মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
সোনালী ব্যাংক কালীগঞ্জ শাখায় বিধবাদের ভাতার টাকা আত্মসাৎ
এমপির তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে ফেরত পেয়েছেন অনেকে
টিপু সুলতান, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
Published : Wednesday, 13 May, 2020 at 8:24 PM
সোনালী ব্যাংক কালীগঞ্জ শাখায় বিধবাদের ভাতার টাকা আত্মসাৎবিধবা গৃহপরিচারিকা আখিরন নেছা সোমবার সোনালী ব্যাংক ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শাখায় গিয়েছিলেন সরকারের দেয়া বিধবা ভাতার টাকা উত্তোলন করতে। তার পাওনা চার হাজার পাঁচশ’ টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বইতে একই অংক লিখে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিন হাজার টাকা। বাকি টাকার কথা জানতে চাইলে বলা হয়েছে ‘বেশি বুঝলে মোটেও পাবেন না।’
একইভাবে কদবানুর হাতেও চার হাজার পাঁচশ’ টাকার পরিবর্তে দেয়া হয়েছে তিন হাজার টাকা। তাকে বলা হয় ‘এই টাকা নিলে নেন, না নিলে চলে যান।’
শুধু আখিরন নেছা, কদবানু নন, অসংখ্য বিধবা নারীর টাকা এভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন সোনালী ব্যাংক কালীগঞ্জ শাখার কর্মকর্তারা। যা স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের কারণে প্রকাশ পেয়েছে। তার হস্তক্ষেপে বেশ কয়েকজন বিধবা তাদের বাকি এক হাজার পাঁচশ’ টাকা ফেরত পেয়েছেন। এমপি আনারের বক্তব্য অসহায় দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের দেয়া এই টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে কম টাকা তুলে দিয়েছেন। পরে তার উপস্থিতিতে ১৫ জনের বাকি এক হাজার পাঁচশ’ করে টাকা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। তার দাবি আরও অসংখ্য মানুষের সঙ্গে এটা করা হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে চার হাজার নয়জন বিধবা ভাতা, আট হাজার চারশ’জন বয়ষ্ক ভাতা এবং দু’হাজার একশ’ ৭৭ জন প্রতিবন্ধি ভাতা পেয়ে থাকেন। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কৌশিক খান জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তাদের বরাদ্ধ সব চলে এসেছে। সোমবার কালীগঞ্জ পৌরসভা ও তিনটি ইউনিয়নের ভাতাপ্রাপ্তদের মাঝে টাকা বিতরণ করা হয়েছে। যদিও ওই দিন পৌরসভা এলাকায় ভাতা বিতরণের কথা না। এই পৌর এলাকায় অনিয়মটা হয়েছে। তিনি আরও জানান, মাসে বিধবা ভাতা পাঁচশ’, বয়ষ্ক ভাতা পাঁচশ’ এবং প্রতিবন্ধীরা সাতশ’ ৫০ টাকা করে পেয়ে থাকেন।
যাদের টাকা কম দেয়া হয়েছে তাদের একজন কদবানু (৮০)। বয়সের ভারে এখন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। কালীগঞ্জ শহরের আড়পাড়া এলাকায় মাত্র চার শতক জমির উপর তার টিনের চালায় বসবাস। স্বামী গোলাম রসুল আনুমানিক ৪৫ বছর পূর্বে মারা গেছেন। সেই থেকে তিনি বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে রান্নার কাজ করে সংসার চালান। তার বড় ছেলে আসাদুল ইসলাম বাদাম বিক্রি করেন, ছোট ছেলে সাইদুল ইসলাম চা বিক্রেতা। একমাত্র মেয়ে আকলিমা খাতুনকে বিয়ে দিয়েছেন।
কদম বানু জানান, ছেলেদের কষ্টের সংসার। এই ভাতা দিয়ে ওষুধপত্র কিনতে হয়। সোমবার টাকা তুলতে গেলে চার হাজার পাঁচশ’ টাকার পরিবর্তে তিন হাজার টাকা দেয়া হয়েছে তাকে। এটার কারণ জানতে চাইলে বলা হয়েছে ‘নিলে নেন, না নিলে চলে যান।’ কদবানু কথাগুলো বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্রিক ফিল্ড এলাকার বাসিন্দা আখিরন নেছার স্বামী আবু তাহের মারা গেছেন ২৪ বছর হয়েছে। এক ছেলে রবিউল ইসলাম রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। এক মেয়ে ফাতেমা খাতুনের বিয়ে দিয়েছেন। নিজে বাড়ির সামনে টোং দোকানে চা বিক্রি করেন। এই চা বিক্রি আর বিধবা ভাতার টাকায় তার সংসার চলে। সেই টাকা কম দেয়ার পর তিনি এলাকায় ফিরে শফিকুজ্জামান রাসেলকে বিষয়টি খুলে বলেন। রাসেল স্থানীয় সাংসদের নজরে নিয়ে আসার পর তার বাকি টাকা ফেরত পেয়েছেন। এভাবে অনেককে চার হাজার পাঁচশ’ টাকার মধ্যে এক হাজার পাঁচশ’ টাকা কম দেয়া হয়েছে। যারা প্রতিবাদ করতে না পেরে বাড়ি ফিরে গেছেন।
এমন অভিযোগ বিধবা ভাতার টাকা নিতে আসা উপজেলার ছোট শিমলা গ্রামের রেখা রাণী, রূপালী বিশ্বাস ও মায়া রাণীদের। তারা জানান, তাদের বইতে সাড়ে চার হাজার টাকা লেখা থাকলেও ব্যাংক থেকে তিন হাজার টাকা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাকি টাকা দেয়ার ব্যাপারে তাদের কিছু জানায়নি।
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে সোনালী ব্যাংকের কালীগঞ্জ শাখায় গিয়ে দেখা যায়, গত সোমবার যাদের টাকা কম দেয়া হয়েছিল মঙ্গলবার তাদের টাকা ফেরত দেয়া হচ্ছে। সমাজসেবা অফিসের ইউনিয়ন সমাজকর্মী রবিউল ইসলাম জানান, তারা খোঁজখবর করে আরও ১৪ জনের সন্ধান পেয়েছেন। তাদের বাকি দেড় হাজার টাকা পাওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকে এসেছেন এবং ইতোমধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের সেই টাকাও পরিশোধ করেছেন।
তিনি আরও জানান, খোঁজ নিচ্ছেন আর কেউ টাকা কম পেয়ে থাকলে তার টাকা পাওয়ার ব্যবস্থাও করবেন। এ সময় নার্গিস বেগম জানান, তিনি দেড় হাজার টাকা কম দেয়ার কারণ জানতে চাওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কৌশিক খাঁন জানান, সকল পর্যায়ের ভাতা প্রাপ্তদের ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত ভাতার টাকা চলে এসেছে। তারাও এই টাকা ছাড় করেছেন। এখন শুধুমাত্র বিতরণ করার পালা।
তিনি বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ওই দিন সিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে টাকা বিতরণ করার কথা থাকলেও করেছেন পৌরসভা এলাকার। যেখানে এই অনিয়মটি হয়েছে। তবে এটা কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। ভাতাপ্রাপ্তদের যে বই আছে সেখানে সাড়ে চার হাজার টাকা লিখে তিন হাজার টাকা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার জানান, সোমবার দুপুরে তার কাছে খবর যায় অসহায় মানুষের টাকা আত্মসাত করা হচ্ছে। এই খবর পেয়ে তিনি ব্যাংকে ছুটে আসেন। সেখানে গিয়ে ঘটনা সঠিক দেখে উপস্থিত কমপক্ষে ১৫ জনের কথা শুনে তাদের বাকি দেড় হাজার করে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক ভুল বলে টাকা ফেরত দেন।
এমপি আনার আরও জানান, এখানে এসে তিনি জানতে পারেন ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মীও ভাতা নিতে আসা অসহায় নারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি একশ’ করে টাকা নিচ্ছেন। এছাড়াও প্রতিবন্ধীদের সব টাকা দেয়া হচ্ছে না। এসকল অনিয়মের বিষয়ে তিনি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানান। তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপককে বিষয়গুলি অবহিত করে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বলেছেন।
এ বিষয়ে ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক শামীম রেজা জানান, অনেক কাজের মধ্যে এই কাজটি করতে গিয়ে তার অফিসাররা ভুল করেছেন। পরে সব সমাধান করে ফেলা হয়েছে। তারপরও বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft