শিরোনাম: ধর্ম যার যার, উৎসব সবার        নাভারণে সড়ক দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহত       স্ত্রীকে নিয়ে পূজা দেখতে এসে যুবক ছুরিকাহত       গ্রামীণফোনের কলড্রপে গ্রাহকরা অতিষ্ঠ       কনে যাচ্চি আমরা ?       জবাবদিহিতায় আসছে ৩ হাজার সার ব্যবসায়ী       যশোরে ইজিবাইক ছিনতাই ঘটনায় একজন আটক       জেলা মহিলা আ’লীগ নেতৃবৃন্দের বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে শ্রদ্ধা নিবেদন       যশোরে গাঁজা বিক্রির সময় কারবারী আটক       যশোরে গাঁজা বিক্রির সময় কারবারী আটক      
নৌ বাহিনীর দুঃসাহসিক এক সিন্দাবাদ হারিয়ে গেছে চিরতরে
অধ্যাপক মোঃ মসিউল আযম
Published : Tuesday, 1 September, 2020 at 12:06 AM, Update: 01.09.2020 12:10:06 AM
নৌ বাহিনীর দুঃসাহসিক এক সিন্দাবাদ হারিয়ে গেছে চিরতরেবাংলাদেশ নৌ বাহিনী ও আমাদের কাছে গত ৪ আগষ্ট ছিল একটি শোকের দিন, বিষাদের দিন, স্বজন হারানোর দিন। সেদিন নৌবাহিনী পরিবার হারিয়েছে দুঃসাহসিক, মেধাবী, চৌকস এক তরুন অফিসার। আর আমরা যশোরবাসী হারিয়েছি এক গর্বিত সন্তানকে।
    আজিজুল হাকিম তূর্য (২৭) আমাদের বংশের গর্ব। আত্মীয় স্বজন, গ্রাম-এলাকাবাসীর কাছে ছিল অতি প্রিয় একটি নাম, পরিচিত মুখ। যশোর জেলার সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের ও মা আনোয়ারা খাতুনের একমাত্র পুত্র সন্তান।
    ১৯৯৩ সালের ১৯ নভেম্বর তার জন্ম। তারা দুই ভাই বোন। বড় বোনের বিয়ের পর স্বামীর ঘর সংসার করছে। গত ৭ বছর আগে তারা তাদের মাকে হারিয়েছে।
    ২০১৫-১৭ সালে সে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমী (বি.এম.এ)  ৭৫তম ৩ বছর মেয়াদী কোর্সে প্রশিক্ষণ শেষে লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করে। ইতোমধ্যে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারত, শ্রীলঙ্কা ও লেবানন প্রভৃতি দেশে সফর করে। আগামী ডিসেম্বর মাসেই লেফটেন্যান্ট কমান্ডার পদে পদোন্নতি ও জানুয়ারী মাসে চীনে যাওয়ার কথা ছিলো।
    ৪ আগষ্ট সকাল ৮টা। হঠাৎ আমার চাচা আবু তাহেরের বাড়ি হতে হৈ চৈ আর কান্নার রোল শুনতে পাই। দ্রুত ছুটে যাই সেখানে। তূর্যের নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজের সি.ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার তানভীর তার বাবাকে জানান “আজিজ কি আপনার একমাত্র ছেলে?” সে অসুস্থ। তার অফিসিয়াল নাম আজিজুল হাকিম। “আজিজ” নামেই অফিস ও জাহাজের সহকর্মীদের কাছে পরিচিত। আপনি আন্টিকে নিয়ে চলে আসুন। চাচা আবু তাহের তার নোট বুক (মোবাইল নম্বর লেখা) আমাকে দিয়ে বলেন এই নম্বরে আপনি কমান্ডারের সাথে কথা বলেন। তিনি আমাকে একই কথা জানান, আপনাদের কারো আসতেই হবে। তখনই আমি ধরে নিলাম তূর্য আর নেই।
    ঐ দিন রাতেই যশোর হতে তার ভগ্নিপতি এ্যাড. পারভেজ বিমান যোগে চট্টগ্রামে পৌছান এবং তিনি পরিবারের পক্ষে লাশটি গ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম থেকে রাতেই লাশ বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স ও আরেকটি মাইক্রোবাসে নৌবাহিনীর সদস্যরা সেটি স্কুল ধরে পরদিন ৫ আগষ্ট সকাল ১১.৩০ মিঃ লাশটি বাড়িতে নিয়ে আসেন। এ্যাম্বুলেন্সটি থামা ও খাটিয়াটি নামার পর সেখানে সৃষ্টি হয় মর্মান্তিক এক বেদনা বিধুর হৃদয়বিদারক পরিবেশ। বুক ফাঁটা কান্না। সারাগ্রাম জুড়ে তখনই কান্নার রোল আহাজারী।    ৫ আগষ্ট জোহরবাদ চুড়ামনকাটি হাইস্কুল মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। খুলনা নৌবাহিনীর পক্ষে একদল সদস্য ও এলাকার সর্বস্তরের মানুষ জানাযায় অংশ নেন। গ্রামের পারিবারিক গোরস্থানে নৌবাহিনী গার্ড অব অনার শেষে রাষ্ট্রিয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় তাকে।
    এর দু’দিন পর ৭ আগষ্ট শুক্রবার গ্রামের মসজিদে তার রুহের মাগফেরাত কামনায় এক দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। একই দিনে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও সকল মসজিদেও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন। উক্ত মাহফিলে নৌ বাহিনীর আঞ্চলিক কমান্ডারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন লেঃ ইমরান। তিনি মসজিদে মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে নৌ অফিসার তূর্যের উপর সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, আমাদের নৌ বাহিনীর ৮০ জন অফিসারের তিনি ছিলেন অন্যতম। একজন খুবই মেধাবী অফিসার। আগামী ৫০ বছরেও এমন সুদক্ষ অফিসার আর জন্মাবে না নৌবাহিনীতে। তার এই অকাল মৃত্যু শুধু নৌ বাহিনী একজন অফিসারকে হারাননি। দেশ ও জাতি হারিয়েছে এক অমূল্য সম্পদ। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে শুধু নৌ বাহিনী নয় সরকারের ব্যয় করতে হয়েছে অনেক অর্থ।
    তূর্যের দুঃসাহসিকতার এক চমকপ্রদ কাহিনী চট্টগ্রাম নৌবাহিনীর কাছে একটি ইতিহাস হয়ে আছে। তাদের যুদ্ধ জাহাজ ‘শাহজালাল’ চট্টগ্রাম থেকে ৭’শ নটিক্যাল গভীর সমুদ্রে অবস্থান করছিল। জাহাজে কর্মরত নৌবাহিনী সদস্যদের হঠাৎ বমি উপসর্গ দেখা দেয়। এর ফলে অনেকেই হয়ে পড়েন খুবই অসুস্থ। ঐ সংকটকালে তূর্যের সাহসিক নেতৃত্বে জাহাজটি চালনা করে নৌ ঘাটিতে ফিরিয়ে আনে। নৌবাহিনীতে বিরোচিত ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ে। আবু তাহের বেশ কয়েকবার চট্টগ্রামে মেরিন একাডেমী আয়োজিত অভিভাবক দিবসে যোগদান করেছেন। নৌবাহিনী তুর্যের সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য সম্মাননা প্রদান করেছে। এসবই এখন সকলের কাছে দুঃসহ বেদনা আর স্মৃতি। তার সাহসিকতা, কর্মনিষ্ঠা ও বিনম্র আচরণের জন্য সে তার জাহাজের কমান্ডার তানভীরের খুবই সুনজরে পড়ে। এজন্য তাকে তিনি খুবই স্নেহ করতেন। এক সুদর্শন চেহারার অধিকারী ছিল সে। চলনে বলনে খুবই ভদ্র বিনয়ী ও অমায়িক মার্জিত ব্যবহার তার ছিল।
         তুর্যের বিচরণ ছিল সাগরের মাঝে যুদ্ধ জাহাজে। হঠাৎ এক সামুদ্রিক ঝড় এসে ভেঙে দিয়ে গেছে যেমন যুদ্ধ জাহাজ “শাহজালালের” একটি মাস্তুল। এই সাথে দপ করে নিভে গেছে আমাদের বংশের গৌরব, এক উজ্জল বাতি। তাহেরের পরিবারের সব স্বপ্ন ভেঙে হয়ে গেছে খান খান চিরতরে। নেমে এসেছে অমানিশার ঘোর অন্ধকার।
    
     

অধ্যাপক মোঃ মসিউল আযম
প্রবীন সাংবাদিক, কলাম লেখক ও উন্নয়ন কর্মী
মোবাঃ ০১৭১১-১১৬৩৭২
 




« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft