বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০
মতামত
একজন জব্বর আলীর আত্মকথা
মিজানুর রহমান :
Published : Wednesday, 28 October, 2020 at 12:37 PM
একজন জব্বর আলীর আত্মকথা  আমি জব্বর আলী। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম আমার। সৌভাগ্য আমার পক্ষেই ছিল সারাজীবন। অভাব অনটন কি কল্পনাই করতে পারি না। রমজান মাসে রোজা রেখে রিপু দমন ও ক্ষুধার্ত মানুষের দুঃখ দুর্দশা অনুধাবনের চেয়ে ডায়াবেটিসের স্বাভাবিক স্তর নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাই আমার পছন্দ। দশ গাঁয়ে আমার নাম ডাক। জব্বর আলীর ভয়ে যেন গর্ভবতী মহিলার সন্তানও তটস্ত থাকে। বাঘে মহিষে একঘাটে জল খায়। দাদার দাপট না থাকলেও বাবার দাপটেই আমার ষোলকলা। অনেকে আড়ালে আবডালে বলেছিল বাবার ইন্তেকালের পর বিড়ালের লাথি আছে কপালে। হাতি খাদে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে জানতাম কিন্তু কখনো খাদে পড়তে হয়নি। বাবার ইন্তেকালের পাঁচ বছর হয়েছে। বয়সের তুলনায় বেশ বুড়িয়ে গেছি। দাপট বুড়িয়ে যায়নি কখনো বরং তিল তিল করে বেড়েছে। রহম আলীর সাথে সুস্থ ও স্থির মাথায় যা করছি তা গুলিয়ে ফেলছে সমস্ত মস্তিষ্ক। রহম আলীর কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া কি কোনই গত্যন্তর নেই?
রহম আলী আমার প্রতিবেশী। তার কিংবা অন্যান্য দরিদ্র প্রতিবেশী পরিবারের অনাহার অর্ধাহারে দিন কাটতো জানলেও রোজার মাধ্যমে তাদের ক্ষুধা যন্ত্রণা অনুভবের শিক্ষা গ্রহণ আমার ধাতে কোনো দিন ছিল না। রহম আলীর প্রতি আল্লাহ এবার দয়ার নজরে তাকিয়েছেন। সে আজ গরু দিয়ে কুরবানী করছে। এমনিতেই তার প্রতি আমার বিদ্বেষ বেশ পুরনো। রহম আলী ধীরে ধীরে আমার দরিদ্র প্রতিবেশীর তালিকা থেকে ছিটকে পড়ছে। ক’বছর থেকে যাকাতের টাকা সে ফিরিয়ে দিচ্ছে। বলে কিনা, সে নাকি আর যাকাত খাবার উপযুক্ত নয়। আল্লাহ বুঝি তার অভাব ঘুচিয়ে দিয়েছেন। তার প্রতি সদয় হয়েছেন। বলে কি ব্যাটা রহম আলী! আমার করুণাকে সে ফিরিয়ে দিলো। এতো বড় স্পর্ধা দেখে গোপন অহমের গুড়ায় কম্পন শুরু হয়েছিল। তুষের আগুনের মতো অহমের আগুন আজ হঠাৎ দাউ করে জ্বলে উঠলো। সুতরাং রহম আলীকে আমার প্রকৃত স্বরূপের প্রাথমিক দিকটা দেখিয়েছিলাম মাত্র। তাই বলে এই অপরাধের জন্য তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে? তা কি করে হয়?
দুশ্চিন্তার কালো মেঘ পুরোপুরি ঘিরে রেখেছে আমাকে। ভাল হাতটি ধীরে ধীরে অবশ হতে চলেছে। পাঁচটি আঙুলের মাথা থেকে শিনশিন শুরু হয়েছিল বেলা এগারটা থেকে। সন্ধ্যা ছ’টায় কনুই পর্যন্ত গ্রাস করে নিয়েছে। তওবা করেছি ইতো:মধ্যে অগুনতিবার। নানা ধরণের ঔষধ সেবন করেছি বিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ঘনকালো মেঘ পুঞ্জিভূত হচ্ছে। কখন যে গর্জন শুরু হয় সে আশঙ্কায় বার বার প্লীহা কেঁপে উঠছে। তাহলে কি রহম আলীর কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে?
দুনিয়ার উত্তান-পতনের মর্মন্তুদ ঘটনাগুলো আমার চোখে ধরা দেয় না। আমি সেই শিক্ষণীয় উপদেশগুলো শুনে বিস্মৃত হয়ে যাই। কান দিয়ে এসব কোনো কিছুই ঢোকেনি। আমি ভাল করেই বিশ্বাস করি অহংকার একদিন অহংকারীকে তার চোখের পানিতে ডুবিয়ে থাকে। তাকে যথোপযুক্ত প্রতিফল প্রদান করে। তবে অহম বৃক্ষের শাখা-প্রশাখার বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি, যেটা কেবলই বিস্তৃত হয়েছে। রহম আলীর বাবা, চাচা এবং অসংখ্য দরিদ্র মানুষের ঘাম ঝরানো পরিশ্রম আমার সমস্ত রক্ত কণিকায় মিশে আছে। সে কথা বুঝলেও কখনো স্বীকার করি না।
তখন বেশ ছোট ছিলাম। ধানের চারা রোপণের জন্য জমি পস্তুত। চারাগুলোও রোপণের উপযোগী হয়েছে। হঠাৎ গ্রামে মহামারি কলেরা দেখা দিল। প্রতিদিন কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। বাবা আমাদের পরিবারের সবাইকে নিয়ে শহরের বাসায় চলে এলেন। দু’মাস পর গ্রামে ফিরে দেখলাম জমিগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ধানের চারায় হলুদ রং ধরেছে। কোনো কোনো বীজতলার চারা মরে ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে। নিস্তব্ধ গ্রামের ঘরে ঘরে হাহাকারের দীর্ঘশ্বাস, আমাদের জমিগুলো যারা বর্গাচাষ করতো তাদের অনেকেই মারা গেছে। চাষাবাদ না হওয়ায় সে বছর আমাদের গোলায় একটিও ধান ওঠেনি। ঐ বছরে আমাদের পরিবারও বেশ টানাটানি করে অভাব অনটনের মাঝে চলেছে। তখন আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এসব গরীব কৃষকদের কাছে বিত্তবানরা কতটুকু মুখাপেক্ষী। তাদের ঘাম ঝরা শ্রম ছাড়া আমাদের ভাগ্যে রিজিক জোটে না। তবু বাস্তবতা হচ্ছে- শ্রমজীবী গরীবেরা আমাদের চরম অবহেলার পাত্র।
রহম আলীর বাবা আমাদের জমিগুলো বৃহৎভাগের বর্গাচাষী ছিল। বিকালে ধান মাড়াই করার সময় তার বাবার সাথে রহম আলী আসতো। তার সাথে অনেক খেলাধূলা করেছি। বিশেষ করে ধান কাটার ঋতুতে বিকেলে উঠানে যখন ধান মাড়াই হত তখন রহম আলীকে ছাড়া আমার খেলার কথা ভাবাই যেতো না। মধ্যাহ্নের খাবারের পর আকুল মনে তারই অপেক্ষায় বসে থাকতাম। সেই রহম আলী আমার কাছে অন্যায় কিছু কামনা করেনি। আমার কাছে সামান্য সৌজন্য আচরণ চেয়েছিল। যা মানুষ মানুষের কাছে নির্দ্বিধায় পেয়ে থাকে। অহংকারের কাছে আমি পরাজিত হয়েছিলাম। তার সাথে পশুত্বের ব্যবহার করেছি। রহম আলী কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়ে অপমানিত হয়েও মনুষ্যত্বের আদালতে জিতে গেছে।
রহম আলীর মনে যে আঘাত দিয়েছি তার স্থায়িত্ব কতটুকু তার পরিমাপ অনুমান করতে পারছি না। তবে সে আঘাতের কষ্ঠে যে চেহারা নীলাভ হয়ে গিয়েছিল এবং অন্তরে রক্তক্ষরণ হয়েছিল সেটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি। রহম আলীর প্রতি এ অন্যায়ের ভীত খুঁজতে পেয়ে যাই সহজে। তার বাবা বশির আলীকে বরাবরই আমার বাবার পা ধরে সালাম করতে দেখেছি। রহম আলীকেও তার বাবা শিখিয়ে দিয়েছে গুরুজন মুরব্বীদের পায়ে সালাম করতে হয় কীভাবে। রহম আলী অনুগত সন্তানের মত আমার বাবাকে গুরুজন ভেবে পা ধরে সালাম করতো। কিন্তু আমার বাবা সে শিক্ষা কখনোই আমাকে দেননি। তাই আমি গুরুজন বৃদ্ধ বশির আলীর পা ছুঁয়ে কখনো সালাম করিনি। বরং আমি যখন অনেক বড় হয়ে আমাদের জমিগুলো দেখাশুনার দায়িত্ব পাই তখন বৃদ্ধ বশির আলী আমার পা ছুঁয়ে সালাম করত। আমি তার ছেলের বয়সী হয়েও তাকে বাঁধা দেইনি। বশির আলীর মতো আরো অনেক বয়স্ক পুরনো বর্গাচাষী আমার পা ছুঁয়ে সালাম করত। আমি কাউকেও মানা করিনি।
গ্রামের গোরস্থানে বাবার কবর জিয়ারত শেষ করে গোরস্থানের গেটে আসতেই রহম আলীর সম্মুখে পড়লাম। সেও গোরস্থানে ঢুকতে যাচ্ছিল। তার বাবা ও অন্যান্যদের কবর জিয়ারত করবে সে। রহম আলী আমাকে সালাম দিয়ে তার হাত দু’খানা সামনের দিকে বাড়িয়ে আমার হাতের কাছাকাছি নিয়ে এলো। আমি বিদ্যুৎ গতিতে আমার হাত দু’খানা সরিয়ে নিলাম। সে হাত মিলাতে ব্যর্থ হয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কোলাকুলি করার জন্য এগিয়ে এলো। আমি একটু সরে যেতে যেতে চার পাশে চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম আশেপাশের সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার কেন জানি মনে হলো-সকলেই বড় বড় চোখ করে গভীর মনোযোগে আমার আকষ্মিক আচরণকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করছে। তাদের কাছে এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি হালকা করতে রহম আলীর উদ্দেশ্যে আমার ডান হাত ও বুকের দিকে ইঙ্গিত করে বললাম আমার হাত ও বুকে খুব ব্যাথা। রহম আলী আগেই হতোদ্যম হয়েছিল। এবার উজ্জ্বল শ্যামলা মুখ দেখে আষাঢ়ের ঘন মেঘ ভর করলো। তার অন্তরে কালবৈশাখীর ধমকা বাতাস বইতে থাকলো। আমি মনে মনে প্রতিশোধের মোক্ষম অস্ত্র সফল ব্যবহারে তৃপ্তির হাসি গোপন করতে করতে বাড়ির দিকে চললাম।
গোরস্থানে এলে মানুষের মন কোমল হয়। কবরবাসীর পরিণতি দেখে দুনিয়ার লোভ লালসা প্রশমিত হয়। অথচ গোরস্থানের দোরগোড়াতেই আমার পশুত্বের অবয়ব অকষ্মাৎ প্রকাশ হওয়ায় একটুও বিচলিত হইনা। বুঝতে পারি অঢেল বিত্ত বৈভব হৃদয়কে কবেই পাথর করে রেখেছে। এলাকায় এককালে যারা স্বচ্ছল ছিল এখন দরিদ্রতায় ডুবেছে এবং আমাদের বাপ দাদার মতো যারা ধীরে ধীরে সম্পদশালী হয়েছে কেবল সে সব পরিবারের মানুষদের সাথে আমি কোলাকুলি করে থাকি।
আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে নানান ভাবনায় ডুব দেই। ডাক্তার বলেছেন আমার রোগটা বেশ জটিল। ব্রেন স্ট্রোক জনিত প্যারালাইসিস। ডাক্তারের কথা শুনে আৎকে উঠি। কেঁপে ওঠে হৃদপিন্ড। ঝড়ের কবলে পড়া পাখির মতো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজি। চার দিকে বিপদের ভয়ঙ্কর সুর বেজে উঠে। আমার এক জ্ঞাতি ভাইয়ের প্যারালাইসিস ছিল। তার জীবনের দুর্ভোগ দূর্দশা দু’ চোখে জীবন্ত চিত্রে রূপ নেয়, তার মুমূর্ষু অবস্থার স্বরূপে নিজেকে কল্পনা করি। একবার মিলিয়ে দেখে কল্পিত যাতনার আর্তনাদে বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে থাকি ভয়ঙ্কর ভাবে। আমার ডানপাশ হাত পা সমেত যেন অবশ হয়ে আছে। শুধু বাম হাত ও পা দিয়ে কিছু করার চেষ্টা যুদ্ধের মতো কষ্ঠসাধ্য। সেই যুদ্ধের মাঠে যখন ক্লান্ত শ্রান্ত তখনই ঘটে শারীরিক অবনতির চরম অবস্থা। অন্যের বিরক্তি ও ঘৃণা মিশ্রিত সাহায্য নেওয়াটাও তিক্ততার প্রান্তে পৌঁছে। বিছানায় মল-মূত্র করার মাঝেই দিন অতিবাহিত হয়। অসহ্য বিকট দুর্গন্ধ ঘর ছাপিয়ে সমস্ত বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। আপন নাকও তুলো দিয়ে বন্ধ করতে বাধ্য হতে হয়, এর মাঝে কাটে জীবন। এরই মাঝে মত্যুর প্রতীক্ষা। যত তাড়াতাড়ি আজরাঈল এসে জান উপড়ে নেয় ততোই ভালো।
এসব বাস্তবতা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে। আমার দৃষ্টিগোচরে কেবল তিনটি রাস্তা। প্রথমত: প্যারালাইসিস জীবন গ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত: আত্মহত্যা করা। তৃতীয়ত: রহম আলীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ এখন রহম আলীর পক্ষেই আছেন। আমার গভীর বিশ্বাস, রহম আলী ক্ষমা না করলে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন না। আমার আরোগ্য লাভের প্রার্থনা তিনি শুনবেন না। আমার সব সম্পত্তির বিনিময়েও আমি মুক্তি পাব না। নীরবে অবলোকন করে দেখি, আমার সন্তানদের চোখে মুখে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা আর অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট। কাকুতি মিনতির সাথে ডাক্তারদেরকে অনুরোধ করা ছাড়া তাদের কিছুই যেন করার নেই। আমার জন্য চোখের পানি ঝরিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করার কথা তাদেরকে বলতে সাহস ও ভরসা পাচ্ছিনা। কেননা আমি সক্ষম অবস্থায় সে রকম যোগ্য করে তাদের গড়ে তোলার চেষ্টা করিনি। সর্বদিকে নিরাশ আমি রহম আলীর পদধ্বনির আশায় উন্মুখ হয়ে হাসপাতালের বেডে ছটফট করতে থাকি। রহম আলী তুমি কি শুধু একটিবার আসবে? নাকি প্যারালাইসিস জীবন বা আত্মহননের পথ, কোনটি আমি বেছে নেব?
রহম আলী, রহম আলী জপমালা আমার দু’চোখের কোণে নোনা জলের মাঝে গড়াতে থাকে। আমি একবার ফাঁকা দরজার দিকে, একবার জানালা দিয়ে ধূসর আকাশের দিকে আশা নিরাশার রথে চড়ে দুলতে থাকি। ঝাপসা হতে থাকে দৃষ্টি, রহম আলী আর আসেনা!
লেখক ও সমাজ কর্মী




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft