রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১
মতামত
আদর্শের মিশ্রপ্রতিক্রিয়া
মাহমুদা রিনি
Published : Sunday, 8 November, 2020 at 1:25 AM
আদর্শের মিশ্রপ্রতিক্রিয়া  সংবাদ পত্রের পাতায় চোখ রাখি অথবা টেলিভিশনের সংবাদ শুনি খবর একটাই, একের পর এক চলছে মানবাধিকার লঙ্ঘন, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি। এত আন্দোলন, প্রতিবাদ, মিছিল, মিটিং, সমাবেশ। এমনকি সরকারের কঠোর ভূমিকাকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জনসাধারণের নাকের ডগায় বসে কিছু বেপরোয়া মানুষ এই বিশৃঙ্খলা গুলো চালিয়ে যাচ্ছে। কথা গুলো যে আমি বলছি এমন না, সংবাদ পত্রে চোখ বুলালেই আমরা তা দেখতে পাই। শিউরে উঠি, অথচ কতটা আশঙ্কায় থাকি সেটা প্রকাশ করতে পারি না। প্রকাশ করা যায়ও না। সংবাদ দেখতে ভয় পাই। কাকের চোখ বুজে ডিম লুকিয়ে রাখার মত চোখ বন্ধ করে থাকি ভয়াবহতা থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য।
নারীর প্রতি অবমাননা, ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি এগুলো ছাড়া অন্য যে কোন অপরাধের বেলায় তবু জনসাধারণ অনেকটা সোচ্চার। পাড়ার মোড়ের দোকানে পাউরুটি চোর ধরা পড়লে সোল্লাসে চোর মারার প্রতিযোগিতা চলে। রেনুর মতো মেয়েকে ছেলে ধরার অপবাদে গণপিটুনির শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হলো। পান থেকে চুন খসলে একশ্রেণীর মানুষ হৈহৈ রৈরৈ বাধিয়ে বসে। মসজিদে একজন মানুষ নামাজ পড়লো, তারপর অনিচ্ছাকৃত কোন ভুলের কারণে শিক্ষিত একজন ধর্মপ্রাণ মানুষকে একশ্রেণির ইজারাদারের গণপিটুনির শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হলো। লাশটাও তার পরিবার পেলো না, পুড়িয়ে ফেলা হলো। এতই প্রতিবাদের তীব্রতা। অথচ এই সমাজেই ঘরে ঘরে নারী নির্যাতিত, পথে ঘাটে নারী হয়রানির শিকার। সারাদেশে প্রতিদিন তিন-চার জন করে ধর্ষিত, বয়সের কোন বাছবিচার নেই। শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউ নিরাপদ নয়। নারী ছাড়া ছেলে শিশুরাও একধরণের যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে প্রায়ই শোনা যায়, সে বিষয়ে তো সকলের মুখে কুলুপ আঁটা। যুগ যুগ ধরে এই ভয়াবহ অনাচার হয়ে আসছে। অথচ সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের কোন হেলদোল নেই। দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নারী সংগঠনগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে গলা ফাটায়, প্রতিবাদ করে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের চোখেই অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা। এ যেন হতেই পারে, হওয়াটাই স্বাভাবিক এমন একটা ভাবে সবাই এড়িয়ে চলে।
নারী তো! ওদের আবার সম্মান কি! অধস্তন নাগরিক, মানুষের সমকক্ষ তো নয়, তাই ওদের অপমানে, অসম্মানে সামাজের ভিতর প্রতিবাদ ওঠে না। প্রতিবাদ করবেই বা কারা! নারী তো সর্বত্র প্রতিবাদের জায়গায় নেই। বাড়ির বউকে পিটিয়ে মেরে ফেললে বা পুড়িয়ে মারলেও প্রতিবেশী বা গ্রামের মানুষ প্রতিবাদ করে না। যেন বউ মারা জায়েজ। স্কুলগামী মেয়েটিকে বাজে কথা বা টিটকারি করাই যায়। আসেপাশের মানুষ তখন টু শব্দটি করে না। এরাই যখন গরু চোরকে গণপিটুনি দেয় তখন অবাক লাগে। মেয়ে মানুষ গরুর থেকেও অধম এক শ্রেণির নাম। বেশ কিছু দিন ধরে সংসারের প্রয়োজনেই নারী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে কাজ করতে যাচ্ছে। সরকারই যাবার ব্যবস্থা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আর যাচ্ছেও এমন সব দেশে-- যারা বড়ো বড়ো ঈমানের ধ্বজাধারী আশরাফুল মখলুকাত। পরিণতি আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। হাজার হাজার নারী অমানবিক, অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হয় মস্তিষ্ক বিকৃত অথবা লাশ হয়ে দেশে ফিরে আসছে। নির্যাতনের ধরণ দেখলে বা শুনলে গা শিউরে ওঠে। এত বড় অমানবিক ঘটনার প্রতিবাদে আমাদের প্রতিবাদী জনতার কাওকে নড়াচড়া করতে, এমনকি মুখে কিছু বলতেও শুনলাম না। সেই ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো সাংস্কৃতিক ও নারী সংগঠনগুলো যা চিল্লাচিল্লি করে।
আমি বিশ্বাস করি মানুষ যদি নীতিগতভাবে নিজের জায়গায় সচেতন হতো, দেশে সঠিক, সুষ্ঠু এবং দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা থাকতো, সামাজিকভাবে প্রতিটি অন্যায়ের প্রতিবাদ হতো, তাহলে অনেক অপরাধই অঙ্কুরেই বিনষ্ট করা সম্ভব হতো। সচেতন হতে কোন প্লাটফর্ম লাগে না। কবি সুফিয়া কামাল বলতেন ‘তোমার সচেতনতায় তুমি একাই একটা সংগঠন।’ আদর্শকে ধারণ করলে যে কোন জায়গা থেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা যায়। সেই প্রতিবাদ যে সবসময় মারামারি করতে হবে এমন তো নয়, ঠান্ডা মাথায়ও অনেককিছু করা যায়। পাশের বাড়ির বউকে পেটাচ্ছে, এটা যে অপরাধ, এটুকু আমি বলতেই পারি। কিন্তু কেউ আমরা তা বলি না। ঘরে, পথে, রাস্তায় সর্বত্রই এমনটা ঘটে। অথচ আমরা শিক্ষিত, আদর্শবাদী মানুষ কিছুই দেখি না। কোন আদর্শে যে নারীকে ছোট করা যায় আমার ক্ষুদ্র মাথায় তা কিছুতেই ঢোকে না। এত প্রতিবাদী যে সমাজ সেই সমাজে মা, বোনেরা নিপিড়ীত হয়, নারী নির্যাতন চলমান থাকে কিভাবে? আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না তেমন তো নয়! পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঘা লাগলে, ব্যক্তিস্বার্থে টান পড়লে, ইহকাল তো বটেই পরকালের শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও আমরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ি। শুধুমাত্র নারীর বেলায় এত প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর নিশ্চুপ কেন? নারীর থেকে সবটুকু সুবিধা নিতে হবে, সংসারে তাকে উদয়াস্ত পরিশ্রম করতে হবে, তার জীবনের সবটুকু কষ্টার্জিত সাফল্য পুরুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে, আর সেই নারীকেই অপদস্ত হতে হবে রাস্তাঘাটে, সংসারে। তার চরমতম দুঃসময়ে কেউ সাহায্যের হাত বাড়াবে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না। যদি ধর্ষিত হয়ে মৃত্যুবরণও করে তখনও মুখ টিপে হাসবে আর তার শরীরে কাপড় ঠিকমত ছিল কি ছিল না, থাকলে কতটুকু ছিল তাই নিয়ে গবেষণা করবে। নারীকে নিয়ে সমালোচনা করা, কটুক্তি করা একশ্রেণীর মানুষের কাছে উপাদেয় বিষয়। তারাই আবার বড় বড় জবানে আদর্শবাদের ঝড় তোলে। সভ্য সমাজে এই মিশ্র আদর্শবাদীতা কোন ভাবেই আমাদের বোধগম্য হয় না।     



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft