শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২০
মতামত
ভারতের সাথে প্রতিবেশীদের এতো বৈরিতা কেন ?
হাসানুজ্জামান
Published : Saturday, 27 June, 2020 at 10:56 AM
ভারতের সাথে প্রতিবেশীদের এতো বৈরিতা কেন ?ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। পরমাণু শক্তিধর এই রাষ্ট্রটি ব্যবসা-বাণিজ্য, সামরিক দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো থেকে। বহু ভাষাভাষি এবং নানা ধর্মের মানুষের বসবাস এখানে। দেশটি ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগষ্ঠ বৃটিশদের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা লাভ করে। তবে বৃটিশরা এদেশ থেকে চলে যাওয়ার আগে ভারতবর্ষকে দ্বি-জাতি তত্তে¦র ভিত্তিতে বিভক্ত করে যায়। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা হিসাবে পরিচিত পাকিস্থান এবং হিন্দু এলাকা হিসাবে অধিক পরিচিত ভারত নামের দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে দেয়। আবার ১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্যদিয়ে পূর্বপাকিস্থান স্বাধীন হয় এবং বাংলাদেশ নামক নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ভারত বর্ষ নানাভাবে বিভক্ত হলেও ভারত-পাকিস্থানের জন্মগতভাবে যে বৈরিতা তা রয়েই গেছে। এই বৈরিতার সাথে যুক্ত হয়েছে ভারত-চীন এবং ভারত-নেপালের অমিমাংশিত সীমান্ত। ভারত-বাংলাদেশের সাথে সুসস্পর্ক তৈরীতে বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা নদীর পানি বন্টন এবং সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক প্রতিনিয়ত হত্যাকান্ড।
বৃটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে ঠিকই। কিন্তু সীমান্ত অরক্ষিত করে রেখে গেছে। সীমান্ত নিয়ে ভারত-চীনের সম্পর্ক মাঝে মধ্যে উত্তেজনায় ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্ত নিয়ে ভারতের সাথে চীনের যুদ্ধ বাঁধে ১৯৬২, ১৯৯৬ এবং ২০০৫ সালে। ২০০৫ সালে ভারতের সাথে চীনের চুক্তি হয় তাদের সৈনিকরা কেউ উভয় দেশের সীমান্তের দুই কিলোমিটারের মধ্যে অস্ত্র বহন করবে না। এ বছর ১৫ জুন ভারতের নাদাখ-গালওয়ান সীমান্তে ভারত-চীনের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এ সংঘর্ষে ভারতের একজন কর্ণেলসহ ২০ জন জওয়ান নিহত হয়। আহতদের সংখ্যা প্রায় ৭৬ জন। অপর পক্ষে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি( পিএলএ) এর মুখপাত্র কর্ণেল ঝাংশুইলি বলেছেন-‘গালওয়ান উপত্যকায় তাদেরও কিছু সৈনিক হতাহত হয়েছে।’ কিন্তু চীনের কতজন সৈনিক হতাহত হয়েছে তা তিনি জানাননি। তবে একাধিক সংবাদ সংস্থা থেকে জানা গেছে, চীনের হতাহতের সংখ্যা প্রায় ৪৩ জন। ভারত-চীনের সংগঠিত ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধেও চীন  তাদের ফৌজদের হতাহতের সংখ্যা বলেনি। এদিকে ভারতের দুই জন অফিসারসহ ১০ জন জওয়ানকে ধরে নিয়ে যায় চীনের ড্রাগন ফৌজ। পরে উভয়ের মাঝে শান্তি বৈঠক ফলপ্রসু হলে তাদেরকে মুক্তি দেয় চীন। আপাতত গেল ৫ মে থেকে ভারত-চীনের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে উত্তেজনা স্বস্তি দিলেও আবার কখন যে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়ে যায় তা শুধুই অপেক্ষার পালা। এবার আরো একটি আতংকের বিষয় হচ্ছে দুই কিলোমিটার সীমান্তে অস্ত্র বহনের যে নিষেধাজ্ঞা ছিল সেখান থেকে ভারত সরে এসেছে।
কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে পাকিস্থানের বিরোধ সেই ১৯৪৭ সাল থেকে। উভয় দেশই কাশ্মীরকে তাদের অংশ বলে দাবী করে আসছে। বৃটিশরা এদেশ থেকে চলে যাওয়ার সময় কাশ্মীরের বিষয়টি কোন দেশের নিয়ণÍ্রণে থাকবে সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। তবে তাদের বক্তব্য ছিল গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণ যে দেশের সাথে সংযুক্ত হতে চায় সেই দেশের সাথেই তারা যাবে। কিন্তু সেই গণভোট আর হয়নি। এদিকে সেই সময়ের কাশ্মীরের রাজা হরিসিং এক চুক্তিনামায় ভারতের সাথে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করে। সেই চুক্তি মোতাবেক ভারত কাশ্মীরকে দাবী করে আসছে। পাকিস্তান এই রকম চুক্তিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। ফলে কাশ্মীরের দখলকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালের ২১ শে অক্টোবর প্রথম ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সেই যুদ্ধ চলে ১৯৪৮ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত। ভারত জম্বু-কাশ্মীরের ১ লক্ষ ১ হাজার ৩৮৭ বর্গ কিলোমিটার জায়গা নিজেদের দখলে নেয়। অপরদিকে পাকিস্থান দখলে নেয় কাশ্মীরের ১৩ হাজার ৩৯৭ বর্গকিলোমিটার এবং গিরগিত বালতিস্থানের ৭২ হাজার ৪৯৫ বর্গ কিলোমিটার। গুজরাটের কচ্ছ মরুঅজ্ঞলের কর্তৃত্ব নিয়ে ১৯৫৬ সালে ভারত- পাকিস্থানের মধ্যে নতুন করে দ্বন্দের সূচনা হয়। এই দ্বদ্বে¦র ফলেই ১৯৬৫ সালে পুনরায় পাক-ভারত যুদ্ধ সংগঠিত হয়। পরে পাকিস্থানকে কচ্ছ মরুভ’মির ৩৫০ বর্গকিলোমিটার ছেড়ে দিলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধকালে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিলে পুনরায় পাক-ভারত যুদ্ধ বেঁধে যায়। এই যুদ্ধের মধ্যদিয়ে পূর্ব পাকিস্থান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যেকার বৈরী পরিবেশ কখনো কখনো শান্ত থাকলেও আবার অশান্ত হয়ে ওঠে।
এদিকে নেপালের জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে নতুন মানচিত্র। সেখানে ভারতের কিছু অংশ তারা দাবী করেছে। সম্প্রতি তারা ভারতবিরোধী প্রচারণা চালিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য এমন-‘ এভাবে জোর করে ভ’-খন্ড বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়, এটি আলোচনার মাধ্যমে সীমান্ত সমস্যা মেটানোর চুক্তির পরিপন্থি’। ১৮১৫ সালে বৃটিশ সরকার ও তৎকালিন নেপালের রাজার মধ্যে হওয়া ‘সুলিলী চুক্তি’ অনুযায়ী নেপাল কালী নদীর পশ্চিমপাড়ের সব ভূ-খন্ডের স্বত্বত্যাগ করে। ফলে এই কালী নদীর গতিপথ অনুসরণ করে ভারত ও নেপালের সীমান্ত নির্ধারিত হয়।কিন্তু ১৮১৭ সালে এসে নেপাল তিনকর, ছাংড়–,নভি এবং কুঠি গ্রামকে তাদের এলাকা বলে দাবী করে আসছে। এতোদিন বিষয়টি নিয়ে নেপাল কোন হৈ চৈ করেনি। তবে চলতি বছরের ৮ মে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ কেলাস মানসরোবর যাওয়ার জন্য লিপুলেখ দিয়ে নতুন রাস্তার সূচনা করলে ভারত- নেপালের মাঝে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ‘লিপুলেখ’ তাদের এলাকা বলে সরব হয় নেপাল। এ ক্ষেত্রে সমস্যা নিরোসনে ভারত নেপালকে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও নেপাল তা গ্রহণ করেনি। বরং তারা তাদের মানচিত্র বদলে দিয়ে দাবীকৃত তিনটি গ্রামকে সম্পৃক্ত করে মানচিত্রকে বর্ধিত করেছে।
কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্থানের সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে সেখান থেকে বের হয়ে আসা সহজ বলে মনে হয় না। অপরদিকে পারমানবিক শক্তিধর অপর রাষ্ট্র চীনের সাথে সীমান্ত নিয়ে ভারতের  মাঝে মধ্যেই সংঘর্ষ হয়। চলতি বছরের ১৫ই জুন দুই দেশের সৈনিকদের মধ্যে সংঘর্ষে যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। অপরদিকে নেপাল, ভারতের অর্ন্তগত কয়েকটি গ্রাম নিজেদের বলে দাবী করেছে।  সরকারী পর্যায়ে ভারত- বাংলাদেশ সম্পর্ক ভাল মনে হলেও ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তানদী এবং সীমান্তে বিএসএফ এর হত্যাকান্ড এই সম্পর্ক চিরস্থায়ী করতে প্রধান বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক ও সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটি। মোবাঃ ০১৭১১-১০৮৭৩৬  



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft