রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০
মতামত
আসুন সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করি
সরোয়ার হোসেন
Published : Sunday, 12 April, 2020 at 9:54 AM
আসুন সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করিকরোনাভাইরাসের আতঙ্কে গোটা বিশ্ব, গোটা বাংলাদেশ। বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রতিদিন বাড়ছে করোনায় আক্রান্তদের সংখ্যা, সেই সাথে মৃত্যুও। তাবড় তাবড় দেশগুলোর পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেরবার অবস্থা। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প আশংকা করেছেন যত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক না কেন, এক আমেরিকাতেই মানুষ মারা যাবে কমপক্ষে এক লাখ। অসহায় হয়ে পড়েছে ইতালির সরকারও। স্পেন, ফ্রান্স, ইরানের অবস্থাও করুন। পাশ্ববর্তী ভারতে বুধবার রাত ১০টা পর্যন্ত মারা গেছে ৩৫ জন। আক্রান্তের সংখ্যা দেড় হাজারের ওপর। এরূপ পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের মানুষও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও বেসরকারি পর্যায়ে মানুষকে সচেতন করতে বিশেষ করে ঘরের মধ্যে রাখতে নেয়া হচ্ছে নানা উদ্যোগ। তৃতীয় দফায় সরকার সাধারণ ছুটি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। এই সময়ের মধ্যে সবাই যাতে বাড়িতে থাকে সেজন্যে বার বার তাগাদা দেয়া হচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে এই আহ্বান জানিয়েছেন। রাস্তায় রয়েছে পুলিশসহ বেসামরিক  প্রশাসন। তাদেরকে সহায়তা দিতে কাজ করছে সশস্্র বাহিনীর সদস্যরাও। কাঁচাবাজার, ওষুধের দোকান, মুদি দোকান ছাড়া অন্যান্য সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। তারপরও মানুষকে রাস্তায় বের হওয়া থেকে নিবৃত করা যাচ্ছে না। নানা উছিলায় সুযোগ পেলেই আমরা বেরিয়ে পড়ছি রাস্তায়। দলবেধে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কিংবা চায়ের দোকানে আড্ডা জমাচ্ছি। কেউ আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতেও বের হচ্ছেন। রাস্তায় প্রাইভেটকারে সংখ্যা দেখলে মনে হবে না কোনো বিধিনিষেধ রয়েছে। অথচ, করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার ওপরই গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। এছাড়া আর কোনো উপায়ও দেখা যাচ্ছে না। কিন্ত, কে শোনে কার কথা!
একথা সত্য যে, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ দিন আনা দিন খাওয়া। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, মুটে, মজুর, ছোট দোকানি, কলকারখানার ডেলেবার, গৃহস্থালী কর্মী ইত্যাদি পেশার সাথে যুক্ত। সাধারণ ছুটি ঘোষণার কারণে বা সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এসব শ্রেণির মানুষ সবথেকে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। রোজগার না থাকায় অনেকের চুলোয় হাড়িও চড়বে না। কিন্তু, আমাদের তো উপায় নেই। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে হলে আমাদেরকে একটু সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবেই। আর সে কারণে সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্যসহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। অনেকে এটাকে অপ্রতুল বললেও এটাই বা মন্দ কী। সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এমনকী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহের পক্ষ থেকেও। অনেক রাজনৈতিক নেতাও সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছেন। এগিয়ে আসছে সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহও। এক্ষেত্রে আমরা দাবি তুলতে পারি এই সহায়তাগুলো যাতে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের ঘরে পৌঁছায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। যশোরে এখনো পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে সহযোগিতা করা হয়েছে তা প্রকৃত দাবিদারদের ঘরেই গেছে। অন্যরাও সেই কাজ করতে পারলে একটা সামগ্রিক সমস্যাকে আমরা সম্মিলিতভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবোই।
তবে, একটি বিষয় এখানে না বললেই নয়, কিছু কিছু সহযোগিতার ক্ষেত্রে আমরা যা দেখতে পারছি তা খুবই ভয়ঙ্কর। যারা সহযোগিতা দিচ্ছেন তারা এমনভাবে ছবি তোলার জন্যে এক জনের সাথে আর একজন শরীরে শরীর ছোঁয়াচ্ছেন, দেখে মনে হয় সামাজিক দূরত্ব তাদের জন্যে প্রযোজ্য নয়। এটা খুবই ভয়ঙ্কর একটা ট্রাডিশান। যারা সহযোগিতা নিতে আসছেন তারা এই ঘটনা থেকে ভুল তথ্য নিয়েই যাচ্ছেন। এর থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা কোনো ত্রাণ নয়, বিশেষ প্রয়োজনে সামর্থবানরা অসামর্থবানদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন। ফলে সাহায্য দিতে গেলে যথাযথ নিয়ম মেনেই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা উচিত। প্রয়োজনে প্রশাসনকে বিষয়টি আমলে নিয়ে যারা মানবেন না তাদেরকে মানতে বাধ্য করা উচিত।
রাস্তায় ব্যক্তিগত পরিবহনের আধিক্য দেখেও সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক বার্র্তা যাচ্ছে। কিন্তু, কোনোভাবেই তা রোধ করতে পারছে না প্রশাসন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ-ভারত চেম্বারের ডাইরেক্টর মতিয়ার রহমান একটি উপায় বাতলেছেন। বিষয়টি প্রশাসন ভেবে দেখতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, ভারতে যানবাহন নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া মানুষকে আটকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রথমবার একটি স্টিকার গাড়িতে সেটে দিচ্ছেন। দ্বিতীয়বার ওই গাড়ি দেখলে তা আটক ও বাহকের বিরুদ্ধে অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। জরুরি সেবামূলক যেসব প্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাস মোবাবেলার কাজে গাড়ি ব্যবহার করছেন তাদের অনেক কর্মীও ব্যক্তিগত কাজে ওইসব প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ে রাস্তায় বের হয়ে আসছেন। সেটা রোধ করার জন্যেও একটা প্রস্তাবনা দিয়েছেন জনাব মতিয়ার রহমান। তিনি বলেছেন, যারা করোনাভাইরাস প্রতিরোধসংক্রান্ত কাজের সাথে যুক্ত তাদের স্বস্ব প্রতিষ্ঠানের বিশেষ অনুমতিসম্বলিত ডকুমেন্ট থাকতে হবে। অন্যথায় তারাও অন্যদের মতো নির্দেশ অমান্যকারী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
অন্য বিকল্প নিয়েও ভাবতে পারেন কর্তৃপক্ষ। মোদ্দাকথা হলো মানুষকে রাস্তায় অহেতুক বের হওয়া থেকে রুখতে হবে। কালীগঞ্জের এক ইউপি চেয়ারম্যান চায়ের দোকানিদেরকে নিবৃত্ত করতে দোকানের কেতলি জিম্মায় নিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তিনি সেগুলো ফেরত দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। যশোরে সমন্বিত বাহিনীর কর্মকর্তারা বুধবার এক যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এখন থেকে কাঁচা বাজার সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত এবং মুদি দোকান দুপুর একটা পর্যন্ত খোলা থাকবে। এমনকী চায়ের দোকানও খোলা রাখা যাবে না। সভা থেকে তারা হুশিয়ারী দিয়ে বলেছেন, এতদিন শুধু অনুরোধ-উপরোধ করা হয়েছে। এখন যদি কেউ এই নির্দেশনা না মানেন তাহলে তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। খুবই আশাপ্রদ একটি সংবাদ। আশা করি এই নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হবে।
টেলিভিশন খুললেই বলা হচ্ছে ‘ঘরে থাকুন’, পত্রিকার পাতায়ও একই বার্তা। ফেসবুক খুললেই এই ধরণের প্রচারণা ছাড়া আর কিছু নেই। এমনকী নিত্য ব্যবহার্য্য মোবাইলে কল দেয়ার শুরুতেই ঘরে থাকার আহব্বান জানানো হচ্ছে। তারপরও আমাদের যেনো হুশ হচ্ছে না। কোনো কারণ নেই, ‘মানুষ বাইরে বের না হলে পরিবেশ কেমন হয়’ তাই দেখার জন্যেও আমরা বের হচ্ছি। এভাবে সবাই নানা উছিলায়, নানা বাহানায়, নানা কায়দায় সামাজিক দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা লঙ্ঘন করে চলেছি। আর এভাবেই যে আমরা করোনার ঝুঁকিতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ছি তার খেয়াল কেউ করছে না। এটা রোধ করা দরকার।
একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘পশুপাখিকে ঘরে তুলতে হয় দাঁবড়িয়ে। মানুষ পশু নয়। আসুন নিজে ঘরে অবস্থান করেই আমরা আমাদের মনুষত্বের পরিচয় দেই’। তীক্ষè একটি খোঁচা রয়েছে আহ্বানটির মধ্যে। যুক্তিসংগতও নয় কি! আসুন নিজে, পরিবারের, অন্যের এবং দেশের মানুষকে বাঁচাতে কিছু কষ্ট স্বীকার করে হলেও সাময়িক সময়ের জন্যে আমরা ঘরে থাকি, করোনাভাইরাসকে মোকাবেলা করি।

সরোয়ার হোসেন: বার্তা সম্পাদক-গ্রামের কাগজ, যুগ্ম সম্পাদক-প্রেসক্লাব যশোর, কার্যনির্বাহী সদস্য-যেেশার শিল্পকলা একাডেমী



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft