

আসাদ বেহেস্তী
মানুষ মারার রাজনীতিতে
নেইতো কোনো দর্শন,
কিংবা গাড়ি ভাঙ্গা এবং
গুলি-বোমা বর্ষণ।
তবু যারা মানুষ মারে
চলে মহান নীতিতে,
তাদের দলে আমিতো নেই
কোনো রকম প্রীতিতে!

মোঃ আককাস আলী :
নওগাঁর জেলা সংলগ্ন বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার শহর দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে জংশন। এই শহরের বিভিন্ন এলাকায় পতিত অবস্থায় রয়েছে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ রেল ভূমি ও শত শত পরিত্যক্ত বাসা। এসব পতিত জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে একাধিক বিশাল বিশাল বস্তি। আর এসব বস্তি ও পরিত্যক্ত বাসাতে থাকা বাসিন্দাদের অধিকাংশই জড়িত নানা ধরণের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে। বিশেষ করে ভারতীয় চোরাইপণ্য আনা-নেয়া, ফেন্সিডিল, হেরোইন, নেশার ইনজেকশন, ইয়াবা, গাঁজাসহ নানা মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। এসব বাসিন্দাদের ৯০ ভাগই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে বস্তিতে আস্তানা গড়ে তুলেছে। আর এই সমস্ত বস্তির বাসিন্দারা নানা ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সার্র্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, জনপ্রতিনিধি এবং এলাকার প্রভাবশালী সমাজপতিরা। ফলে এরা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে তোয়াক্কা করেনা। বরং প্রতিবাদকারীরাই নানা ভাবে হয়রানীর শিকার হচ্ছে। সান্তাহার রেলওয়ে জংশনে সবচেয়ে বড় বস্তি হচ্ছে পৌর এলাকার ৫নং ওয়ার্ডের ইয়ার্ড কলোনী বা কথিত বসুন্ধরা বস্তি। এই বস্তির বাসিন্দা আব্দুল হামিদ খাঁন ও তার স্ত্রী মুন্নি বেগম। ভারতীয় চোরাইপণ্যে ও হেরোইন, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক ব্যবসা করে কয়লা কুড়ানি থেকে বর্তমানে কোটিপতি। সা¤প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে মাদক সেবন ও বেচাকেনা সচিত্র সংবাদ প্রকাশ হবার পর হেরোইন ব্যবসায়ী মুন্নি বেগমকে কয়েক পুড়িয়া গাঁজা দিয়ে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে ভ্রাম্যমান আদালত তাকে ২ মাস কারাদন্ড দিলেও থেমে নেই হেরোইন ব্যবসা। এলাকবাসীর অভিযোগে জানা গেছে, মুন্নি বেগমের অবর্তমানে তার হেরোইন আসক্ত স্বামী আব্দুল হামিদ খাঁন, তার শলিকা চুন্নি (শাম্মী আকতার), রায়হান, আকতার, শামিম, টোথলা ভুট্টু সহ অনেকের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে অবাধে। বস্তিটিতে হেরোইন ছাড়াও হাত বাড়লেই মিলে আরেক মরন নেশা ফেন্সিডিল। ওই বস্তির বাসিন্দা কথিত চোর প্রেন এর স্ত্রী শাহিদা বেগম, আনছার আলীর স্ত্রী তাসলি বেগম, মকছেদের স্ত্রী লাইলী বেগম, শুটুর স্ত্রী পারভীন বেগম, জুয়েলের স্ত্রী ঝর্ণা, কালামের স্ত্রী–, নজরুলের ছেলে মমিন, ভোলার ছেলে জনি, রায়হানের ছেলে জুম্মুন, মাষ্টারের ছেলে হাসান, শহিদ, মোহাম্মদ আলী, রওশন কশাইয়ের ভাই রমজান, সাঁতাহার এলাকার সুমুন, আব্দুর রশিদের ছেলে পাপন, জাহাঙ্গীর ও পাপ্পু সহ অর্ধশত নারী-পুরুষ ফেন্সিডিল ববসার সাথে জড়িত বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। এদের মধ্যে বড় ব্যবসায়ী হচ্ছে শহিদা ও তাসলি বেগম। জানা গেছে, শাহিদা প্রতি দিন পাইকারি ও খুচরা মিলে বিক্রি করে ৫শ বোতল। আর তাসলি বিক্রি করে প্রায় ৩ শত বোতল ফেন্সিডিল। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহিদা ও তাসলি খুচরা ফেন্সিডিল বিক্রি করার পাশাপাশি নওগাঁর নজিপুর সহ বিভিন্ন উপজেলায় পাইকারী ব্যবসায়ীদের নিকট বিপুল পরিমাণে ফেন্সিডিল বিক্রি করে থাকে। অন্যরা ৩০ থেকে ১ শ বোতল ফেন্সিডিল বেচা-কেনা করে প্রতিদন। নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একাধিক বস্তিবাসী জানান, শাহিদা ও তাসলি তাদের ব্যবসা অবাধে চালানোর জন্য পুলিশকে প্রতিদিন টাকা দিয়ে থাকে। অন্যান্যদেরকেও প্রতিদিন পুলিশকে চাঁদা দিতে হয়। এসব ফেন্সিডিল বিরামপুর, হিলি, বাগজানা, আটাপাড়া, চেঁচড়া ও পাঁচবিবি সীমান্ত দিয়ে মালবাহী ওয়াগন ট্রেন ও মালবাহী ট্রেনের পাশাপাশি বাস-মাইক্রোবাস পথে সান্তাহার নিয়ে আসা হয়। জানা গেছে, কাঁচের বোতল ভারি হবার কারনে এখন একই সাইজ রংয়ের প্লাষ্টিক বোতলে ভরে উৎপাদনকারীরা বাজারে ছেড়েছে ফেন্সিডিল। ফলে এখন একসঙ্গে অনেক বোতল ফেন্সিডিল বহন করা সহজ হয়েছে। এছাড়া গাঁজা ব্যবসার নিয়ন্ত্রক ইয়ার্ড কলোনীর জাহাঙ্গীর এবং শহরের মালগুদাম বস্তির এলাকার রুনু, সুলতান দম্পত্তি। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর ও রুনু খুচরা ও পাইকারী মিলে পতিদিন ১ মণেরও বেশি গাঁজা ও ১ হাজার পুড়িয়া হেরোইন বিক্রি করে থাকে। পুলিশ এদের মাঝে মধ্যে গ্রেফতার করলেও তারা আইনের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে বের হয়ে এসে আবার পূর্বের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে মাদক ব্যবহারকারীরা ও ব্যবসায়ীদের অপরাধের পরিধি শহরের সীমানা ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকের মরণ নেশায় আক্রান্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে গ্রামের সাধারণ যুবসমাজ। কুন্দগ্রাম ইউনিয়ন পরিষরে চেয়ারম্যান শামিমুল হুদা বলেন, তার ইউনিয়ন বর্তমানে মাদকে ছেয়ে গেছে। মাদকের আক্রান্ত হয়ে শতাধিক পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, তার এলাকায় সমস্ত মাদক সান্তাহার শহর কে আসে। সান্তাহার শহরের মাষ্টার পাড়ার বাসিন্দা ঠিকাদার নিসরুল হামিদ বলেন, শহরে যে ভাবে মাদকের বিস্তার ঘটছে তা বন্ধ না হলে যুব সমাজ ধবংস হয়ে যাবে। তিনি মাদক বিক্রি ও সেবন বন্ধে সরকারের উচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। সান্তাহার শহীদ আহশানুল হক ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আসাদুল হক বেলাল দুঃখ করে বলেন, আমাদের চোখের সামনে মাদকের মরন নেশায় আক্রান্ত হয়ে অনেক ছেলে মারা যাচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার। বাড়ছে চুরি, ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধ। সান্তাহার নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মোসলেম উদ্দিন বলেন, শহরে এতগুলো মানুষ এব্যাপারে কিছুই করতে পারছেনা। তিনি বলেন, পুলিশ সহ অন্যান্য বাহিনী এ সব বন্ধে যদি কিছু না করে তাহলে সামজিক আন্দোলন করে আমরা মাদকের বিস্তার রোধ করবো। সান্তাহারের মাদকের সেবন ও বেচা-কেনার বিষয়ে আদমদীঘি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন, মাদক সেবন ও বিক্রি রোধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি মাদক বিক্রেতা মুন্নি বেগম সহ আরো অনেক মাদক ব্যাবসায়ী ও সেবনকারীদের আটক করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে আর্থিক জরিমানা ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

