মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০
মতামত
দেবী দুর্গার সাথে মহিষাসুর পূজা পায় কেন?
স্বামী জ্ঞানপ্রকাশানন্দ
Published : Friday, 23 October, 2020 at 8:36 PM
দেবী দুর্গার সাথে মহিষাসুর পূজা পায় কেন?আমরা দুর্গাপূজার কাঠামোতে অন্যান্য দেব-দেবীর সাথে অসুরকেও দেখতে পাই। দেব-দেবীর পূজার সাথে অসুরেরও পূজা হয়। প্রশ্ন এখানেই দেব-দেবীর দেবত্বের জন্য তাদের আমরা পূজা করে থাকি। কিন্তু অসুর যে আসুরিক প্রবৃত্তিতে পরিপূণর্, যাকে সবাই ঘৃণা করে প্রত্যাখান করেÑতার পূজা করা কেন হয় তাই এখানে আলোচনার বিষয়।
দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখা যায় একটি মহিষের পেট চিরে অসুরের আগমন। এজন্যই মনে হয় মহিষ থেকে সৃষ্ট বলে এর নাম মহিষাসুর। আবার এও শোনা যায়Ñ অসুর দুর্গাদেবীর সাথে যুদ্ধের সময় নানা প্রকার মায়া অবলম্বন করে রূপ পরিবর্তন করতে পারত। সেভাবেই সে মহিষের রূপ ধারণ করেছে বলে তাকে মহিষাসুর বলা হয়। পুরাণ মতে মহিষাসুর হলো রম্ভাসুরের পুত্র। তিনি ঘোরতর কঠিন তপস্যা করে ব্রহ্মদেবের নিকট বর লাভ করে সেই বরে বলীয়ান। তাকে স্বর্গ মর্ত পাতালের কোন দেবতা পরাজিত করতে পারবে না। এহেন অবধ্য অপরাজেয় এক অসুরÑযার নাম মহিষাসুর।
মহিষাসুরের মধ্যে ২টি গুণ বিরাজিত। একদিকে মহিষ অর্থাৎ পশুর গুণাবলী এবং অপর দিকে অসুরের অর্থাৎ আসুরিক গুণাবলী বিদ্যমান। পশুর গুণাবলী হলো আহার, নিদ্রা আর মৈত্থন। অপর দিকে অসুরের গুণাবলী শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতায় আছেÑ
             দম্ভো দর্পোহভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ।
         অজ্ঞানং চাভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম্ ॥ (১৬/৪)
অর্থাৎ যারা আসুরীক অবস্থা লাভ করেছে তাদের মধ্যে দেখা যায়Ñধর্মধ্বজিত্ব, ধন ও স্বজননিমিত্ত দর্প, অহঙ্কার, ক্রোধ, কর্কশ ব্যবহার, কর্তব্যাকর্তব্য বিষয়ে অবিবেক। আসুরিক  এবং পাশবিক এই দুটি ভাব-শক্তিতে বলীয়ান মহিষাসুর। সে দেবী দুর্গাকে বিভিন্ন মায়াজালে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে দশদিক থেকে আক্রমণ করেছিল। তাই দেবীদুর্গাও দশ হাতে যুদ্ধ করে দুর্দমনীয়  মহিষাসুরকে পরাজিত করে।
   উপরোক্ত উপাখ্যানটি গভীরভাবে অনুধাবন করলে দেখা যায়   দেবতাদের ও অসুরের মধ্যে সংগ্রাম চিরকালের। যেন সু এবং কু-এর মধ্যে লড়াই। মানবের অন্তরেও দৈবশক্তির সঙ্গে আসুরিক শক্তির লড়াই সর্বদাই লেগে আছে। প্রতিটি মানবের মধ্যে এই মহিষাসুরের গুণাবলী বিদ্যমান। মানব মন তিনটি গুণে গুণান্বিত। তমোগুণ, রজোগুণ এবং সত্ত্বগুণ। দেখা যায় তমোগুণের অধিকারী মানবের মধ্যে পাশবিকতা অর্থাৎ পশুর ভাবগুলো বেশী বিদ্যামানÑআহার, নিদ্রা, মৈথুনই এদের সর্বস্ব। আর হিংসা-দ্বেষ, দম্ভ, অহংকার, ক্রোধ, কর্কশ ব্যবহারে পরিপূর্ণ অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতিÑ  অসুরের মধ্যে দেখতে পাই। বস্তুত প্রবল ভোগ বাসনাপূর্ণ জীবনই অসুর। আবার রজোগুণ প্রধান মানুষে দেখা যায় কর্মের প্রতি আসক্তি, সে কর্ম ছাড়া থাকতেই পারে না। কিন্তু সে কর্ম নিষ্কাম নয় সকাম কর্ম। যা মানবকে মুক্তির পরিবর্তে বন্ধনের কারণ হয়। আর সত্ত্বগুণের অধিকারীর মধ্যে দেখা যায় দৈবীশক্তি বা সৎগুণাবলী।
   শ্রীমদ্ভগবদ্ গীতার ষোড়শ অধ্যায়ে দৈবী সম্পদের কথা বলা হয়েছে Ñ
            অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।
            দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্ ॥ (১৬/১)
            অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনম্ ।
            দয়া ভুতেষ¦লোলূপ্ত¦ং মার্দবং হ্রীরচাপলম্ ॥ (১৬/২)
            তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহো নাতিমানিতা ।
            ভবন্তি সম্পদং দৈবীমভিজাতস্য ভারত ॥ (১৬/৩)
অর্থাৎ যাঁরা দৈবী সম্পদলাভ করেছে তাঁদের ভয়শূন্যতা, ব্যবহারকালে পরবঞ্চন ও মিথ্যাকথন-বর্জন, জ্ঞান ও যোগে নিষ্ঠা, সামর্থ্যানুসারে দান, বাহ্যেন্দ্রিয়ের সংযম, যজ্ঞ, স্বাধ্যায়, তপস্যা, সরলতা, অহিংসা, সত্য, ক্রোধহীনতা, ত্যাগ, শান্তি, পরদোষ প্রকাশ না করা, দীনে দয়া, লোভরাহিত্য, মৃদুতা, অসৎ চিন্তা ও অসৎ কর্মে লজ্জা, অচপলতা, তেজ, ধৈর্য, বাহ্যাভ্যন্তর শৌচ, অবৈরভাব, অনভিমান, ক্ষমা, পরোপকার, নিরহংকারিতা ও ঈশ্বর প্রণিধান। এগুলি হলো দৈব শক্তি। মানবমনে আসুরিক ভাবগুলো এবং পাশবিক ভাবগুলো প্রবল থাকায় দৈবীভাবগুলো যা সত্ত্বগুণজাত তা প্রকাশিত হতে পারে না। কিন্তু সাধনার মাধ্যমে আসুরিক, পাশবিক ভাবগুলো দূরীভূত করতে পারলে দৈবভাবগুলোর স্ফূরণ ঘটে। তখনই মানুষ প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী হয়। সে ভগবান লাভের যোগ্য হয়ে মানব জীবন সার্থক করে।
   দুর্গাপূজার কাঠামোতে দেখা যায়, দেবী দুর্গার পদতলে মহিষাসুরের অবস্থান। যুদ্ধের পূর্বে অসুরের ধারণা ছিল দেবী দুর্গা সামান্য অবলা নারী যা কিনা পুরুষের ভোগের বস্তু, তাই দেবীদুর্গাকে নিজের মহিয়শী করার জন্য চিন্তা করে ছিল। কিন্তু মহিষাসুর পরাজিত হয়ে উপলদ্ধি করেছেন Ñ দেবী দুর্গা নারী হলেও ভোগের বস্তু নয়, অবলা সামান্য নয়, কামনা চরিতার্থ করার জন্য নয়। দেবী দুর্গার ত্রিশুল তার বক্ষে বিদীর্ণ হলে মহিষাসুরের মধ্যে আসুরিক এবং পাশবিক ভাব ত্রিশুলের দ্বারা বিনষ্ট হওয়ায় তার মধ্যে দৈবীভাবগুলো জেগে উঠেছে। তাই দেবী দুর্গাকে সে জগৎজননী সম্বোধন করে উপলব্ধি করলেনÑ
            যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেণ সংস্থিতা।
            নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ।।৭৩/৫
  শ্রীশ্রীচন্ডী
অর্থাৎ যে দেবী সবপ্রাণীতে মাতৃরূপে অবস্থিতা তাঁকে নমস্কার, তাঁকে নমস্কার, তাঁকে নমস্কার। কালিকাপুরাণ মতে, মহিষাসুর দেবীদুর্গার নিকট প্রর্থনা করলেনÑ সেও যেন দেবীর সাথে সর্ব যজ্ঞে পূজিত হয় ও দেবীর পদসেবা করতে পারে। দেবী বলেনÑ পূজার যজ্ঞভাগ সমস্ত দেবতাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
  তাই তুমি যজ্ঞভাগ পাবে না। তবে তুমি সর্বদা পদসেবায় নিযুক্ত     থাকবে এবং যেখানে আমার পূজা হবে সেখানে তুমিও পূজা পাবে। তাই দুর্গাপূজার কাঠামোতে মহিষাসুরের স্থানলাভ হয়েছে দেবীদুর্গার পদতলে। তাই তার পূজা হয়। পূজাতে মহিষাসুরের-এর ধ্যান মন্ত্রে আমরা  পাইÑ
            ওঁ কৃপাণ-চর্ম্ম-পানিঞ্চ সন্দষ্টৌষ্ঠ-পুটং তথা।
         মূল-ভিন্ন-তনুং শ্যামং ধ্যায়েশ্চ মহিষাসুরম্ ।
         গৃহীত-কেশপাশায় চন্ডিকা বাম-পাণিনা।
         রক্তারক্তী-কৃতাঙ্গাঁয় মহিষায় নমো নমঃ।

আবার ভক্তেরা মহিষাসুরকে প্রণাম জানায় এই মন্ত্রেÑ
         ওঁ রুদ্রো অস্যসুররাজ ত্বং দেবাণাংদর্পনাশকঃ।
         পিতুর্বর প্রার্থনয়া মহিষীগর্ভ সম্ভবঃ।
         কাত্যায়ণ্যা সমং যোদ্ধং সামর্থ্যং কস্য বিদ্যতে।
         কেনাসুরেণ বিধৃতঃ সমরে মধুসূদনঃ।
         কেনাস্যেন বিজিত্যা জৌ ত্রিদশা সেবকী কৃতা।
         মন্বন্তর  ত্রয়ংকেন ভুক্তং রাজ্যমকন্টকং।।
         বভূব কস্যবা সেনা পরার্দ্ধ শত সংমিতা।
         রূদ্ররূপ ধরায়াতো মহিষাসুরতে নমঃ।।
মূলত একই মায়ের দু’টি সন্তান একটি শিষ্ট আর একটি দুষ্ট অর্থাৎ একটি দেবতা অন্যটি অসুর। মহিষাসুরের কাতর প্রর্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা অসুরকেও নিজ সন্তান জ্ঞান করে তাঁরই পদতলে স্থান দিয়েছেন। শ্রীমা সারদা দেবী বলতেন, সন্তানের যদি ধূলো কাঁদা গায়ে লাগে তাতো মা-ই সেই ধূলো ঝেড়ে কোলে তুলে নেয়। ফলে মহিষাসুর এখন আর অসুর নয়। দেবতাদের সাথে থাকার স্থান লাভ করে ভক্তের নিকট পূজা লাভের অধিকারী হলো।
   মানবের মধ্যেও তমোগুণজাত, রজোগুণজাত, পাশবিক-আসুরিক
ভাবগুলো বিদ্যমান। এগুলো সাধনার মাধ্যমে মানুষ দূর করতে পারলে যোগ্যতা অর্জন করে দেবতার আসনে উন্নীত হতে পারে। যে যত সৎচিন্তা, সৎধ্যান, সৎকাজ করবে ততই তার ভেতর থেকে অসৎভাবনা তিরোহত হবে। অর্থাৎ আসুরিক ভাব দূর হবে দৈবীভাব প্রবল হবে। তখন কাম-ক্রোধাদি হ্রাস পেয়ে তার মধ্যে জাগ্রত হবে জীবের প্রতি ভালবাসা, প্রেম, ক্ষমা, দয়া, পরোপকার, অহিংসা। প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি। আনন্দ। যা মানবের কাম্য। ফলে আসুরিক ও পাশবিক সম্পন্ন ব্যক্তিও ক্রমে সৎ মানুষে পরিণত হতে পারে। সমাজের নিকট গ্রহণীয়, আদরণীয়, স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে।
   আমরা পৌরাণিক উপাখ্যান অবলম্বনে জানি যে, রত্নাকর দস্যু লোকজন হত্যা করে তার ধন-সম্পদ লুন্ঠন করে সংসার জীবিকা পালন করত। তার ভয়ে লোকজন ভীত সন্ত্রস্ত থাকত। একদিন ঐ পথে দেবর্ষি নারদ যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে রত্নাকর নারদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দিলেন। দেবর্ষি নারদ তাকে তখন কয়েকটি উপদেশ দিলেন। দস্যু সে উপদেশ গ্রহণ করে তার দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে পরবর্তী  কালে হলেন রামায়ণ রচয়িতা মহামুনি বাল্মিকী। এ যুগেও এরকম অনেক ঘটনা আমরা জানি। ১৯৭১ সনে যুদ্ধের সময় একটি ঘটনা মনে পড়ছে। জনৈক চান মিয়া চাঁদু নামে একজন  দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিলে। গ্রামে প্রায় প্রতিদিনই চুরি-ডাকাতি করত। তাকে চাঁদু ডাকাত বলেই সবাই জানে। পাক হানাদার যখন রাজাকারদের সাথে নিয়ে নিরিহ মানুষদের বাড়িঘরে অগ্নি সংযোগ করত, মা-বোনদের ইজ্জত হরণ করত সে সময় অসহায় বহু মানুষকে এই চাঁদু ডাকাত তার নিজ বাড়িতে রেখে তাদের ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করত। শুধু তাই নয় রাতের বেলায় সে এদের রক্ষার জন্য পাহারা দিত। তার এহেন কর্ম দেখে সবাই আশ্চার্যান্বিত হল। চাঁদু ডাকাত আর কু-প্রবৃত্তি অনুশীলন করে না। সুকর্মে নিয়োজিত হয়ে যেন সাধু পুরুষে পরিণত হল। যাকে দেখে সবাই ভয় পেত, সে হল আজ অসহায় মানুষের আশ্রয় দাতা। তার মধ্যে দেখা দিল দয়া, ভালবাসা, পরোপকার। যে গুণের জন্য সে এখন আলাদা একজন সোনার মানুষ। সমাজে সকলে তার প্রশংসা করে, সুনাম করে, শ্রদ্ধা করে।
   মহিষাসুরের এ উপাখ্যান অবলম্বনে বোঝা যায় যে অসৎ ব্যক্তিও সদভাবনায় পরিপূর্ণ হলে সেও সৎ ব্যক্তির আসন অলংকৃত করতে পারে। যেভাবে মহিষাসুর দেবীদুর্গার সাথে একই কাঠামোতে স্থানলাভ করে ভক্তের মনে পূজা গ্রহণের অধিকারী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। তাইতো শ্রীশ্রীচন্ডীতে আছেÑ
            যা দেবী সর্বভূতেষু চেতনেত্যভিধীয়তে।
            নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তসৈ নমো নমঃ।।১৯/৫
  যে দেবী সর্বভূতে চেতনারূপে প্রসিদ্ধা তাঁহাকে নমস্কার। কারণ এই চেতনাই মানবকে দেবতায় উন্নিত করে।
লেখক : অধ্যক্ষ, রামকৃষ্ণ আশ্রম ও মিশন, যশোর।






সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft