http://www.gramerkagoj.com/

আর্কাইভ

আসাদ বেহেস্তী
বাজেট করতে পাশ
সংসদ বসছে,
এই নিয়ে কেউ কেউ
অংকটা কসছে!
অংকের মারপ্যাচে
পিষে যত যন্ত্র,
বাঁচবার মন্ত্রটা
যপে গণতন্ত্র!

স্বেচ্ছাগৃহবন্দি সুরঞ্জিত!
    A+ A A-

স্বেচ্ছাগৃহবন্দি সুরঞ্জিত!

কাগজ ডেস্ক : রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছাড়ার পর স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। নাতি শুভজিৎ সেনগুপ্তকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি পত্রিকা পড়ে আর টেলিভিশন দেখে দিন কাটছে তার।

গত ৯ এপ্রিল রাতে বিজিবি সদর দপ্তরে অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্ট তুমুল সমালোচনার মুখে গত ১৬ এপ্রিল পদত্যাগের পর সরকার সুরঞ্জিতকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রীর দায়িত্বে রাখলেও গত ২০ দিনেও ঘর থেকে বের হতে দেখা যায়নি তাকে।

দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনে দিন-রাত সমান করে মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো এই রাজনীতিকের এমন স্বেচ্ছা নির্বাসন নজিরবিহীনই বটে।

এমনকি গণমাধ্যমকেও এডিয়ে চলছেন দফতরবিহীন এ মন্ত্রী। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যে ক’জন সাংবাদিকের সঙ্গে সুরঞ্জিতের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক আছে তাদের অনেকের ফোনকল এখন আর রিসিভ করছেন না অভিজ্ঞ এই পার্লামেন্টারিয়ান।

রেল মন্ত্রণালয়ের পদ থেকে অবসর নেওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই তার বাসার সামনে কমবেশি গণমাধ্যম কর্মীদের আনাগোনা দেখা গেছে। কিন্তু সুরঞ্জিত কোনো গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গেই কথা বলেননি, এখনো বলছেন না। বাসার গেটে গেলেই নিরাপত্তাকর্মীরা বলছেন, ``স্যারের নিষেধ।`` বাসায় যাওয়ার অনুমতি মিলছে কেবল তার নির্বাচনী এলাকার কয়েকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার।

১৬ এপ্রিল রেলভবনে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতির ঘোষণা দিয়ে ৪৬/৩ ঝিগাতলার নিজ বাসায় ফেরেন অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক। দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হওয়ার খবরটিও তিনি বাসায় বসেই ‍জানতে পারেন।

সে দিন থেকে ৫ মে শনিবার পর্যন্ত বাসা থেকে একবারের জন্যও কেউ বের হতে দেখেনি তাকে। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কামরুল হকও বাসা থেকে তার বের না হওয়ার বিষয়টি  নিশ্চিত করেন। 

কামরুল বলেন, ``বর্তমানে বাসায় তার দেড়বছরের একমাত্র নাতি শুভজিৎ সেনগুপ্তের সঙ্গে বেশির ভাগ সময় কাটছে। নিজের মতো করেই সময় কাটাচ্ছেন তিনি।``

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রেল মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে বাসা থেকে বের হতে দেখেননি তারা।

রেল মন্ত্রীর পদ থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর ঢাকার সাবেক সংসদ সদস্য হাজী সেলিম ও সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান ছাড়া দলের কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা উল্লেখযোগ্য কাউকেও সুরঞ্জিতের বাসায় যেতে দেখা যায়নি।

উল্লেখ্য, ১৬ এপ্রিল রেলমন্ত্রণালয়ের পদ থেকে ‘অব্যাহতি’র ঘোষণা দিয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করে তিনি আবার রাজনীতিতে ফিরে আসবেন। এর আগ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো সংবাদমাধ্যমে কথা বলবেন না। কারণ এতে তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র মাস পাঁচেকের মধ্যেই অব্যাহতি নেন তিনি।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সুরঞ্জিত সাতবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বাম রাজনীতির মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের ভিপি প্রার্থীও হয়েছিলেন। ’৬৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) পিকিং ও মস্কো ধারায় দুই টুকরো হলে মাওলানা ভাসানীকে ত্যাগ করে সুরঞ্জিত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশে যোগ দেন। ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বাইরে ন্যাপ থেকে জয়ী হয়ে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দেন তিনি। পরে ন্যাপের ভাঙনে সৈয়দ আলতাফের একতা পার্টি ও দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদক ও বাম রাজনীতিক আহমেদুল কবিরের সঙ্গে গণতন্ত্রী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

`৮৬ ও `৯১- এর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।

পঞ্চম সংসদের সদস্য থাকাকালেই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে প্রথমে ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং পরে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য হন।

`৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলেও সুরঞ্জিত তার নির্বাচনী এলাকায় ভোটে হেরে যান। তবে প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পরে হবিগঞ্জের আসনে উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হন।

ওয়ান-ইলেভেনর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংস্কার তৎপরতা শুরু হলে ‘সংস্কারপন্থি’ হয়ে ওঠেন সুরঞ্জিত। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যপদও হারান অভিজ্ঞ এ নেতা।

২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সুরঞ্জিতকে আইন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রেসিডেন্ট ও সংবিধান সংশোধন কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

গত বছরের ২৮ নভেম্বর রেলমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন সুরঞ্জিত। শপথ নেওয়ার পর দুর্নীতির কালো বিড়াল খুঁজে বের করার ঘোষণা দেন তিনি। কিন্তু পাঁচ মাস যেতে না যেতেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া সুরঞ্জিত নাটকীয়ভাবে রেল মন্ত্রণালয়ের অর্থ কেলেংকারিতে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগের সত্যাসত্য যাই থাক দায় মাথায় নিয়ে ১৬ এপ্রিল মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে নজির গড়েন।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেল মন্ত্রণালয় থেকে অব্যাহতি চেয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নাটকীয়ভাবে দফতরবিহীন মন্ত্রী করা হয় তাকে। সরকারি তথ্য বিবরণীতে ১৭ এপ্রিল জানানো হয়, ``প্রধানমন্ত্রী রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ সালের (৩) এর ৪ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে ওই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদানপূর্বক দফতরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেছেন।``

সুরঞ্জিতের এ পতনকে নক্ষত্রের পতনও বলেছেন কেউ কেউ। কেউ বা বলেছেন-``সুযোগের অভাবে তিনি সৎ ছিলেন।`` বিতর্ক যা-ই হোক সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে ৯ এপ্রিল আসলে কি হয়েছিল। সে পর্যন্ত কি স্বেচ্ছা-নির্বাসনেই থাকবেন সুরঞ্জিত?