বুধবার, ১৮ মে, ২০২২
জাতীয়
অগ্নিঝরা মার্চ
মোহাম্মদ হাকিম :
Published : Friday, 13 March, 2020 at 6:57 AM
অগ্নিঝরা মার্চ        ১৩ মার্চ, ১৯৭১। অনিবার্য হয়ে ওঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। লাখো মুক্তিকামী বাঙালির উত্তাল আন্দোলন-সংগ্রাম ও সশস্ত্র প্রস্তুতিতে শঙ্কিত হয়ে পড়েন পাকিস্তানী সামরিক জান্তারা। বিরোধী দলের নেতারা পাকিস্তানের অনিবার্য ভাঙ্গন নিশ্চিত বুঝতে পেরে একাত্তরের এদিন জরুরি বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠক শেষে অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। কিন্তু সেদিকে তোয়াক্কা না করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম দমনে নিষ্ঠুর পরিকল্পনা নিতে থাকে হানাদাররা।
একাত্তরের মার্চ মাসে যত দিন গড়াচ্ছিল, স্বাধীনতাকামী বাঙালির ঐক্য ততই সুদৃঢ় হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুর উদাত্ত আহ্বানে তখনকার চলমান অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়, প্রত্যয়দৃঢ় একাত্মতা ঘোষণা করছিল স্বাধীনতাকামী বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠন। পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের আকাক্সক্ষায় আন্দোলন-সংগ্রামে মুখর জনপদ। প্রতিটি গৃহে ও ভবনের শীর্ষে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা আর কালো পতাকা। অবিরাম চলছে সভা-শোকসভা। অসহযোগ আন্দোলনের এক সপ্তাহ পর দেশ পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, লেখক, শিক্ষকসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানী সামরিক শাসকরা বাংলার দামাল ছেলেদের এ আন্দোলন দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ে।
আজ সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষ ১৫নং সামরিক আইন জারি করে ১৫ মার্চ সকাল ১০টার মধ্যে প্রতিরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীদের কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়। নির্দেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজে যোগদানে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের চাকরিচ্যুত ও পলাতক ঘোষণা করে সামরিক আদালতে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদ- দেয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়।
এ নির্দেশ জারির কড়া সমালোচনা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, সামরিক কর্তৃপক্ষের আজ এ সত্যটি উপলব্ধি করা উচিত, জনগণ আজ তাদের ইস্পাতকঠিন সংকল্পে ঐক্যবদ্ধ। সামরিক সরকারের এ ধরনের ভীতি প্রদর্শনের মুখে তারা কিছুতেই নতি স্বীকার করবে না। এদিকে সকালে রমনা পার্কে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে জনসভা এবং শীতলক্ষ্যায় অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের উদ্যোগে দীর্ঘ নৌ মিছিল বের করা হয়। চট্টগ্রামে বেগম উমরতুল ফজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মহিলাদের এক সমাবেশে বাংলাদেশের জনগণের পরিপূর্ণ মুক্তি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত বিলাসদ্রব্য বর্জন ও কালোব্যাজ ধারণের জন্য নারী-পুরুষ সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।     
বিশিষ্ট শিল্পী জয়নুল আবেদিন ও সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল হাকিম পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত খেতাব ও পদক বর্জন করেন। ঢাকার জাতিসংঘ ও পশ্চিম জার্মান দূতাবাসের কর্মচারী ও এদের পরিবারবর্গসহ ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ২৬৫ জন নাগরিক বিশেষ বিমানে বাংলাদেশ ত্যাগ করেন। ভৈরবে এক জনসভায় ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, বর্তমানে পূর্ব বাংলা আসলে স্বাধীন। আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠনের অপেক্ষায় আছি। তিনি খাজনা প্রদান বন্ধ রাখার জন্য শেখ মুজিব যে নির্দেশ দিয়েছেন তা মেনে চলার জন্য আহ্বান জানান।  
এদিকে, পাক স্বৈরাচাররা পূর্ব পাকিস্তানের বাস্তব অবস্থা উপলব্ধি করতে পারে। তারা চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে থাকে। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে পাকিস্তানের বাঘা বাঘা নেতাও শঙ্কিত হয়ে পড়েন। একই দিনে জমিয়াতুল ওলামা ইসলামিয়া সংসদীয় দলের নেতা মাওলানা মুফতি মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে তিনটি আহ্বান জানানো হয়। আহ্বানগুলো হলো- পূর্ব পাকিস্তান থেকে সামরিক আইন প্রত্যাহার, ২৫ মার্চের আগে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে প্রতিটি গ্রাম, শহর, বন্দর, নগরে চলতে থাকে তীব্র অসহযোগ আন্দোলন।
মহান স্বাধীনতার জন্য উৎসুক, উন্মুখ বাঙালি জাতির ভাবনা তখন ছিল একটাই পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের অচলায়তন কিভাবে ভাঙ্গা যাবে। আগুন ঝরানো মার্চ মাসে জাতির এ প্রবল উৎকণ্ঠা-উদ্বেগ এবং মাতৃভূমিকে মুক্ত করার অদম্য আকাঙ্খা পরবর্তীকালে সর্বাত্মক জনযুদ্ধে রূপ নেয়। চরম ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের সিঁড়ি বেয়ে বাঙালি শেষ পর্যন্ত ছিনিয়ে আনে মহান স্বাধীনতা।



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft