুন্ডু বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পর থেকে পল্লী বিদ্যুতের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব:) মঈনুদ্দিন সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। তারা ঝড় শেষে ভোররাত থেকেই মাঠে নেমে কাজ শুরু করেছেন। এ কাজে তাদের কর্মীদের এখন পর্যন্ত খাওয়া ঘুম নেই। দিনরাত পরিশ্রম করেই তারা সমস্যা কাটিয়ে উঠেছেন। তবে অল্প কিছু সংখ্যক গ্রাহক এখনও বিদ্যুতের বাইরে রয়েছেন। দু’একদিনের মধ্যেই তারা বিদ্যুৎ পেয়ে যাবেন বলে এ দু’জন কর্মকর্তা দাবি করেন।    
এ বিষয়ে ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি যশোর সার্কেল-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম ও সার্কেল-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে যশোর বিদ্যুৎ সেক্টরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি নিরসনে তারা দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন, যাতে দ্রæততম সময়ে মানুষের বৈদ্যুতিক সমস্যার সমাধান হয়। গত প্রায় সাতদিন তারা টানা কাজ করার পর সকল সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন। যশোরের কোথাও বর্তমানে বৈদ্যুতিক সমস্যা নেই। তবে পল্লী বিদ্যুৎ তাদের আওতার বাইরে। তাদের সমস্যার বিষয়টি তারাই ভালো বলতে পারবেন বলে জানান এ দু’কর্মকর্তা।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ওজোপাডিকো যশোর সার্কেলের তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী শহিদুল আলমের সাথে। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে তারা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ঝড় থেমে যাবার পর ভোররাত থেকেই তাদের কয়েকটি টিম মাঠে নেমে পড়ে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লান্তিহীনভাবে কাজ চালিয়ে সকল সমস্যার উত্তরণ করতে সক্ষম হন। তবে এ ঝড়ে বিদ্যুৎ সেক্টরে বিপুল পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যা তাদের ধারণার বাইরে ছিল। সব ক্ষতি তারা কাটিয়ে উঠেছেন। বর্তমানে তাদের সেক্টরে কোন সমস্যা নেই। তাদের সকল গ্রাহক বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছেন বলে তিনি জানান।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft