

আসাদ বেহেস্তী
নিম্নের চাপ শেষে
লঘুচাপ আসছে,
তার চাপে কৃষকের
ফসলটা ভাসছে।
ভেসে যায় ঘর-বাড়ি
ভেসে যায় সম্বল,
রিলিফেতে মেলে রুটি
আর দু’টো কম্বল!
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : সিডর ও আইলা পরবতী সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নে সুপেয় পানির সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। পিএসএফ নষ্ট হয়ে যাওয়া, ভুগর্ভস্ত পানিতে অধিক পরিমাণে লবণাক্ততা ও আর্সেনিক থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জীবন বাঁচাতে কপোতাক্ষ পার হয়ে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার বিভিন্ন সংরক্ষিত পুকুর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া রাস্তা সংস্কার ও প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ না দেয়ায় গ্রামবাসীর দুর্ভোগের শেষ নেই।
কপোতক্ষ ও খোলপেটুয়া নদী বেষ্টিত আনুলিয়া ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের আয়তন ৩৮ দশমিক ৮২ বর্গ কিলোমিটার। ২০০১ সালে আদমশুমারী অনুযায়ী এ ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৩১৯ জন। বর্তমানে লোক সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। এখানে সরকারি প্রাথমিক বিদধ্যালয় ও রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১০টি। এছাড়া এখানে রয়েছে তিনটি হাইস্কুল ও পাঁচটি মাদ্রাসা।
অনিলিয়া ইউনয়ন পরিষদের সদস্য বিছট গ্রামের আঞ্জুয়ারা বেগম জানান, এ ইউনিয়নে রয়েছে ২৪টি গ্রাম। এসব গ্রামের মধ্যে দক্ষিণ একশরার নাংলা গ্রামে একটি মাত্র গভীর নলকূপ বসানো সম্ভব হয়েছে। যেখান থেকে ইউনয়নের বড় অংশের মানুষ পানি সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া ইউনিয়নের কাকবসিয়া গ্রামের গাজীবাড়ির পুকুরসহ কয়েকটি পুকুর থেকে অপরিষ্কার পানি ছাকনির মাধ্যমে কলসি ভর্তি করে গৃহস্থলি ও খাবার কাজে ব্যবহার করা হয়। টিউবওয়েলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা ও আর্সেনিকের ফলে তা ব্যবহার করা যায় না। এ ছাড়া সুপেয় পানির চাহিদা পূরণে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পিএসএফ (পণ্ড স্যাণ্ড ফিল্টার) বসানো হলেও আইলা পরবর্তীতে সবগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে।
মনিপুর গ্রামের স্কুল ছাত্রী রোকেয়া খাতুন, ভোলানাথপুর গ্রামের রজব আলী ও ঘাসটিয়া গ্রামের আবু বক্কর জানান, এলাকায় কোন সংরক্ষিত পুকুর ও গভীর নলকূপ না থাকায় খাবার পানি নিয়ে তাদেরকে সকল সময় আশঙ্কার মধ্যে থাকতে হয়। এক একটি পরিবারের জন্য দিনে কমপক্ষে দু’কলস পানির দরকার হয়। এ পানি সংগ্রহ করতে তাদেরকে বাগালী-মনিপুরের খেয়া পার হয়ে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ পাড়ের কয়েকটি গ্রামের সংরক্ষিত পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। সংগ্রহ করার পর ওই পানি হ্যালোজেন ট্যাবলেট বা ফিটকারি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে খাবার উপযোগী করতে হয়। সকালে পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে স্কুলে গেলে শিক্ষকদের বকুনি খেতে হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্কুল যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অনেকক্ষেত্রে এক ড্রাম পানি পাঁচ থেকে ১০ টাকায় কিনতে হয়।
ইউপি সদস্য আঞ্জুয়ারা বেগম, কাকবশিয়া গ্রামের শাহরবানু বেগম, পারুল বেগমসহ কয়েকজন জানান, গাজীবাড়ির পুকুর থেকে তারা কয়েক বছর ধরে ছাকনির মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করে জীবাণুমুক্ত করার পর ব্যবহার করে আসছেন। টিউবওয়েলের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা, আর্সেনিক ও পিএসএফ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাজী বাড়ির পুকুরের পানি তাদের খাবার ও গৃহস্থলির ব্যবহারের জন্য একমাত্র ভরসা। নিরুপায় হয়ে এ পানি পান করায় শিশুসহ তাদের বছরের অধিকাংশ সময় পেটের পীড়া ও চর্মরোগে আক্রান্ত হতে হয়।
৮নং ইউপি সদস্য নুরুজ্জামান গাজী জানান, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার পর থেকে একশরা-পাইকপাড়া এলাকার একমাত্র স্লুইচ গেটটি অকেজো হয়ে পড়ে আছে। বর্ষার পানি ওই গেট দিয়ে কপোতাক্ষ নদে পড়তে পারে না পারায় জলাবদ্ধতার কারণে গত তিনবছর পাঁচ হাজার বিঘা জমিতে কোন ফসল উৎপাদন হয়নি। এছাড়া জোয়ারের পানি বিলে না ঢোকাতে না পারায় ওই স্লুইচগেট সংলগ্ন খালটি এখন মৃতপ্রায়। ফলে ওই এলাকায় চিংড়ি চাষ করাও সম্ভব হয়নি। তিনি ওই এলাকার কৃষকদের জন্য স্লইচ গেটটি অবিলম্বে সংস্কারের দাবি জানান।
আনুলিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর আলম লিটন জানান, পানিতে লবণাক্ততার কারণে এক সময়কার কৃষি নির্ভর এ ইউনিয়নের লোকজন চিংড়ি চাষ নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে বেকারত্মের সংখ্যা বেড়েছে। তাছাড় প্রতিনিয়ত দুর্যোগকে মাথায় রেখেই অনেকে পেশা পরিবর্তণ করে শহরমুখী হয়েছে। দুর্যোগ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আপদকালীন সহায়তা হিসেবে ইউনিয়নে একটি সাইক্লোন সেন্টার তৈরির কাজ অব্যাহত রয়েছে। বিধবাভাতা, বার্ধক্যভাতাসহ বিভিন্ন খাতে পাওয়া সরকারি সাহায্য পর্যাপ্ত না হওয়ায় অভাবী মানুষের চাহিদা পূরণে সফল হওয়া যায় না। ব্লকের মাধ্যমে বাঁধ সংস্কার জরুরী উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সময় মনিপুর ও বিছট গ্রামের নদীবাঁধে যেভাবে ভাঙন দেখা দিয়েছে বর্ষা শুরুর আগেই তা ইউনিয়নবাসির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি ইউনিয়নের ভিতরের কাঁচা রাস্তা পাকাকরণ, প্রতিটি বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎসংযোগ প্রদানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

