শিরোনাম: করোনায় ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ৩৪, শনাক্ত ২৭৬৬       শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই শতভাগ মানুষ ভাতার সুবিধা পাবেন : এমপি মিলন       কোটচাঁদপুরে পানিতে ডুবে নিখোঁজ দুই মাদ্রাসা ছাত্রের মরদেহ উদ্ধার       কুষ্টিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাংক কর্মকর্তা নিহত       ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনা : ইনু       মামলার ভয়ে আজ জাতির কণ্ঠ রুদ্ধ : বিএনপি       শান্তিরক্ষা মিশনে যোগ দিতে দ. সুদানের পথে ৬৭ নৌ-সেনা       পশ্চিমবঙ্গে একদিনে করোনা শনাক্ত ২৯৯৭, মৃত্যু ৫৬       মণিরামপুরে নিরাপদ সবজি জোনে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন       লাইবেরিয়ানের আটক ট্যাংকারকে মুক্তি দিল ইরান      
সাংবাদিক ফখরে আলমের জন্য ভালবাসা
আহ্সান উল্লাহ্
Published : Friday, 3 July, 2020 at 11:09 PM
সাংবাদিক ফখরে আলমের জন্য ভালবাসাবেশ কিছু বছর আগের ঘটনা। ঘটনাটা বিশেষ কিছু নয়। কিন্তু সামান্য ঘটনাটার মধ্য দিয়ে ফখরে আলমের সঙ্গে আমার একটি আত্মিক এবং আন্তরিক সম্পর্কে গড়ে ওঠে। আমি তাকে পছন্দ করতে শুরু করি এবং আকস্মিক মৃত্যু আমাদের এই বন্ধুত্বের উপর যবনিকা টেনে দেয়। আমি একজন ন্যায়নিষ্ঠ সাংবাদিক ও ভাল মানুষ বন্ধুকে হারালাম। এ নস্বর পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী নয়। এটা চিরন্তন সত্য। বিশ্বমাপের মহৎজনেরা যখন চলে যান তখন সারা পৃথিবীর মানুষ তাদের জন্য চোখের পানি ফেলে। পৃথিবী বড় মাপের মানুষদের হারিয়ে রিক্ত হয়। কিন্তু আমাদের মত মানুষেরা যখন কাছের একজন সত্যনিষ্ঠ, ন্যায়নিষ্ঠ, পররোপকারী ভাল মানুষকে হারাই তখন সে দুঃখ হৃদয়ে বড় বাজে, হৃদয়কে বিদীর্ণ করে, ভারাক্রান্ত করে। ফখরে আলমের মৃত্যুতে আমি সত্যকার একজন বন্ধুকে হারিয়েছি।
বেশকিছু বছর আগের ঘটনা। হঠাৎ একটি ফোন পেলাম। ফোনের ওপার থেকে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন আমার একটি তথ্য প্রয়োজন। আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন?
বলুন কি তথ্য। আমার সাধ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই আমি সাহায্য করব। আমি সাংবাদিক, আমার পেশাই হচ্ছে অপরকে সাহায্য করা।
তিনি বললেন, আমি সাংবাদিক-লেখক নিমাই ভট্টাচার্যের উপর একটি লেখা তৈরি করছি। তথ্যটা নিমাই ভট্টাচার্য সম্পর্কে।
তথ্যটা কি বিষয়ে?
এক সময় নিমাই ভট্টাচার্যের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তার প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল ‘অমৃত’ পত্রিকায়। আমি এখন দ্বিধায় পড়েছি। কলকাতায় ‘অমৃত বাজার’ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা আছে সেটা সবাই জানে কিন্তু শুধু অমৃত নামে কোন পত্রিকা আছে কিনা আপনি জানেন কী?
ফখরে আলম সাহেবের সঙ্গে আমার কখনো দেখা-সাক্ষাৎ পরিচয় হয়নি। তার নাম প্রায়শই বিভিন্ন পত্রিকায় দেখি। প্রায়শই তার অনুসন্ধানী রিপোর্ট পত্রিকায় ছাপা হয়। কিছু কিছু রিপোর্ট আমি পড়েছি। ভাল লেগেছে। সহকর্মীদের কাছে আমি ঐসব রিপোর্টের প্রশংসাও করেছি। কিন্তু তিনি আমাকে চিনলেন কিভাবে এবং আমার ফোন নম্বরই পেলেন কোথায়? আমি সারা জীবনই ডেস্কের লোক। তার উপর ইনট্রোভার্ট চরিত্রের লোক। ফলে আমাকে তেমন কেউ চেনে না জানে না। আর আমি লোকজনের সঙ্গে মিশতেও পারি না।
এসব কথাগুলো ও প্রশ্ন আমার মনে উদয় হলেও আমি কিছু না বলে সরাসরি তাকে বললাম, হ্যাঁ, ‘অমৃত’ নামে কলকাতায় একটি সমায়িকী আছে বা ছিল। আপনি নির্দ্বিধায় ‘অমৃত’ নামের উল্লেখ করতে পারেন।
এখানেই আমাদের কথা শেষ। আমি তখনই একটি আলমারি খুলে একেবারে নিচের তাকে রক্ষিত ভারতীয় ম্যাগাজিনগুলোর কয়েকখানা বের করলাম। আমার সৌভাগ্য দু’চারখানা বের করতেই অমৃতের কয়েকটা সংখ্যা পেয়ে গেলাম। এগুলোর মধ্যে দেখলাম নিমাই ভট্টাচার্যের একটা গল্প ছাপা হয়েছে।
আমি ফখরে আলম সাহেবকে তখনই ফোন করে বিষয়টা জানালাম। শুনে উনি খুশী হলেন। উনি আরো বললেন, কালের কণ্ঠের যশোর ব্যুরো অফিসটা এম এম আলী রোডে। তসবির মহল সিনেমা হলের সামনে। যশোর আসলে আমার অফিসে আসবেন। খুশী হব।
একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করতে হয়Ñ নিমাই ভট্টাচার্য, ফখরে আলম এবং আমি তিনজনই যশোরের লোক এবং সাংবাদিক। নিমাই ভট্টাচার্যের প্রচুর উপন্যাস, সাংবাদিকতা, রাজনীতি নিয়ে লেখা বইয়ের সংখ্যা এক শ’র উপর। তার জার্নালিস্টের জার্নাল আমার সংগ্রহে আছে এবং কয়েকবার পড়েছি বইটা। সাংবাদিকতা সম্পর্কিত কত তথ্য যে বইখানার মধ্যে আছে তা বইখানা যারা পড়েছেন তারা সেটা জানেন। তার আরো কিছু বই আমার সংগ্রহে আছে। যাযাবরের দৃষ্টিপাত, পথের পাঁচালী এবং এ ধরনের আরো কিছু বই আছে যাÑ বার বার পড়েও আস মেটে না। জার্নালিস্টের জার্নাল বিভিন্ন তথ্যে ঠাসা। বার বার পড়তে ভালই লাগে।
নিমাই ভট্টাচার্য আমার আত্মার আত্মীয়। তার সম্পর্কে প্রচুর তথ্য আমার জানা। কারণ নিমাই বাবুর বাড়ি মাগুরার শরুশুনা গ্রামে। শরুশুনা আমার মামা বাড়ি। ‘৭১-এ শহীদ এবং দৈনিক ইত্তেফাকের প্রখ্যাত বার্তা ও পরে নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেন আমার মামা। এই গ্রামে আমার জন্ম। আর ছোটবেলা কেটেছে শরুশুনায়। নিমাই বাবুদের বাড়ি চিহ্ন পর্যন্ত এখন আর নেই সেসব জায়গা ও তাদের পরিত্যক্ত ভিটা আমার চেনা। এছাড়া নিমাই বাবু এবং আমি যশোর শহরের সম্মিলনী স্কুলের ছাত্র। ১৯১৪ সালে সম্মিলনী ইন্সটিটিউশনের ১২৫তম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে আমরা পাশাপাশি বসে কিছু ছবিও উঠিয়েছিলাম।
তবে বার্ধক্য ও কিছুটা অসুস্থতার কারণে তেমন কথা বলতে পারে না নিমাই বাবু।
নিমাই বাবু সম্পর্কে এত কথা মনে আসছে যে তা বলতে গেলে নিবন্ধের মূল বিষয়টাই হারিয়ে যাবে।
প্রতি বছরই শীতকালে যশোর যাই। যদিও এখন আমি ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা তবুও নিজ জেলার প্রতি সবারই কিছুটা টান থাকে। সেবার যশোর গিয়ে ফখরে আলম সাহেবকে রাতে ফোন করে জানালাম, কাল সকালে আপনার অফিসে দেখা করতে যাব। অফিসে থাকবেন তো?
হ্যাঁ আসুন ১১টার দিকে।
যথাসময়ে ফখরে আলম সাহেবের কালের কণ্ঠের অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলাম।
তিনি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। চা-নাস্তার সাথে অনেক গল্পগুজোব হল। আমরা দু’জনেই যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের ছাত্র ছিলাম। তবে আমরা দু’জন দুই স্কুলের ছাত্র ছিলাম। তার বাড়ি চাঁচড়ায়। আর আমার বাড়ি ছিল খড়কি। তবে বহুকাল আগে পাকিস্তানি আমলে যশোরের বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে ঢাকা চলে আসি।
যশোরের সেকাল একাল নিয়েও অনেক গল্প হল। আসার সময় তার লেখা কয়েকখানা বই প্রেজেন্ট করলেন আমাকে। এগুলোর মধ্যে ছিল হাতের মুঠোয় সাংবাদিকতা, পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিবেদন, রিপোর্টারের ডায়েরি।
তার আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ হলাম। এছাড়া আমরা অনেকটা ‘লাইক মাইন্ডেড’। তবে ফখরে আলম সাহেব মূলত রিপোর্টিংয়ের লোক। সংবাদ সংগ্রহ করতে সর্বত্র ছুটে বেড়ান। এ ব্যাপারে তিনি বেশ দক্ষ। কোথায় কোন্ সংবাদ ঘাপটি মেরে আছে তা বের করে আনতে তার ক্লান্তি নেই। সাংবাদিকতার ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের কথাটা তার মধ্যে ভালই ছিলÑ হি কুড স্মেল দ্য র‌্যাট ইজিলি। মেধাবী রিপোর্টারদের এই গুণটা থাকে।
এম এম কলেজের ম্যাগাজিনে ছাপার জন্য আমি একটি স্মৃতিচরণমূলক লেখা তৈরি করেছিলাম। লেখাটার বিষয়বস্তু সেই ১৯৬০-’৬১ সালের আমার আই এ পড়ার সময়কার। সেই সময়কার কলেজের পরিবেশ, শিক্ষকমণ্ডলী, অনেক কিছুর সাথে বর্তমান এম এম কলেজের পরিবেশ পরিস্থিতির বহু পরিবর্তন ঘটে গেছে। তখন কলেজ ছিল পুরাতন কসবায়। এখন কলেজ স্থানান্তরিত হয়েছে খড়কীতে। বড় বড় ভবন নির্মিত হয়েছে। নতুন কলেজে নিবন্ধটা দিতে গিয়ে দেখলাম একটি হস্টেল ভবনের সামনে বিরাট সাইনবোর্ড অধ্যাপিকা হামিদা রহমান মহিলা হল। অধ্যাপিকা হামিদা রহমানকে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালভাবে চিনতাম। কলেজের অধ্যক্ষের রুমে বসে আমি উপস্থিত অধ্যাপক ও অন্যান্য যারা ছিলেন তাদের সঙ্গে হামিদা রহমান সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে দেখলাম কেউই তার সম্পর্কে খুব বেশিকিছু জানেন না। সেখানে তখন উপস্থিত ছিলেন ভাইস প্রিন্সিপাল নমিতা বিশ্বাস। তিনি যশোর শহরের বাসিন্দা এবং তিনি এম এম কলেজের ছাত্রী ছিলেন। তিনি ১৯৭৫-’৭৬ সালে এম এম কলেজে পড়াশুনা করেন। আমি তার থেকে ১৪/১৫ বছর আগে এম এম কলেজ থেকে আইএ পাশ করে ঢাকা চলে আসি।
আমি নমিতা বিশ্বাসকে বললাম, এম এম কলেজের মহিলা হল যার নামে সেই হামিদা রহমানকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম। তার একখানি বইয়ের নাম ‘জীবনস্মৃতি’। বইটি আপনাদের কলেজে নেই এবং আপনারা কেউই বইটি সম্পর্কে অবহিত নন। তিনি যশোরে ‘৫২-র ভাষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনের খুঁটিনাটি সব ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা আছে তার ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থে। বইটি কলেজ লাইব্রেরিতে থাকা উচিত। কিন্তু এ বই আপনারা কোথাও পাবেন না। আমি অনেক বছর আগে একটি পুরানো বইয়ের দোকান থেকে ‘জীবনস্মৃতি’ সংগ্রহ করি। ফটোকপি করে আমি কলেজকে একটা কপি দেব।
পরের বছর ২০১৬ সালে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ভাইস প্রিন্সিপ্যাল নমিতা বিশ্বাসকে ঢাকা থেকে জানালাম দু’এক দিনের মধ্যে অধ্যাপিকা হামিদা রহমানের জীবনস্মৃতি বইটা দেয়ার জন্য কলেজে আসছি। যশোরে গিয়ে ১৯ ডিসেম্বর সকালে ফখরে আলমের কালের কণ্ঠ অফিসে পৌঁছে তাকে বইটা দেখালাম। তিনি বইটা মনোযোগ দিয়ে দেখে অফিস পিয়নকে একটি ফটোকপির দোকান থেকে বইটার একটি কপি করে আনতে বললেন। আমি তাকে বললাম আপনি যাবেন আমার সাথে কলেজে?
তিনি বললেন, আগামীকাল খুলনায় একটি অনুষ্ঠানে আমাকে অতিথি হিসেবে থাকার অনুরোধ রয়েছে। কাজেই আমিতো কাল খুলনায় থাকব।
সেখানে তার সঙ্গে কিছু গল্পগুজোব করে আমি আমার পুলেরহাটের আস্তনায় ফিরে গেলাম।   চলবে.....




« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft