শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২০
মতামত
দুষ্টের দমনের সময় পার হয়ে যাচ্ছে !
মিজানুর রহমান
Published : Wednesday, 29 July, 2020 at 2:00 AM
দুষ্টের দমনের সময় পার হয়ে যাচ্ছে !সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিন এর নির্বাহী সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান এক ফিচারে ভয়ংকর কিছু শব্দচয়ন করেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘কে বাইজি কে ডাক্তার, কে বেশ্যা মক্ষীরাণী না কে রাজনৈতিক নেত্রী? কে চোর বাটপার প্রতারক নাকি ব্যাবসায়ী? কে সতী কে পাপের সম্পদের লোভী, কে আদর্শিক সমাজের নাগরিক কে যৌন বিকৃত সমাজের ব্যক্তিত্বহীন, রুচিহীন সদস্য? কে টিভির অ্যাংকর কে অসৎ নষ্ট? কে দুর্নীতিবাজ সাংবাদিক কে সৎ কমিটেড? কে সুশীল কে চিটার? কে সৎ পাবলিক সার্ভেন্ট কে দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সদস্য? কে ডিসি কে নির্দয় দাম্ভিক ক্ষমতার অপব্যবহারকারী? কে রাজনৈতিক কর্মী কে তদবিরবাজ বা বেশ্যার দালাল? কে সরবরাহকারী কে ভোগকারী? কে শিল্পী কে রক্ষিতা, কে মডেল অভিনেত্রী কে দেহপসারিনী? কে ব্যাবসায়ী কে ব্যাংক ডাকাত অর্থপাচারকারী? কে প্রেমিক প্রেমিকা কে লোভী নির্দয় প্রতারক বিশ্বাসঘাতক? নষ্ট সমাজকে কতিপয় চরিত্রহীন চরম লোভী ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরা এমন করেছে যে আজ চেনা বড় দায়! এ সমাজে বিচরন করতে বড় ভয়! এ সমাজ মেনে নেয়ার নয়! এ দায় বিভিন্ন পেশার ক্ষমতাবান বা দায়িত্বশীলরা এড়াতে পারে না। এই পাপীদের দায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তিকে নিতেই হবে। বের করতে হবে ওদের গডমাদার গডফাদারদের’।
যথার্থই বলেছেন তিনি। আমাদের সমাজে ঘুষ-বাটপারি-দুর্নীতি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। কারণ হলো, দুর্নীতির সংজ্ঞা আমরা নিজেদের মতো করে পাল্টে নিয়েছি। সমাজের প্রতিটি স্তরেই যার যেটুকু ক্ষমতা আছে, সেটি ব্যবহার করেই অন্যায় পথে অর্থ বা সুবিধা অর্জনকে আমরা এখন রীতিমতো ‘অধিকার’ বলে মনে করছি। ছোটবেলায় পড়েছিলাম চুরি করা মহাপাপ কিন্তু আজকাল আর এই মহামূল্যবান কথাটি কেউ বলছেন না। ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ ভুল করেও মানুষ এখন আর এটি মুখে নিতে চাচ্ছেন না। সময় গড়াতে গড়াতে মানুষ আরো সভ্য হয়েছে। এই মহামূল্যবান কথাগুলোর ওপর ধূলি জমতে জমতে আজ সবার মন থেকে তা যেন হারিয়ে গেছে। তা না হলে দুর্যোগেও মানুষ কিভাবে এতটা অমানবিক হলো!
করোনার এই মহাদুর্যোগে স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়ে যা হলো তা রীতিমতো ভীতিকর। মেডিকেল কলেজে ভর্তি জালিয়াতি থেকে শুরু করে ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান বদলি-পদায়ন-স্বাস্থ্য খাতের এমন কোনো দিক নেই যা দুর্নীতিতে জর্জরিত নয়। কেনাকাটায় অনিয়ম-দুর্নীতি, সামান্য কয়েক টাকার পর্দা ও সুঁই-সিরিঞ্জের দাম কয়েক হাজার টাকা করে দেখানো, প্রশিক্ষিত অপারেটর না থাকার পরও দামি যন্ত্রপাতি কিনে ফেলে রেখে মেয়াদোত্তীর্ণ করে ফেলা- কোনো ফাঁকফোকরই বাদ পড়ছে না দুর্নীতির করাল থাবা থেকে। অবস্থা অনেকটা এমন- ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’। এগুলো গোপন কোনো বিষয় নয়, দিনের পর দিন মিডিয়ায় স্বাস্থ্য খাতের নানা দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে এবং হচ্ছে কিন্তু তারপরও পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া তো দূরের কথা, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে বিভিন্ন কমিটির, এমনকি খোদ দুদকের সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি।
রিজেন্ট সাহেদ। কি সুন্দর স্বাস্থ্য। একটু ভাবুন তো। গোলগাল তথাকথিত এই আঁতেলকে কারা সাহায্য করেছিল এই বাটপারি কাজগুলো করার জন্য? সেসব মহারথীদের নাম এখনো সামনে আসেনি। ডা: সাবরিনা। ডাক্তার জাতির কপালে কালিমা এঁকে দিলেন অনায়াসে। এমন অনেক কিছু নিয়ে অনেক ঘটনা হয়তো আছে। সেটা হয়তো আমাদের অজ্ঞাতেই থেকে যাচ্ছে, যাবে।
বাংলাদেশে জেকেজি এবং রিজেন্ট হাসপাতাল কেলেঙ্কারির পটভূমিতে স্বাস্থ্যখাতে যখন একের পর এক দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সরকার টাস্কফোর্স গঠন করে দুর্নীতি দূর করার কথা বলছেন। জানিনা এই ফোর্স কতদূর কি করতে পারবেন! দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীরা বলেছেন, করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় চুনোপুটি কয়েকজনকে ধরা হয়েছে। কিন্তু সংকটের গভীরে গিয়ে প্রভাবশালী স্বার্থন্বেষী মহল বা রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে বদলী ছাড়া এখনও কার্যকর কোন পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি-অনিয়মের গভীরে যাওয়া আসলে কতটা চ্যালেঞ্জের, এবং সিন্ডিকেট বা স্বার্থন্বেষী মহলের প্রভাব থেকে স্বাস্থ্যখাতকে মুক্ত করা কী আদৌ সম্ভব-এই খাতের পর্যবেক্ষকদের অনেকে এসব প্রশ্ন তুলেছেন। স্বার্থন্বেষী মহল বা সিন্ডিকেটের হাত কি সরকারের হাতের চেয়েও লম্বা, এমন আলোচনাও এখন চলছে।
এসব নিয়ে দুদকের নেতৃত্বে স্বাধীনভাবে জনসম্মুখে গণতদন্ত হতে পারে, গণআদালত বসতে পারে। কিন্তু তাতেও জনগণের আস্থা ফেরানোটা এখন বড় কঠিন। দুদকের বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রমে দুর্নীতির ক্ষেত্রে কি ইতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান কদিন আগে ডয়চে ভেলেকে বলেছিলেন, ‘‘একদিনে তো দুর্নীতির এই অবস্থা তৈরি হয়নি। এটা একদিনে যাবেও না। তবে দুদক যে কার্যক্রম চালাচ্ছে তাতে কিছু ইতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। তবে শুধু দুদকের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে সুশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি জরুরি।’’ হয়তো দুদকের সাম্প্রতিক কিছু কার্যক্রম মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। বিশেষ করে সরকার প্রধানের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি এই কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উৎসাহ জোগাচ্ছে। তবে আসল কথা হচ্ছে, দুদকের একার পক্ষে বা একশটা দুদক দিয়েও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ হবে না, যদি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা না যায়।
এক চোর-বাটপাড়ের ওপর দিয়ে সারাদেশের চোর-বাটপাররা পার পেয়ে যাবে এমনটা হতে পারে না। চোর-বাটপাররা যত ক্ষমতাশালী হোক না কেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া ঠিক নয়। অদৃশ্য সুতোর টানটা কতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে সেটা দেখার এখন সময় এসেছে। চোর-বাটপাররা জানে তারা চোর কিন্তু তারা ভাবে অন্যরা তা জানে না। এক ঘুষখোর ঘুষের টাকা গুনতে গিয়ে একটা নকল টাকার নোট পেয়ে খেপে উঠলেন। পাশে বসে থাকা বউকে বললেন, দেশটা চোর-বাটপারে ভরে গেছে। ভালো লোক আর দুনিয়াতে নাই!
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার কৃষক দুর্নীতি করে না, আমার মজদুর দুর্নীতি করে না, দুর্নীতি করে আমাদের শিক্ষিত সমাজ। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতি না হলে দেশের চেহারা পাল্টে যেত। কার আয় কত, কীভাবে চলে- খুঁজে বের করতে হবে। চাটার গোষ্ঠী সব চেটে খেয়ে ফেলে, আমার গরিব মানুষ পায় না। সরকারী আইন করে কোন দিন দুর্নীতিবাজদের দমন করা সম্ভব নয় জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একমাত্র অনুরোধ আপনাদের কাছে সেটা হলো এই। আমি বলেছিলাম প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে, এক নম্বর কাজ হবে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে’। বিখ্যাত সেই উক্তিগুলো এখন খুব মনে হয় বারবার।
দুর্নীতি বাংলাদেশের পুরাতন এক দুর্দমনীয় ভাইরাস। নিম্নবিত্তদের চেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের উচ্চবর্গের লোকগুলোই এর সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। দুর্নীতি যেন মজ্জাগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ভোগবাদী মানসিকতা এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবই এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে বলে মনে হয়। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন সভ্য সমাজের নিয়ম হওয়া উচিত। আমরা নিজেদেরকে সভ্য সমাজের অংশ হিসেবে দাবি করলেও এ সমাজে দুষ্টদের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার মতো দুর্জনের সংখ্যা খুব একটা কম নয়। তাদের দমনে ‘প্লানিং এ্যন্ড এ্যকশন’ এর বাস্তব মিল খুঁজে পাওয়া প্রায়শই দুষ্কর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এ কারণেই অপরাধীরা এ দেশে যা ইচ্ছে তাই করার সুযোগ পাচ্ছে। যাদের স্থান হওয়া উচিত কারাগারের নিভৃত কক্ষে তারা আইনের ফাঁক-ফোকর গলিয়ে অনায়াসে ফিরে আসে লোকালয়ে। এটা কাঙ্ক্ষিত নয়, মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়।
‘আমি যা ভিক্ষা করে আনি সব চাটার গোষ্ঠী খেয়ে ফেলে, আমার গরীব কিছুই পায় না। আপনারা কাজ করেন, ঘুষ খাওয়া বন্ধ করেন’। কথাগুলো ছিল একজন লৌহমানবের আকুতি। সেদিন এই কথাগুলো চাটার গোষ্ঠীর অন্তরে প্রবেশ করেনি, আজও করছেনা। তাই এখনই দুষ্টের দমনে মনোযোগী হয়ে দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতা না দেখালে রাষ্ট্রের তথা সরকারের সব উন্নয়ন হয়তো অরক্ষিত হয়ে পড়বে। চাটার গোষ্ঠী সব চেটেপুটে খেয়ে ফেললে অবাক হবার তখন কিছু থাকবে না।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft