

আসাদ বেহেস্তী
নিম্নের চাপ শেষে
লঘুচাপ আসছে,
তার চাপে কৃষকের
ফসলটা ভাসছে।
ভেসে যায় ঘর-বাড়ি
ভেসে যায় সম্বল,
রিলিফেতে মেলে রুটি
আর দু’টো কম্বল!
কাগজ ডেস্ক : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্ব তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গতকাল মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপি নেতা আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম ৯ মে বুধবার পর্যন্ত মুলতবি করেনছে।
গত ২৬ এপ্রিল আলীমের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, লুটপাট, অপহরণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৮টি ঘটনা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করে অভিযোগ (চার্জ) গঠনের আবেদন পেশ করেছে প্রসিকিউশন। জামিন আবেদনের ওপর আদেশের পর অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আসামীপক্ষ তাদের বক্তব্য উপস্থাপন শুরু করে।
এর আগে অভিযোগ গঠন বিষয়ে প্রসিকিউটর রানাদাস গুপ্ত আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জে দাখিলকৃত ঘটনা ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রার্থনা জানিয়ে আবেদন পেশ করেন।
প্রসিকিউটর রানাদাস গুপ্ত বলেন, আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে ২৮টি ঘটনায় অনেক অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধকালে নিরীহ মানুষ, রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত নির্যাতন এবং পাক বাহিনীর সহযোগীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের উপর নির্যাতন চালান।
গতকাল সোমবার আসামী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা থেকে আব্দুল আলীমকে অব্যাহতি প্রদান চেয়ে (ডিসচার্জ পিটিশন) একটি আবেদন দাখিল করে শুনানি করেন। পরবর্তী ধার্য তারিখে আসামী পক্ষ বিষয়টির উপর আইনগত যুক্তি উপস্থাপন করবে বলে সাংবাদিকদের জানায়।
আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত অভিযোগসমূহের মধ্যে রয়েছেÑ জয়পুরহাটের ছাত্রনেতা ফজলুর রহমানকে অপহরণ, আটক ও নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। ডা. আবুল কাশেমকে হত্যার অভিযোগ। জয়পুরহাট চিনিকলে নিয়ে ২৩ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউটর বলেন, জয়পুরহাটের কড়াইকাদিপুর এলাকায় একাত্তরের ২৬ এপ্রিল গণহত্যার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এতে বলা হয়, ওইদিন আলীমের সহযোগিতায় পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীরা নাম জানা ৩৮ জন ও নাম না জানা ৩৩২ জনকে হত্যা করে। জয়পুরহাটের পাহনান্দা গণহত্যার অভিযোগ সম্পর্কে বলা হয়, আলীমের সহযোগিতায় বাহারউদ্দিনসহ নাম জানা ৮ জন এবং নাম না জানা ১৪ জনকে হত্যা করা হয়। জয়পুরহাটের কোকতারা, ঘোড়াপা, বাগজানা, কুটহাড়ায় লুটপাট অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ১৯ জনকে হত্যা করা হয়।
প্রসিকিউটর বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় মে মাসে জয়পুরহাটের পাহনান্দা মিশন স্কুলে আলীমের সহযোগিতায় ৬ জন সনাতন ধর্মাবলম্বীকে হত্যা করা হয়। বাদশাহ গ্রাম, রেলওয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুম, কোকতারা পুকুর পাড়ে সমিরউদ্দিন মন্ডলসহ ১০ জনকে আটক করে ৯ জনকে হত্যা করা হয়। একাত্তরের ১২ মে দোগাছি, চকরকত, পেচুলিয়াসহ আশপাশের গ্রামে হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটসহ ৬ জনকে হত্যা করা হয়। নওদা গ্রামের ইলিয়াস উদ্দিন সর্দারসহ ৪ জনকে অপহরণ করে আটক ও হত্যা করা হয়।
রানা দাশগুপ্ত বলেন, জয়পুরহাট সরকারি কলেজে মুক্তিযুদ্ধের সময় আলীমের সহযোগিতায় ২৬ জন যুবককে হত্যা করা হয়। তিনি বলেন, আলীমের সহযোগিতায় একাত্তরের ১৮ জুলাই পাঁচবিবির পূর্ব রামচন্দ্রপুর এলাকার সাফিয়া, হাফিজা ও আম্বিয়াকে পাক-বাহিনীর হাতে ধর্ষণের উদ্দেশ্যে তুলে দেয়া হয়।
প্রসিকিউটর আরো বলেন, আব্দুল আলীম ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রসূত প্ররোচণামুলক বক্তব্য দিয়ে জয়পুরহাটের ক্ষেতলালের হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় অগ্নিসংযোগ ও গণহত্যা সংঘটিত করেন। জয়পুরহাটের পশ্চিম আমট্টতে আলীমের নেতৃত্বে গণহত্যা চালানো হয়। এসময় খোকন পাইকার, আশরাফুলসহ ১৫ জনকে হত্যা করা হয়। পাহনান্দা মিশন স্কুলে আলীমের সহযোগিতায় নিরস্ত্র বাঙালিদের ধরে এনে নির্যাতন করা হতো। নারীদের ধর্ষণের উদ্দেশ্যে পাক-বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হতো।
গত ২৭ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল আব্দুল আলীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয়। একইসঙ্গে তার জামিন বিষয়ে নতুন করে আবেদন করতে বলা হয়।
গত ১৬ এপ্রিল প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনটি মামলা ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জমান, আব্দুল কাদের মোল্লা এবং আব্দুল আলীমের মামলা।
গত ১৫ মার্চ আলীমের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে তার বিরুদ্ধে ৭ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৮ টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুণ্ঠন ও আগুন ধরিয়ে দেয়সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আলীমের বিরুদ্ধে তিন হাজার ৯০৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্তকারী সংস্থা।
গত ৩মে আসামীর আবেদনের উপর শুনানির শেষে তাকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন মঞ্জুর করে ট্রাইব্যুনাল-২। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ২৭ মার্চ জয়পুরহাটের বাড়ি থেকে আলীমকে গ্রেফতার করা হয়। ৩১ মার্চ তাকে ১ লাখ টাকার মুচলেকা এবং ছেলে ফয়সাল আলীম ও আইনজীবী তাজুল ইসলামের জিম্মায় শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দেয় ট্রাইব্যুনাল। পরে কয়েক দফা এই জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম বলেন, কয়েকটি শর্তে আলীমের জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। এর আগেও এ সব শর্তে তাকে জামিন দেয়া হয়েছিল। শর্তের মধ্যে রয়েছে,আলীমের পাসপোর্ট জমা থাকবে ট্রাইব্যুনালের নিবন্ধকের কাছে। তার ছেলে ফয়সাল আলীমের বনানীর বাসায় তাকে থাকতে হবে। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়া ঠিকানা বা অবস্থান পরিবর্তন করা যাবে না। গণমাধ্যমে কোনো ধরনের বক্তব্যও দিতে পারবেন না আলীম। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাক্ষী, একাত্তরে নির্যাতিত কেউ, ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবার, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে, ফোনে বা ব্যক্তির মাধ্যমে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা যাবে না। ট্রাইব্যুনালের অনুমতি ছাড়া জয়পুরহাটে যাওয়া যাবে না। আলীমের আইনজীবী তাজুল ইসলাম ও তার ছেলে ফয়সাল আলীমের জিম্মায় ১ লাখ টাকার বন্ডে এ জামিন মঞ্জুর করা হয়। জামিন সংক্রান্ত শর্তের অঙ্গীকারনামা আইনজীবী তাজুল ইসলাম ও আসামী আব্দুল আলীমকে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন।

