


আসাদ বেহেস্তী
আকাশ জুড়ে প্রতিদিনই
জমছে কালো মেঘ,
উঠছে বাতাস, বইছে হাওয়া
ঝড়ের মতোন বেগ!
কিন্তু বাতাস প্রতিদিনই
যাচ্ছে অন্য দিকে,
আসছেনাতো বৃষ্টি এখন
মেঘটা হচ্ছে ফিকে !
আমিরুল ইসলাম রন্টু : বেগম খালেদা জিয়া ৩০ জানুয়ারি ঢাকার গণমিছিল পূর্ব সমাবেশে দাবি করলেন, গণঅভ্যুত্থানেই বর্তমান সরকারের পতন ঘটানো হবে। শ্বাস নেওয়ার সময় থাকতে ক্ষমতা ছাড়ুন-ইত্যাদি। সম্প্রতি গণতন্ত্র হত্যা দিবসের আলোচনা সভাতেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর একই ধারায় বললেন, সেনা অভ্যুত্থানে নয়, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানো হবে। তারা আগাম ঘোষণা দিয়েছিলেন, ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই এ সরকারের পতন ঘটবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সা¤প্রতিক কতিপয় বিভ্রান্ত সেনা কর্মকর্তার সেনা-অভ্যুত্থান প্রয়াস সে দাবিরই প্রতিফলন। শুধু তাই নয়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় বছরের মাথায় তারা সরকার পতনের ডাক দিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশ, হরতাল, লংমার্চ, রোড মার্চ ইত্যাদি নানা কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকার পতনকে অমোঘ করতে লাগাতার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী ১২ মার্চ ‘চলো চলো, ঢাকা চলো’ কর্মসূচিকে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তারা সরকার পতনের টার্গেট ধরে ঢাকা অবরোধের আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা সেসব পত্রিকায় পড়ছি। এ আন্দোলন হয়তো ক্ষতিকর হতো না- নিয়মতান্ত্রিকই হতে পারতো, যদি আন্দোলনের গায়ে সরকার পতনের ‘তকমা’ লাগিয়ে দেয়া না হতো। কিন্তু কেন এ অনভিপ্রেত অভিলাষ? কেন সেনা-অভূত্থান কিম্বা গণ-অভ্যূত্থানে সরকার পতনের আকাঙ্খা? তাদের এ ক্ষতিকর অপপ্রয়াসের মূলে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়া, না যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অর্থাৎ দন্ড ঠেকানো? কেন তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের জন্য অপেক্ষা করতে পারছেন না? কেন তারা এক বছর যেতে না যেতে মধ্যবর্ত্তী নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা ছাড়তে বললেন, এখন আবার গণঅভ্যূত্থানে ক্ষমতা দখলের পায়তারা শুরু করেছেন? গণতন্ত্রের নামে অস্থিশীলতা ও অশান্তি তৈরীর লক্ষ্যে তারা নানা পদের হঠকারিতা চালিয়ে নিচ্ছেন। সরকার পতনের নামে লাগাতার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাচ্ছেন। সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবার পর তারা একমুখে সেনা অভ্যূত্থানকে অনভিপ্রেত বলছেন, একই সময়ে তারা ভিন্ন মুখে গণঅভ্যূত্থানকে স্বাগত জানাচ্ছেন। আমাদের প্রশ্ন সেনা অভ্যত্থান ও গণঅভ্যূত্থানের মধ্যে পার্থক্য কি? উভয় পদক্ষেপেরই লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্ছেদ ও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। এক পক্ষকে ক্ষমতা হতে উচ্ছেদ করে আর এক পক্ষকে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করা। সেনা অভ্যূত্থানেও যেমন গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটাতে পারে, তেমনি গণঅভ্যূত্থানেও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটতে পারে। কোন কোন সময় ব্যর্থও হয়। এযাত্রা যেমন বাংলাদেশে সেনা অভ্যূত্থান ব্যর্থ হলো। ব্যর্থ হলেও ব্যর্থতার খেসারত বেশুমার। ফলে, উভয় অভ্যূত্থান বিপজ্জনক। এটা তখনই অতিমাত্রিক বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন তা নিদারুন হিংস্র ও হঠকারী হয়ে ওঠে। দেশে বিদেশে এর অগণন উদাহরণ আছে। অকারণে অসময়ে যখন তখন উভয় উভ্যূত্থানের হিংস্র থাবা অবশ্যই পরিতাজ্য।
অবশ্য আমরা একথা বলবো না যে, বর্তমান সরকারের কোন দুর্বলতা কিম্বা ব্যর্থতা নেই। সরকারের দুর্বলতা বা ব্যর্থতার পক্ষেই সাফাই গেয়ে যাবো, তা হয় না। সরকারের দুর্বলতা ও ব্যর্থতার বিপক্ষে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন অবশ্যই হতে পারে। রাষ্ট্র পরিচালনার দুর্বলতা কিম্বা ব্যর্থতার বিপক্ষে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন, আর সরকার-পতন বা সরকার উচ্ছেদ-আন্দোলন এক নয়। ইস্যুভিত্তিক গণতান্ত্রিক পথে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সরকারের নানা দুর্বালতা বা ব্যর্থতার বিপক্ষে অবশ্যই প্রতিরোধ তৈরিতে সহায়ক হয়, সরকার-প্রশাসন যথাযথ সঠিক পথে চলতে দিক্-নির্দ্দেশনা পায়। তাতে দেশ ও মানুষের মঙ্গল হয়। কিন্তু সরকার পতনের নামে হঠকারিতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টিতে শুধু উদ্যোগ তৈরি হয় না- দেশ বিপজ্জনক পথে অগ্রসর হয়। ৪ দলীয় জোটের হঠকারী আন্দোলন দেশের মানুষের জন্য তাই কোন মঙ্গল আনছে না, বরং নানা দূর্বিপাক তৈরী করে যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্যের সীমাহীন ঊর্দ্ধগতি, পুঁজি বাজারে ধ্বস সৃষ্টিতে এই সব ইস্যুবিহীন আন্দোলন নেতীবাচক প্রভাব ফেলে চলেছে, যা দেশবাসীর কাছে বোঝার উপর শাঁকের আঁটি সমতুল্য। নেতীবাচক প্রভাব পড়ছে, উন্নয়ন-প্রবৃদ্ধি-অগ্রগতিতে, অবকাঠামোগত উন্নয়নে, বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগেও। পক্ষান্তরে, বর্তমানে কৃষি, শিক্ষা, বিদ্যুৎ প্রভৃতি সেক্টরে যে উন্নতি সূচিত হয়েছে, বিরোধী দলের বিরোধীতার মাঝেও সরকারের এই সাফল্যের স্বীকৃতি থাকার আবশ্যকতা ছিলো। কিন্তু তাতো হচ্ছেই না, বরং সাফল্য গুলিও ব্যর্থতার পাঁকে গুলিয়ে দেয়া হচেছ। বিরোধী দল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারায় যে গুণগত পরিবর্তন চাচ্ছে, তার মধ্যে সাফল্যের স্বীকৃতি দানের আবশ্যকতা কিম্বা উর্ধ্বে তুলে ধরার দায়বদ্ধতা ছিলো ষোলআনা, নইলে দাবিটি হয়ে পড়বে নেহায়েত গালভরা বুলি কিম্বা রাত কী বাত।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের জন্য বিরোধীদলের সর্বাগ্রে প্রয়োজন সংসদে যোগদান। সংসদের ভিতর ও বাইরে লাগাতার আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করার এখনি সময়। সময় বহিয়া যায়। এখনি রাজনীতিকে যুগপত জবাবদিহীতামূলক করার শুভ উদ্ভোধন ঘটাবার সুবর্ণ সময়- যার কোন বিকল্প নেই। সংসদের ভিতর ও বাইরের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারায় তাদের লাগাতার যুক্ত থাকতে হবে, এ সরকারের মেয়াদকালের শেষ দিন পর্যন্ত। এভাবেই তাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনমতকে পক্ষভুক্ত করে ক্ষমতায় যাওয়ার উপযোগী করতে হবে। নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ হলো কিনা তার গ্যারান্টি অর্জন আজ সময়ের দাবি। এতে সরকারের আন্তরিকতার দিকটি উজ্জীবিত হলো কি-না, তার নিশ্চয়তা বিধানও নিশ্চিত করতে হবে। সরকার তত্ত্বাবধায়ক (অগণতান্ত্রিক) হলো, না নির্বাচিত (গণতান্ত্রিক) হলো, তা বড় কথা নয়। বিএনপির গণতান্ত্রিক আমলে ‘মাগুরা-শালিখা’ উপনির্বাচনে দেশবাসী নিদারুন অভিজ্ঞতা লব্ধ হয়েছে। আবার অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ১ কোটি ৩৩ লাখ ভূয়াভোটার সম্বলিত ২২ জানুয়ারীর (২০০৮) অনুষ্ঠিতব্য আজিজ মার্কা নির্বাচন-প্রস্তুতিও প্রত্যক্ষ করেছে দেশের মানুষ, যার অমোষ পরিণতি-ওয়ান ইলেভেনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্যাকেজে এদেশে এসেছিলো। যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুধু সংবিধান লঙ্ঘন করে ৩ মাসের ক্ষমতাকে অবৈধভাবে দু বছর প্রলম্বিত করেনি, বৃহৎ দু দলের শীর্ষ নেতাদের জেল হাজতে পোরেনি, তাদের ওপর নানা পদের মামলা দিয়েছে- বিদেশে যেতে বাধ্য করেছে। যার ধারাবাহিকতায় বেগম জিয়ার দু ছেলে অদ্যাবধি দেশে ফিরতে পারেননি, সেই তত্ত্বাধায়ক সরকার নিয়ে বেগম জিয়া কেন এতো পাগলপারা হবেন? এমন আরও অনেক উদাহরণ টানা যাবে। ফলে, সরকার তত্ত্বাধায়ক হলেই হবে না। দেখতে হবে সরকারের কমিটমেন্ট বা সদিচ্ছা। ফলে তাই আবারও বলছি, গণঅভ্যূত্থানে ক্ষমতা হতে শেখ হাসিনার মহাজোট সরকারকে সরিয়ে দেবার কেন এই অন্যায়, অনার্য্য ও অনভিপ্রেত অভিলাষ? বরং সকল প্রশ্নে তারা সরকারকে সহায়তা করলে আগামীতে তাদেরও সহায়তা পাবার পথ প্রশস্ত হতো। যদিও এই চেতনা বোধ গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক পরিশীলিত ধারা, যার উদ্বোধন ঘটানোর কোন বিকল্প নেই। এ জন্য উভয় দলকে নমনীয় হতে হবে-বসতে হবে- সমঝোতায় আসতে হবে। এখনি সময়।
লেখক : আমিরুল ইসলাম রন্টু, যশোর
রাজনীতিক ও কলামিষ্ট।
