শনিবার, ০৬ মার্চ, ২০২১
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
যশোরে বিষক্রিয়ায় ১৭ জন মারা গেলেও নিরব প্রশাসন
বন্ধ হচ্ছে না বাংলা মদের কারবার
জাহিদ আহমেদ লিটন :
Published : Monday, 18 May, 2020 at 1:15 AM
বন্ধ হচ্ছে না বাংলা মদের কারবারসতেরো জনের মৃত্যুর পরও যশোরে বন্ধ হচ্ছে না বাংলা মদের কারবার। বর্তমানে শহরের হরিজন পল্লীগুলোতে বেশ জোরেসোরেই এ অবৈধ ব্যবসা চলছে। প্রশাসন শহরের বিভিন্ন স্পটের অবৈধ মদের দোকান অপসারণ করলেও হরিজন পল্লীর বেপরোয়া কারবার অব্যাহত রয়েছে। যা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বৃহত্তর যশোর জেলায় মোট ২৪ জন বাংলা ও বিলেতি মদের ডিলার রয়েছে। জেলাগুলো হলো, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল। এরমধ্যে যশোর জেলায় ডিলার রয়েছে ৬ জন। ডিলারদের মধ্যে যশোর সদরে ২ জন, নাভারণে ১ জন, ঝিকরগাছায় ১ জন, মণিরামপুরে ১ জন ও অভয়নগরে ১ জন। তাদের মাধ্যমেই গোটা জেলায় বাংলা ও বিলেতি মদ বিক্রি হয়। তবে শর্ত রয়েছে, ডিলারশিপের এ মদ হরিজন সদস্য ও লাইসেন্সধারী মদ সেবনকারীর মাঝে বিক্রি করতে হবে। কিন্তু লাইসেন্সের মদ বিক্রির এ শর্ত কোন ডিলারই মেনে চলেন না। তারা অবৈধ সাব এজেন্ট নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমেই বাংলা মদ বিক্রি করে থাকেন। এ কারণে যশোর শহরের বড়বাজারের ঝালাইপট্টি ও মাড়োয়ারি মন্দিরের পাশে পতিতালয়ের সামনে গড়ে উঠেছে বাংলা মদের দু’ডজন দোকান। এসব দোকানগুলোতে কোন প্রকার রাখঢাক না করে প্রকাশ্যেই বিক্রি করা হয় বাংলা মদ। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা এখান থেকে অনৈতিক সুবিধা আদায় করে থাকে। এ জন্য এসব স্থানে কারবারীদের মদের ব্যবসায় কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু করোনা মহামারী এসব মাদক ব্যবসায়ীদের বেকায়দায় ফেলেছে। এ কারণে তাদের অবৈধ কারবার গুটিয়ে নিতে হয়েছে। এমনকি তাদেরকে জেলখানায় পর্যন্ত যেতে হয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশে করোনা দুর্যোগ ছড়িয়ে পড়লে গত ২৫ মার্চ থেকে সরকারি-বেসরকারি সকল অফিস আদালত বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। এরপর থেকে যশোরে দর্শনা কেরু এন্ড কোম্পানি থেকে আসা বাংলা মদের সরবরাহ কমে যায়। ২৬ মার্চ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন বন্ধ ঘোষণা করে বাংলা মদের বিকিকিনি। তবে শহরের একজন ডিলার ১১ এপ্রিল পর্যন্ত চালু রাখে বাংলা মদ বিক্রি। খবর পেয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা গিয়ে তার মদ বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এ কারণে বেকায়দায় পড়ে অবৈধ বাংলা মদ ব্যবসায়ীরা। তারা বাংলা মদে পানি ভেজাল দেবার পরিবর্তে নিজেরাই বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে বাংলা মদ তৈরি শুরু করে। তারা কাঠের ফার্ণিচার রং করার কাজে ব্যবহৃত স্প্রিরিট বা হোমিওপ্যাথিক স্পিরিট কিনে এনে তার সাথে পানি ও ঘুমের ট্যাবলেটসহ নানা উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করতে থাকে বাংলা মদ। এরপর তারা যথানিয়মে ও যথাস্থানেই তা বিক্রি করতে থাকে। কিন্তু হাতুড়ে নিয়মে তৈরি করা বিষাক্ত এ বাংলা মদ পানে মানুষ অসুস্থ হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে এ মদপানে যশোরে একের পর এক মানুষের মৃত্যু শুরু হয়। গত এপ্রিল ও মে মাস নাগাদ যশোরে বিষাক্ত বাংলা মদপানে ১৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এ কারণে নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন ও র‌্যাব সদস্যরা। তারা শহরের ঝালাইপট্টি ও মাড়োয়ারি মন্দির এলাকার মদপট্টি উচ্ছেদ ও এর সাথে জড়িত অভিযোগে সিন্ডিকেট প্রধান হাসানসহ ৭ জনকে আটক করে। থানায় মামলা হয় ৫টি। এরপর থেকে এসব স্থানে প্রকাশ্যে বাংলা মদ বিক্রি বন্ধ রয়েছে। অথচ থেমে নেই হরিজন পল্লীর বাংলা মদের ব্যবসা। শহরে অন্যান্য মদের দোকান বন্ধের সুযোগে বর্তমানে যশোরের ৫টি হরিজন পল্লীতে চলছে রমরমা বাংলা মদের ব্যবসা। এসব পল্লীগুলো হলো, শহরের গাড়িখানা রোড, রেলস্টেশন পল্লী, পুরাতন খুলনা বাসস্ট্যান্ড তালতলা পল্লী, আবরপুরমোড় গোরাপাড়া পল্লী ও চুড়ামনকাটি এলাকার একটি হরিজন পল্লী। এরমধ্যে রেলস্টেশন ও আবরপুরমোড় গোরাপাড়া হরিজন পল্লীতে চোলাই মদ তৈরি ও বিক্রি রমরমাভাবে চলছে। ইতিমধ্যে গোরাপাড়া পল্লীর দু’জন হরিজন সদস্য বিষাক্ত এ মদপানে মৃত্যুবরণ করেছে। এসব পল্লীর কতিপয় বাসিন্দা ঘরে বসে ও পল্লীর প্রবেশ গেটে পলিথিনে ভরে মদ বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে এসব এলাকায় মদসেবীদের ভিড় বেড়েছে। কেরু এন্ড কোম্পানির বাংলা মদের সাপ্লাই না পেয়ে তারা হাতুড়ে পদ্ধতিতে এ বিষাক্ত চোলাই মদ তৈরি করছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে। আর এ কারণে যশোরে বিষাক্ত মদের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছে। এ মদ পানে অহরহ মানুষ অসুস্থ হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। অথচ হরিজন পল্লির এ অবৈধ বাংলা মদের ব্যবসা বন্ধে প্রশাসনের ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কোন পদক্ষেপ নেই। তারা মানুষকে বাঁচাতে এ অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
এ ব্যাপারে যশোর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবুল হোসেন বলেন, সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী গত ২৬ মার্চ থেকে যশোরে বাংলা মদ সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। এরপর মাদক ব্যবসায়ীরা হোমিওপ্যাথিক স্পিরিটের মাধ্যমে বিষাক্ত মদ তৈরি করে বিক্রি করছে। যা খেয়ে মানুষ অসুস্থ হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। আমরা মৃত ও অসুস্থ পরিবারে গিয়ে তাদের খোঁজ খবর নিচ্ছি ও বিক্রেতা চিহিৃত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থ্ াগ্রহণ করছি। ইতিমধ্যে আমরা শহরের নিউ আইডিয়াল হোমিও ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে চোরাপথে স্পিরিট বিক্রির অভিযোগে দু’জনকে আটক করে মামলা দিয়েছি। তিনি বলেন, অবৈধ মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হরিজন পল্লীতেও মাদক বিক্রি বন্ধে তারা পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানান।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহউদ্দিন সিকদারের সাথে। তিনি বলেন, মাদকের সাথে তাদের কোন আপোষ নেই। বরাবরই তারা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স অবস্থানে রয়েছেন। হরিজন পল্লীতে বাংলা মদের ব্যবসা নিয়ে তাদের কাছেও অভিযোগ রয়েছে। তারা ওইসব এলাকা থেকে বিষাক্ত মদসহ মাদকদ্রব্য বিক্রি বন্ধে দ্রুতই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে জানান।  


 




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft