শনিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২১
স্বাস্থ্যকথা
করোনা চিকিৎসায় ওষুধ উৎপাদনে এগিয়ে বাংলাদেশ
কাগজ ডেস্ক :
Published : Sunday, 12 April, 2020 at 10:44 AM
করোনা চিকিৎসায় ওষুধ উৎপাদনে এগিয়ে বাংলাদেশকরোনাভাইরাস পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে অনেকটা আগেভাগেই কাজে লেগে পড়েছে দেশের ওষুধ খাত। সরকারও করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ উৎপাদন ও মজুদ রাখতে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিচ্ছে ওষুধ খাতে।
এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো গবেষণার আওতায় থাকা টিকার দিকে নজর রাখছে বাংলাদেশ। কোনো দেশে নতুন কোনো ওষুধের কার্যকারিতা বা টিকা নিয়ে গবেষণার খবর পেলেই সেগুলো নিয়ে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরাও পর্যালোচনায় লেগে পড়ছেন।
সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক বাইরের দেশগুলোতে করোনা চিকিৎসায় কোথায় কী ওষুধ নিয়ে চেষ্টা করছে সেটা পর্যবেক্ষণ করছি গভীরভাবে। এ পর্যায়ে সব ওষুধই যে কার্যকর হচ্ছে সেটা কিন্তু নয়। তবু যে কয়টি বেশি কার্যকর হচ্ছে বলে জানা গেছে সেগুলো আমাদের এখানে উৎপাদনে আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি।
তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশই কিছু কিছু ওষুধ উৎপাদন নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের সুবিধা হচ্ছে আমরা আগে থেকেই ওই জেনেরিকের ওষুধ উৎপাদন করে আসছি স্থানীয়ভাবে। ফলে কোথাও কোনো ওষুধ আবিষ্কার হলেই আমরা তা এখানে উৎপাদনে সক্ষম।’
মহাপরিচালক বলেন, সারা বিশ্বে চিকিৎসা পরিস্থিতির ওপর পর্যবেক্ষণ থেকেই এরই মধ্যে প্রণীত জাতীয় নির্দেশিকায় করোনা আক্রান্ত রোগীদের উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসায় কয়েকটি ওষুধ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আটটি ওষুধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে জাতীয় নির্দেশিকায়। এসব ওষুধের জেনেরিক হচ্ছে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন, ক্লোরোকুইন, এজিথ্রোমাইসিন, ফেভিপিরাভির, রিবাভাইন, টোসিলিজুমাব, রেমডেসিভির ও লোপিনাভির-রিটোনাভির। জাতীয় এই নির্দেশনার আঙ্গিকে এরই মধ্যে দেশীয় কয়েকটি কম্পানিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এসব ওষুধ উৎপাদন করার জন্য। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও সাড়া মিলেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পুরনো কিছু রোগে কার্যকর কিছু ওষুধ নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীই করোনাভাইরাসের চিকিৎসায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন তেমনি একটি আলোচিত ওষুধ, যা প্রধানত ম্যালেরিয়ার জন্য ব্যবহৃত হলেও এখন এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে আথ্রাইটিসের চিকিৎসায়ও ব্যবহার করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন করোনাভাইরাস সংক্রমণে সৃষ্ট কভিড-১৯ রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজন অনুসারে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। অন্য আরো কয়েকটি দেশের সরকারও এই ওষুধটির ব্যবহার ও মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এই ওষুধ সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় ভারতে। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সম্প্রতি দেশটি তা তুলে নিয়েছে। বাংলাদেশে এই ওষুধের সংকট নেই। তবু সম্ভাব্য চাহিদার দিকে নজর রেখে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া সরকার ইতিমধ্যেই দেশীয় প্রতিষ্ঠান ইনসেপ্টা লিমিটেডের কাছ থেকে ৩০ লাখ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ কিনে মজুদ করেছে। এ ছাড়া ওই প্রতিষ্ঠান আরো তিন লাখ ওষুধ বিনা মূল্যে সরকারকে দিয়েছে। একইভাবে এজিথ্রোমাইসিন উৎপাদন বাড়ানোর জন্যও দেশীয় কম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান বলেন, ‘করোনাভাইরাসটি একেবারেই নতুন। অনেক পুরনো ভাইরাসের চিকিৎসাও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সুরাহা হচ্ছে না। তবে তুলনামূলক বিবেচনায় কিছু কিছু আন্তর্জাতিক গবেষণায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেদিক থেকে বলাই যায়, আমাদের কিছুটা হলেও ওষুধের দিক থেকে এই হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন আশা জোগাচ্ছে।’
ইনসেপ্টার উপমহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীনসহ কয়েকটি দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন বেশ সফলতা দেখিয়েছে। দেশে ইনসেপ্টাসহ মাত্র দুটি দেশি কম্পানি এই ওষুধ উৎপাদন এবং বাজারজাত করে থাকে। ইনসেপ্টা ফার্মা এটি বাজারজাত করে আসছে ১৫ বছর ধরে, যা বাজারে ‘রিকোলিন’ নামে পরিচিত। করোনা মোকাবেলার জন্য প্রণীত জাতীয় কর্মকৌশলের মধ্যে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে কভিড-১৯ রোগীর জন্য হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতেও আক্রান্ত রোগীদের পাশাপাশি যারা ক্রমাগত রোগীর সংস্পর্শে আসছে বা সেবা দিচ্ছে, তাদের জন্যও প্রতিরোধক হিসেবে ওষুধটি ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।
তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইনসেপ্টা থেকে এই ওষুধ আমদানি করতে চাচ্ছে, কিন্তু দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে ইনসেপ্টা বর্তমানে এই ওষুধের রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। এমনকি আগে থেকে ব্রিটেনে এই ওষুধ রপ্তানি করা হলেও তা-ও এখন বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সব ওষুধের দোকানে পর্যাপ্ত পরিমাণে এর সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে ভারত সরকার ঘোষণা দিয়েছে, বাংলাদেশসহ যেসব দেশে এই ওষুধ প্রয়োজন হবে তারা পাঠাবে। বিশ্বে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইনের মোট উৎপাদনের ৭০ শতাংশই ভারতে হয় বলে জানান ওষুধ বিশেষজ্ঞরা।
চীন ও জাপানে কয়েকটি অ্যান্টিভাইরাল ও অ্যান্টিফ্লু ওষুধ করোনাভাইরাসে কিছুটা কাজ করছে বলেও সেখানকার চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন। সেই সূত্র ধরে বাংলাদেশের কয়েকটি ওষুধ কম্পানি ওই ওষুধগুলো এ দেশে উৎপাদনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ঔষধ প্রশাসনও আগ্রহী কম্পানিগুলোকে এ ধরনের ওষুধ উৎপাদনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। এর ভিত্তিতে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো, স্কয়ার, বিকন, রেনাটা, এসকেএফ ও ভেরিতাস এখন পর্যন্ত জাপানে কার্যকর হওয়া অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ ফেভিপিরাভিরসহ আরো কয়েকটি ওষুধ উৎপাদনের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফেভিপিরাভির ওষুধটি জাপানে প্রথম ২০১৪ সালে তৈরি করেছিল ফুজি ফিল্মের সহযোগী প্রতিষ্ঠান তোয়ামা কেমিক্যাল কম্পানি, যা ইবোলা চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়েছে। ব্রড স্পেক্ট্রাম অ্যান্টিভাইরাল কার্যকারিতার জন্য এটি কভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসায় উহান ও শেনজেনে ব্যবহার করা হয়েছে। অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ ফেভিপিরাভির কভিড-১৯ রোগের চিকিৎসার সময় কমাতে ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সহয়তা করে।
বিকন ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করীম গত সপ্তাহে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ফেভিপিরাভিরের প্রথম ব্যাচ তৈরি হয়েছে যা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে ট্রায়ালের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি জানান, গত ২৮ মার্চ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কভিড-১৯ চিকিৎসায় জাপানের স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্টে ওষুধটি অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করে। আরো কয়েকটি দেশ পরীক্ষামূলক ব্যবহারে ইতিবাচক ফল পেয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, যে কয়টি ধাপ পেরিয়ে কোনো টিকা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয় সেই ধাপগুলো সম্পন্ন করতে ন্যূনতম দেড়-দুই বছর লেগে যায়। অনেক টিকা দু-এক ধাপ পার করেও পরবর্তী ধাপে যেতে বহু বছরও লেগেছে। তাই এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত কত দিন লাগে।
এদিকে জাপানের ফুজি ফিল্ম তয়োমা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উৎপাদন করা এভিগান প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে বাংলাদেশও ওই ওষুধ পাবে।
জাপানের টোকিওতে বাংলাদেশ মিশনের কাউন্সেলর এবং দূতালয় প্রধান ড. জিয়াউল আবেদিন সাংবাদিকদের জানান, জাপান সরকার বাংলাদেশকে জানিয়েছে, কভিড-১৯ প্রতিরোধে তারা সীমিত আকারে বিনা মূল্যে এভিগান দেবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, করোনা প্রতিরোধে এভিগান (ফেভিবিরাপির) ওষুধে আশার আলো দেখা যাওয়ার পর বাংলাদেশ গত মাসেই জাপানের কাছে ওই ওষুধের জন্য যোগাযোগ করে। জবাবে জাপান বাংলাদেশকে প্রথম পর্যায়ে সীমিত আকারে ওই ওষুধ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের যে কয়টি কম্পানিকে সরকার জাপানি ওই ওষুধ উৎপাদনে অনুমোদন দিয়েছে তাদের অন্যতম বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস আজ (রবিবার) প্রাথমিক পরীক্ষামূলক ব্যবহারজনিত প্রতিবেদন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে দেবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft