মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর, ২০২০
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোরে মামলা জট
এক বিচারকের ঘাড়ে ৯ হাজার মামলা!
শিমুল ভূইয়া :
Published : Saturday, 13 July, 2019 at 6:54 AM

এক বিচারকের ঘাড়ে ৯ হাজার মামলা!যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারক সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, একজন বিচারকের ঘাড়ে বর্তমানে ৯ হাজার মামলার বোঝা। সরকার দেশের প্রতিটি জেলা আদালতে মামলা জট কমাতে নানা উদ্যোগ নিলেও যশোরে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং নিষ্পত্তির তুলনায় প্রতিনিয়ত বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। মামলা জট নিরসনে যে চারটি আদালতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কথা এ চার আদালতের তিনটিতেই দীর্ঘদিন ধরে বিচারক নেই। ফলে, চার বিচারকের কাজ করছেন মাত্র একজন। বিচারকশূন্য এ তিন আদালতে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ মামলা রয়েছে, বিচারক না থাকায় এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম চরম আকারে ব্যহত হচ্ছে। এসব আদালতে   বিচার কাজ ‘পরবর্তী তারিখ’ নির্ধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এতে করে মামলা জট বাড়ার সাথে সাথে হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিচার প্রার্থীরা। এ সমস্যা নিরসনে আইনজীবী সমিতির চিঠি চালাচালি, আইনজীবী সংগঠনগুলোর একের পর এক মানববন্ধন এবং সমাবেশ করেও প্রতিকার মিলছেনা।
গত বছরের ১৯ এপ্রিল অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক মিজানুর রহমান ও  অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারক মুরাদ এ মাওলা সোহেল একইসাথে বদলি হন। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ এর চারটি আদালতের দু’টিই বিচারক শূন্য হয়ে পড়ে। এ সময় এ দু’টি আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্ব পান অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ চতুর্থ আদালতের মোহাম্মদ সামছুল হক। চার মাস এভাবে চলার পর ওই বছরের ২৮ আগস্ট অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ চতুর্থ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ সামছুল হকও বদলি হয়ে যান পিরোজপুরে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ এ তিনটি আদালতই বিচারক শূন্য হয়ে পড়ে। এ তিন আদালতের দায়িত্ব পান অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের তৎকালীন বিচারক নাজির আহম্মেদ। এক পর্যায়ে ওই বছরের ৬ নভেম্বর সাত মাস বিচারক শূন্য থাকা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতে যোগদান করেন আয়েশা নাসরিন। কিন্তু কয়েকদিনের মাথায় অর্থাৎ চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক নাজির আহম্মেদের বদলিতে হতাশ হয়ে পড়ে সাধারণ আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা। এরপর থেকে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক আয়েশা নাসরিনের কাঁধে আসে এ গুরুত্বপূর্ণ চার আদালতের ভার।  সেই থেকে এভাবেই চলছে। এ কারণে ভোগান্তির শেষ থাকছে না বিচারপ্রার্থী ও তাদের স্বজনদের।
প্রতিদিন বিচারকশূন্য আদালতের পেশকাররা মামলার নথি নিয়ে ভারপ্রাপ্ত বিচারকের টেবিলে যাচ্ছেন আর তারিখ পরিবর্তন করে আনছেন। বিচারপ্রার্থীদের এটি চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার থাকছে না। বিচারক না থাকার কারণে বিচারপ্রার্থীরা একদিকে যেমন তাদের ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
গত কয়েকদিনের পর্যবেক্ষণকালে কথা হয় কয়েকজন বিচারপ্রার্থী ও তাদের স্বজনদের সাথে। সকলেই ক্ষোভ ও কষ্টের সাথে এ বিষয়টি নিয়ে জরুরিভাবে সমাধানের জন্যে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন বিচারকশূন্য আদালতের মধ্যে নাজুক অবস্থায় আছে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতটি। এখানে এক বছর তিনমাস ধরে কোনো বিচারক আসেননি। বর্তমানে এ আদালতে মামলার স্তুপ হয়ে রয়েছে। মে মাসের ২৭শ’১ টি মামলা নিয়ে জুন মাস শুরু হয়। এ মাসে এ আদালতে আরো ৩৮ টি মামলা গৃহীত হয়েছে । ২৭শ’৩৯ টি মামলার মধ্যে মাত্র আটটি মামলা গত জুন মাসে নিষ্পত্তি হয়। এ আদালতে বর্তমানে দায়রা মামলা ১৫শ’১৬ টি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৮শ’১৪ টি, এসিড মামলা একটি, ফৌজদারী আপিল ২শ’১৯ টি, সন্ত্রাস মামলা দু’টি, রিভিশন মামলা ১শ’৭৭ টি, বিবিধ একটি ও এসিড সি আর আর একটিসহ সর্বমোট ২৭শ’ ৩১ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।  গত বছরের অক্টোবরে এ আদালতে  বিচারাধীন  ছিল ২৩শ’৩০ টি মামলা। অর্থাৎ গত আট মাসে এ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৪শ’ ১টি। এ আদালতে বিচারাধীন উল্লেখযোগ্য মামলাগুলোর মধ্যে একটি রয়েছে চৌগাছার সিংঘঝুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান মিন্টু হত্যা মামলা। যার এস.সি নং ৫০৮/১৫।  এ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ২০০৭ সালের মণিরামপুর কলেজ ছাত্র শামীম হত্যা মামলাটি। যার এস.সি নং ৫৩১/১০।
এছাড়া, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ৪র্থ আদালতে গত ২৮ আগস্ট অতিরিক্ত বিচারক মোহাম্মদ সামছুল হক বদলির পর থেকে অর্থাৎ এগারো মাস ধরে বিচারক শূন্য হয়ে আছে। এ আদালতে গত মে মাসের ২৫শ’২৫ টি মামলা নিয়ে শুরু হয় জুন মাস। এ মাসে এই আদালতে ১৯ টি মামলা গৃহীত হয়। ২৫শ’৪৪ টি মামলার মধ্যে জুন মাসে মাত্র একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এ আদালতে বর্তমানে দায়রা মামলা ১৩শ’১০ টি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৭শ’৮৫ টি, ফৌজদারী আপিল ২শ’৬২ টি, ফৌজদারী রিভিশন মামলা ১শ’৮৪ টি ও ১ টি সন্ত্রাস মামলা সহ সর্বমোট ২৫শ’ ৪৩ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।  গত বছরের অক্টেবরে এ আদালতে ২২শ’৫১ টি মামলা বিচারাধীন  ছিল। অর্থাৎ এ আট মাসে এ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে  ২শ’৯২ টি ।
এ আদালতে উল্লেখযোগ্য মামলার মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালের ইছালী ইউনিয়নের কহিনুর হত্যা মামলা। যার এস সি নং ৩৬৫/১৫। অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতে এ বছরের  ৩০ এপ্রিল  বিচারক নাজির আহম্মেদের বদলির পর অর্থাৎ তিন মাস ধরে বিচারক শূন্য হয়ে পড়ে আছে। এ আদালতে গত মে মাসের  ২২শ’১১ টি মামলা নিয়ে জুন মাস শুরু হয়। এ মাসে এ আদালতে ৩৩ টি মামলা গৃহীত হয়। ২২শ’৪৪ টি মামলার মধ্যে জুন মাসে এ আদালতেও মাত্র  একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়। এ আদালতে বর্তমানে দায়রা মামলা ১২শ’ টি, বিশেষ ট্রাইবুনাল ৭শ’৬২ টি, ফরেন এক্স ১ টি, ফৌজদারী আপিল ১শ’৪৮ টি, ফৌজদারী রিভিশন মামলা ১শ’২০ টি, ৪ টি সন্ত্রাস মামলা ও ৭টি এসিড মামলাসহ সর্বমোট ২২শ’ ৪৩ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।  গত বছরের অক্টোবরে এ আদালতে ১৯শ’ ১৭ টি মামলা ছিল। যা আট মাসে বেড়েছে ৩শ’২৬ টিতে। এ আদালতে উল্লেখযোগ্য মামলার মধ্যে বেনাপোলের যুবলীগ কর্মী তোজাম্মেল হত্যা মামলা রয়েছে। যার সেশন মামলা নং-১০৪২। অর্থাৎ বিচারক শুন্য থাকা এ তিনটি আদালতে বর্তমানে ৭ হাজার ১৭ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। গত মাসে এ তিন আদালতে মাত্র ১১ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এ মামলাগুলো বিচারিক কার্যক্রম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ  দ্বিতীয় আদালতের উপর ন্যস্ত রয়েছে। এছাড়া ২য় আদালতেও বর্তমানে ২৮শ’১৬ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেক্ষেত্রে যশোরের গুরুত্বপূর্ণ এ চার আদালতে বিচারাধীন ৯ হাজার ৮শ’৩৩ টি মামলা রয়েছে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ ২য় আদালতের বিচারক আয়েশা নাসরিনের ঘাড়ে।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, যশোর চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারিক কার্যক্রমের জন্যে জেলা জজ আদালতে মামলা বদলির সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় পেন্ডিং থেকে যাচ্ছে অসংখ্য মামলা। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে যশোর জজ আদালতে ৬শ’৭৬ টি, মে মাসে ৬শ’৮৩ টি ও জুন মাসে ৫শ’ ২১ টি  মামলা সর্বমোট এ তিনমাসে ১৮শ’৮০টি মামলা রিসিভ হয়ে বর্তমানে ১৭ হাজার ৯শ’ ৭৬ টি মামলা পেন্ডিং রয়েছে।  জেলা জজ আদালত  থেকে এসব পেন্ডিং মামলার অধিকাংশই অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজের চারটি আদালতে বদলি করা হয়।  কিন্তু এসব আদালতে বিচারক না থাকায় মামলা জট বেড়েই যাচ্ছে। এ মুহূর্তে বিচারক সঙ্কটের সমাধান না হলে ভবিষ্যতে যশোর আদালতে বিচারাধীন মামলার অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারনা। এ বিষয়ে যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পি.পি রফিকুল ইসলাম গ্রামের কাগজকে বলেন, এ বিষয় নিয়ে তারা জেলা জজ, ডিসিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন। জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে বিষয়টি।  তিনি আরো বলেন, পুরানো মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এত লম্বা সময় ধরে বিচারক শূন্যতায় আদালতে দিন দিন মামলার জট বাড়ছে। তবে, তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, খুব শীঘ্রই এ সমস্যার সমাধান হবে।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft