শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
করোনাজয়ীদের কথা – ২
স্বাস্থ্যবিধি মেনে লড়াই করে করোনাকে হার মানিয়েছেন ডা. আসিফ
ফয়সল ইসলাম :
Published : Friday, 15 May, 2020 at 1:08 AM

স্বাস্থ্যবিধি মেনে লড়াই করে করোনাকে হার মানিয়েছেন  ডা. আসিফকরোনাভাইরাসে আক্রান্ত চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার আসিফ রায়হান স্বাস্থ্যবিধি মেনে লড়াই করে করোনাকে হার মানিয়েছেন। ডাক্তার আসিফ যশোর শহরের খড়কীর শাহ আব্দুল করীম সড়কে পৈত্রিক বাড়িতে বসবাস করেন। তার বাবা ডাক্তার আব্দুল হাই খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের সাবেক উপ-পরিচালক। তিনিই যশোরের প্রথম করোনা জয়ী। এ জয়ের পেছনের ঘটনা হৃদয় বিদারক ও বিষাদের। তারপরও আছে মহা আনন্দ ও খুঁশি। ডাক্তার আসিফ আবারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন অসহায় রোগীদের সেবা দেয়া তথা করোনার বিরুদ্ধে সম্মুখে লড়াই করার জন্যে।  
ডাক্তার আসিফ রায়হান বলেন, গত ২১ এপ্রিল তিনি চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওইদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ১৩ বছরের এক শিশু ও ৩৫ বছর বয়সী এক নারী চিকিৎসা নিতে আসেন। শারিরীক অবস্থা ও বিভিন্ন উপসর্গ দেখে সন্দেহ হয় তারা করোনাভাইরাসে সংক্রমিত। তাৎক্ষণিক তাদের নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়। ২২ এপ্রিল রিপোর্ট আসে তারা করোনা পজেটিভ। ওই দু’রোগীকে চিকিৎসা দেয়ার স্বার্থে খুব কাছ থেকে সংস্পর্শে থাকায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলাম। এরপর জ্বর, শ্বাস কষ্ট, সর্দিসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিলো। কালক্ষেপন না করে ২৫ এপ্রিল নমুনা দিলাম। ২৬ এপ্রিল রিপোর্ট আসলো আমি করোনা পজেটিভ। এতে মোটেই অবাক কিংবা হতাশ হয়নি। আতংকিত এবং আশাহতও হয়নি। বাবা, মা, স্ত্রীসহ পরিবারের সকলকে সাহস জুগিয়েছি এবং তারাও আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন করোনার সাথে লড়াই করতে।
রোগীর সেবা করতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হয়েছি। তারপরও কতিপয় প্রতিবেশীর মনোভাব ছিল আক্রমণাত্বক। তাদের ধারণা আমি বা আমার পরিবার কোনো অপরাধ বা পাপ করেছেন। বাড়িটি লকডাউন করার সময় কেউ কেউ মজাও নিয়েছেন। তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেছেন। বাড়িতে সবজি ওয়ালা আসলে তাকে শাসানো হয়েছে পরবর্তিতে যেন সে ওই পাড়াতে না ঢোকে।
বাড়িতে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন থাকার ৯ দিনের মাথায় অর্থাৎ ৪মে তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষার রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। আবারও নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হলে ৬ মে নিশ্চিত করা হয় তার নমুনায় করোনাভারাসের অস্তিত্ব নেই। করোনাভাইরাস মুক্ত হবার পর যশোরের সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন নিজে তার বাড়িতে গিয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। হস্তান্তর করেন করোনাজয়ী সার্টিফিকেট। লকডাউন মুক্ত করা বাড়ি।
করোনা থেকে মুক্তি পেতে তার সাফ কথা, করোনায় আক্রান্ত হওয়া কোনো পাপ বা অপরাধ নয়। এটি ভাইরাস সক্রমিত রোগ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পুরোপুরি আইসোলেশনে থেকে চিকিৎসা নিলে করোনাকে জয় করা সম্ভব। আক্রান্ত হওয়ার পর নিজেকে একটি ঘরের মধ্যে আবদ্ধ রেখেছিলাম। তারপরও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বজায় রেখেছেন। জ্বর নিরাময়ের জন্যে প্যারাসিটামল খেয়েছি। বেশি পরিমাণে পানি পানসহ ভিটামিন-সি সম্মৃদ্ধ ফল খেয়েছি। নিয়মিত লবন মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গারগিল করেছি। এছাড়াও সময়ে সময়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ মেনে শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য উপসর্গ নিরাময়ের ওষুধ সেবন করেছি। নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও সুষ্ঠু জীবনাচরণেই করোনা ছোবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছি।
ডাক্তার আসিফ আরও বলেন, করোনা মুক্ত হওয়ার পর এক সপ্তাহ হতে চলল। করোনা আক্রান্ত হবার পর যেমন অসংখ্য শুভাকাঙ্গী খোঁজ নিয়েছেন, দোয়া করেছেন তেমনি রোগমুক্তির খবর পাওয়া মাত্র স্বস্তি সহকারে অনেকে অভিবাদন জানিয়েছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। একজন ডাক্তার পিতার সন্তান আমি। আমার বাবা ডাক্তার মো. আব্দুল হাই (অবসরপ্রাপ্ত উপ পরিচালক স্বাস্থ্য খুলনা বিভাগ) চিরদিনই আমার অনুপ্রেরণা হয়ে কাজ করেছেন। শত বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে জনকল্যাণে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে দেখেছি তাকে। সুতরাং ডাক্তার হিসেবে চলতে হলে এই পেশা সংশ্লিষ্ট সকল ঝুঁকি সাথে নিয়ে চলতে হবে।  
পরের ঘটনাবলি দ্রুত ঘটতে থাকে। এ এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। ডাক্তার হিসেবে চাপের মধ্যে কাজ করলেও এই পরিস্থিতিতে চাপ অনেক বেড়ে যায়। পরিবারে বাবা মা,ভাই বোন সকলে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন।আমার স্ত্রী ডাক্তার সিফাত নাজনিন (তিনিও মেডিকেল অফিসার হিসেবে একই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত) আমাকে মানসিক দিক থেকে শক্ত থাকতে এবং ধৈর্য সহকারে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সহায়তা করেছেন। সকল প্রকার অনিশ্চয়তা মাথায় রেখে হাসিমুখে সেবাযত্নের মাধ্যমে আমাকে সুস্থতার দিকে এগিয়ে দিয়েছেন। এই দুঃসময়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, বিএমএ, জেলা প্রশাসন,পুলিশ বিভাগ সহযোগিতা করেছে। আত্মীয় স্বজন,বন্ধু, শিক্ষক, সহকর্মী ও শুভানুধায়ীরা এগিয়ে এসেছেন। আবার এটাও ঠিক যে, কিছু প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিবেশী অযাচিত আচরণ করেছেন। আমার ধারণা নিতান্তই অজ্ঞতা থেকে এমন করেছেন। আশা করি তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।
নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ধৈর্যধারণ করেছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছি নিজে এবং অন্য আক্রান্তরা যেন দ্রুত আরোগ্য লাভ করতে পারেন। নিজ বাড়িতে মা-বাবা, স্ত্রী তথা পরিবারের আপনজনরা উপস্থিত থাকলেও তাদের আলদা হয়ে একটি ঘরে সর্বক্ষণ বন্দি থাকতে হয়েছে। কোনো কিছুর প্রয়োজনে মোবাইলে যোগাযোগ করেছি। পরিবারের আর কেউ যেন সংক্রমিত না হয় সেজন্যে সব সময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অতি জরুরি কথা গুলো বলতে হয়েছে। একে অপরকে দেখতে পেরেছি। কিন্তু কারো কাছে যেতে পারিনি। এটা যে কতোটা কষ্ট আর বেদনার তা বলে বোঝানো সম্ভব না। তারপরও মনোবল হারায়নি। পরিবারের সকলে সাপোর্ট করেছেন। করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহস যুগিয়েছেন। একই সাথে মনে রেখেছি মেডিকেলে ওরিয়েনেস্টশন ক্লাস ও ইন্টার্ণশিপে যোগদানের সময় মানব সেবা করার শপথের কথা। তাই করোনার বিরুদ্ধে লড়াইকালীন পরিকল্পনা করেছি যখনই জয়ী হবো ফিরে যাব অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবায়। এটাই তো আমার কাজ।    
করোনার এই মহামারিতে হয়তো সামনে অনেকেই আক্রান্ত হবেন। মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে করোনাকে জয়ের মনোভাব ধারণ করতে হবে। সচেতনতা, প্রচুর পানি পান,পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, পরিমিত ভিটামিন এ,সি,ই ও বিশ্রাম নিতে হবে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
আর মাত্র দু’দিন। এরপর আবারও যোগদান করব হাসাতালে। ফিরব আবারও করোনা যুদ্ধে। সবার সহযোগিতায় ইনশাআল্লাহ করোনা প্রাদুর্ভাব মুক্ত হবে আমাদের দেশ।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft