শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২০
মতামত
অনলাইন ক্লাস ও বাস্তবতা
সায়েদা বানু শিল্পী :
Published : Friday, 3 July, 2020 at 12:18 AM
অনলাইন ক্লাস ও বাস্তবতাঅনলাইন ক্লাস এবং বর্তমান বাস্তবতা নিজের কথা দিয়েই শুরু করি। যেহেতু আমি একজন শিক্ষক সেহেতু করোনার কারণে তিন মাসের অধিক সময় গৃহে অবস্থান আমার। কয়েকদিন আগে বিশেষ আলোচনার জন্য প্রধান শিক্ষক আমাদেরকে স্কুলে ডেকেছিলেন। আমাদের আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল অনলাইন ক্লাস এবং জেলা শিক্ষা অফিসের দেওয়া কিছু নির্দেশনা। বর্তমান পরিস্থিতিতে বহুল প্রচলিত ও ব্যবহৃত শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে এই অনলাইন ক্লাস।
এবিষয়ে আমার কিছু নিজস্ব ভাবনা তুলে ধরছি, যার সাথে অনেকের ভাবনার মিল নাও হতে পারে। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী আকার ধারণ করার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাড়িয়েছে অনলাইন ক্লাস। তাতে ক্লাস চলছে, পরীক্ষা চলছে, এমনকি ক্লাস প্রমোশনও হচ্ছে। বেশ কার্যকর একটা পদ্ধতি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই পদ্ধতিতে ক্লাসের সুবিধা কতজন শিক্ষার্থী পাচ্ছে? পেলেও তা কতখানি কার্যকর হচ্ছে আমাদের পরিবেশ, মানসিকতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায়। প্রথমেই বলি সুবিধার কথা। প্রায় চার মাস হলো সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা বাইরেও যেতে পারছে না, খেলাধুলারও সুযোগ নেই, গৃহশিক্ষকও বন্ধ। এমন অবস্থায় তারা সময় কাটানোর উপযুক্ত মাধ্যম না পাওয়াতে অবসাদ্গ্রস্থ হয়ে পড়ছে। নিজে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়াও কঠিন। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাসে শিক্ষার্থীরা যোগ দিতে পারলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় তাদের জন্য। না বুঝতে পারা বিষয়গুলো বুঝে নিয়ে এগোতে পারে। আর কিছু না হোক, লেখাপড়ার টাচে থাকতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো - এই অনলাইন ক্লাসের সুবিধা কতভাগ শিক্ষার্থী পাচ্ছে বা পেতে পারে। আমাদের দেশে ইন্টারনেট অনেক ব্যয়বহুল। করোনাকালে আর্থিক অনটনে ভুগছে অধিকাংশ পরিবার। তাছাড়া নেটের গতিও কম থাকার কারণে ক্লাস করা কঠিন । দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরার হয়না। এক্ষেত্রে যেসকল শিক্ষক ক্লাস নেবেন তাদেরকেও উল্লেখিত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এমনও দেখা যায় ক্লাস নিচ্ছেন টিচার, কিছু দুষ্টু শিক্ষার্থী মাইক অন করার সুযোগ পেলে গান বাজিয়ে দিচ্ছে দুষ্টুমি করে। অনলাইনে এটা মার্ক করা সহজ নয় যে কে করলো কাজটা। ক্লাসরুমে বসে দুষ্টুমি করা ছাত্রকে বোঝানো সম্ভব কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। স্কুলের ক্লাসরুম, বেঞ্চ, বø্যাকবোর্ড, অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ, এমনকি শিক্ষকের সাথেও শিক্ষার্থীর একটা মনস্তাত্তি¡ক সম্পর্ক থাকে পাঠ ভালোভাবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে। অনলাইন ক্লাসে সেটা সম্ভব নয়। অনেকেই তাই মনযোগী হতে পারে না। আমার স্কুলের কথাই বলি - আমার মেয়েদের খুব বেশি হলেও ১০% মেয়ের নেট ইউজ করার মত সামর্থ্য আছে। সেক্ষেত্রে আমরা কি করতে পারি! অধিকাংশেরই স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ নেই এবং কেনার সামর্থ্যও নেই। বর্তমানে সংসদ টিভিতে অনলাইন ক্লাস দেখানো হচ্ছে। এখানে সমস্যা হচ্ছে শিক্ষার্থীরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন করার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে অনেক বিষয় না জানা থেকে যায় বা বুঝতে সমস্যা হয়। পরীক্ষা নেওয়া এবং মূল্যায়ন করাও এই পদ্ধতিতে বেশ সমস্যাজনক। আমাদের শিক্ষকদেরও কিছু দূর্বলতা এখানে আছে। যেহেতু আমরা অভ্যস্ত নই, সেহেতু কিভাবে ক্লাস নিলে শিক্ষার্থীরা অধিক আকর্ষণ বোধ করবে এবং আগ্রহী হবে তা এখনো আমরা বুঝতে পারছি না। এই পদ্ধতিতে ক্লাস নেবার উপকরণের অভাবও আমাদের রয়েছে। এখানে আরো কিছু সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে, টিভিতে যে ক্লাস দেখানো হচ্ছে, এই ক্লাস শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণ যেন দেখেন তার জন্য সরকারীভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ফোন করে জানাতে হবে ক্লাস দেখার জন্য। যশোর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সিটিকেবল চ্যানেলে ক্লাস দেখানো হচ্ছে। সেটাও শিক্ষার্থীদের দেখার বাধ্যবাধকতাও নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণও ক্লাস ভিডিও করে ইউটিউব চ্যানেলে দিচ্ছেন। এ সবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়ন হছে সেটাও দেখার বিষয়।
বলা যায়, মন ও মননকে সতেজ রাখার আয়োজন হচ্ছে এই অনলাইন ক্লাস। কেননা শরীরকে শেকল পরাতে পারলেও, মনকে শেকল পরানো এতোটা সহজ নয়। এই পদ্ধতিতে শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের সুস্থ যোগাযোগের মাধ্যমে মনকেও সুস্থ রাখা অনেকটাই সম্ভব। যেকোনো ‘নতুন’ই অ্যাডভেঞ্চার। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ক্লাস উপস্থাপন করতে হবে। নতুন চিন্তা ও কাজের উপাদান রাখতে হবে ক্লাসগুলোর মধ্যে। ডাটা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও মূল্যছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ্য আছে তারা এমবি কেনার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থাও করতে পারেন। এছাড়া অভিভাবকদেরকেও পজিটিভ মনোভাব নিয়ে সন্তানদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। বাড়িতে মায়েরা অনলাইন ক্লাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে দেবেন সন্তানের জন্য। নিরিবিলি রুমের ব্যবস্থা করা, ছোট বাচ্চারা যেন ডিস্টার্ব না করে সেদিকে খেয়াল রাখাও জরুরী।
সমস্যা থাকলে সমাধানও থাকবেই। সমস্ত সমস্যাগুলোকে বুঝে নিয়ে কিভাবে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়, এটাই বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের বিবেচ্য ও করণীয়।

লেখক : সহকারী প্রধান শিক্ষক, ইসলামিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, যশোর।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft