শনিবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২১
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল
অধ্যক্ষ পদে জামায়াত নেতার নিয়োগ নিয়ে শ্যামনগরে নানান গুঞ্জন
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি :
Published : Monday, 16 November, 2020 at 4:04 PM
অধ্যক্ষ পদে জামায়াত নেতার নিয়োগ নিয়ে শ্যামনগরে নানান গুঞ্জন
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আতরজান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ পদে এক জামায়াত নেতাকে নিয়োগ দেয়ার তৎপরতা শুরু চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পদ-পদবীতে না থেকেও নিয়মিত জামায়াত ইসলামীর তহবীল গঠনে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিকে অধ্যক্ষ করতে খোদ পরিচালনা পর্ষদ মূখ্য ভূমিকা রাখছে বলেও অভিযোগ।
এদিকে পরিচালনা পর্ষদের আস্থাভাজন জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলে উপজেলা যুবলীগ তা প্রতিহতের ঘোষনা দিয়েছে বলে জানা গেছে।  আওয়ামী লীগ নেতাসহ সূধীমহলের দাবি স্বাধীনতা বিরোধী চেতনায় বিশ্বাসী কেউ অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেলে তা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।

জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার আতরজান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়ার জন্য সম্প্রতি বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে। ৩০ জুন ২০১৬ সালে জনাব আশেক-ই এলাহী অবসরে যাওয়ার পর থেকে উপজেলার নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ পদ শুন্য। অন্তবর্তী এ সময়ের জন্য প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষ জনাব আমির হোসেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন।
অভিযোগ পরিচালনা পর্ষদের প্রিয়ভাজন হওয়াতে জামায়াত এর রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বর্তমান উপাধ্যক্ষ আমির হোসেনকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়া প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তাকে পুনর্বাসন করার দুরভীসন্ধির অংশ হিসেবে ইতিপুর্বে অধ্যক্ষ পদের জন্য নিয়োগ বোর্ড কতৃক মনোনীত আ ক ম মিজানুর রহমানের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে শৃঙ্খলা ও বিধি লংঘন করে উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের নির্দেশনা মেনে তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ তাকে চাকুরীচ্যুত করে। এক পর্যায়ে উচ্চ আদালতে সে নির্দেশ স্থগিত হলে তিনি চাকুরীতে যোগদান করেন। অদ্যাবধি বিচারাধীন বিষয়টির কোন সুরাহা না হওয়ার পাশাপাশি নানা বিতর্কে জড়িত জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়ার ম্যধমে জামায়াত-বিএনপির এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে যাওয়া আমির হোসেন এখনও জামায়াত নেতাদের সাথে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং নিয়মিত জামায়াতের সাংগঠনিক কাজে অর্থ সহায়তা দেন বলেও অভিযোগ। তার মত বিতর্কিত ব্যক্তিকে অধ্যক্ষ নিয়োগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমৃুর্তি সংকটে পড়বে এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি আবারও মাথাচড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে বলেও অনেকের অভিমত।

অভিযোগ উঠেছে উপাধ্যক্ষ থেকে অধ্যক্ষের দায়িত্বে যাওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত আমির হোসেন এর উপাধ্যক্ষ পদের নিয়োগই বৈধ ছিল না। নীতিমালা অনুযায়ী কাউকে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে হলে ন্যুনতম ১২ বছরের অভিজ্ঞতার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু আমির হোসেন ১৯৯৮ সালে প্রভাষক হিসেবে কলেজে যোগদানের মাত্র দুই বছরের মধ্যে ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি প্রাপ্তির মত করে উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব লাভ করেন।
কেবলমাত্র পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ আর তৎকালীন জামায়াত সংসদ সদস্যের আশির্বাদপুষ্ট হওয়ায় জৈষ্ঠ্য অনেক শিক্ষককে ডিঙিয়ে জামায়াত ইসলামীর ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত আমির হোসেনকে উপাধ্যক্ষ করা হয়। আবার তৎকালীন জামায়াত দলীয় সাংসদসহ জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুল বারীর ঘনিষ্ট সহচর হিসেবে সর্বমহলে বিশেষ পরিচিতি সত্ত্বেও আমির হোসেনের অগ্রযাত্রায় সেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে না বলেও অভিযোগ।

কাটুনিয়া রাজবাড়ী কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল ওহাব অভিযোগ করেন, আমির হোসেন শুরু থেকে জামায়াত এর রাজনীতির সাথে যুক্ত। কৌশলী আমির হোসেন পদ-পদবী না নিলেও স্বাধীনতা বিরোধী ঐ সংগঠনের নীতি নির্ধারকদের একজন হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করতেন। তার তিন বছর পরে কৃষি শিক্ষক হিসেবে আতরজান কলেজে যোগদান করেও মাত্র দুই বছরের মধ্যে উপাধক্ষের দায়িত্ব পান। এসময় বিষয়টি রীতিমত সমালোচনা সৃষ্টি করলেও পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের সাথে সমঝোতার পর বিধিবহির্ভুত বিষয়টি ‘জায়েয’ হয়ে যায়।
তিনি আরো অভিযোগ করেন, জামায়াতপন্থী আমির হোসেন উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেয়ে আওয়ামীলীগ ঘরানার শিক্ষকদের সাথে কারনে অকারনে দুর্ব্যবহার করতেন। এছাড়া জামায়াত দলীয় সাংসদের হস্তক্ষেপে স্পষ্টত বিধির লংঘন ঘটিয়ে ২০০২ সাল থেকে পরিচালনা পর্ষদের সভায় তিনি নিয়মিত অংশ গ্রহন করতেন।

আতরজান কলেজে চাকুরী শুরু করা আব্দুল ওহাবের দাবি ভিন্ন রাজনৈতিক মতের প্রভাষক আজিজের সাথে দুর্ব্যবহারের কারনে আমির হোসেনের বিরুদ্ধে অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ হয়। এক পর্যায়ে ঐ অভিযোগ জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এর দপ্তরে যাওয়ার পর তার উপাধ্যক্ষ পদের নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশনা দেয়া হয়।
আমির হোসেন জমায়াত এর প্রোডাক্ট -উল্লেখ করে নওয়াবেঁকী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জুলফিকার আল মেহেদী বলেন, সে জামায়াত এর রাজনীতির সাথে যুক্ত বলেই গত বার বছরে আওয়ামীলীগের কোন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি। বিপরীতে বিএনপি-জামায়াতের সময় তৎকালীন সরকার দলীয় রাজনীতিকদের সাথে তার সখ্যতা ছিল ওপেন সিক্রেট।

ছাত্রলীগের সাবেক এ নেতার দাবি ২০০৩ সালের ২৪ অক্টোবর দৈনিক কাফেলা পত্রিকায় তাদের রাজনীতির প্রতি আস্থাশীল শিক্ষকদের সাথে জামায়াত ইসলামীর একটি সভা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। শ্যামনগর উপজেলা জামায়াত ইসলামীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় বক্তব্য দানসহ সংগঠনটির প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে নেতৃবৃন্দের অন্যতম আস্থাভাজনের স্বীকৃতি আদায় করেন তিনি। কখনও কোন পদে নাম না লেখালেও আমির হোসেন দিব্যি জামাযাত এর রাজনীতি চর্চা চালিয়ে গেছেন জানিয়ে অধ্যক্ষ জুলফিকার আল মেহেদী বলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাথে তাকে কখনও দেখা যায়নি। বরং সে সবসময় জাময়াত এর রাজনীতি করা মানুষের সাথে মেশে।

মঞ্জুর এলাহী খোকন নিজেকে উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি পরিচয় দিয়ে বলেন, আমির হোসেন জামায়াত ইসলামীর একজন বড় নেতা। সে জামায়াতের সাংগঠনিক কর্মকান্ডে অন্যতম অর্থ যোগানদাতা। এখনও জামায়াতের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি টাকা পয়সা দেয়-উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমির হোসেনকে অধ্যক্ষ করা হলে তা আত্মঘাতি কাজ হবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার মত মানুষকে এমন গুরুত্বপুনৃ পদে দেয়া ভুল হবে।

প্রভাষক অলিউর রহমান বলেন, অতিশয় কৌশলী জামায়াত নেতা আমির হোসেন। তিনি স্থানীয় আওয়ামীলীগের একাংশের সাথে বিশেষ সখ্যতার সুযোগ নিয়ে বিধি লংঘন করে উপাধ্যক্ষ হয়েছেন। নিজেকে সব সময় মামলা মোকদ্দমা থেকে দুরে রাখতেও সমর্থ হয়েছে। তবে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার কারনে সর্বশেষ ২০১৮ সালে তিনি দুইটা নাশকতা মামলায় আসামীভুক্ত হন।
প্রভাষক মোশারফ হোসেন বলেন, সম্প্রতি অধ্যক্ষ পদে একটি নিয়োগ বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে আমির হোসেনকে উক্ত পদে নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে। অথচ এর আগে বৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া আ ক ম মিজানুর রহমানকে নিয়োগ বঞ্চিত করা হয় শুধুমাত্র জামায়াত নেতা আমির হোসেনকে সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

তিনি দাবি করেন, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলাম ও আব্দুল বারীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আমির হোসেন অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বলে দাবি করেন উপজেলা আওয়ামীলীগের এ যুগ্ম-সাধারন সম্পাদক।
শ্যামনগর উপজেলা যুবলীগ সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, আমির হোসেন দেশবিরোধী শক্তির প্রতিনিধি। তিনি অধ্যক্ষ হলে দেশবিরোধী চর্চা চলবে ঐ প্রতিষ্ঠানে। তাকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়া হলে দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে তার নিয়োগ প্রতিহত করা হবে।

অভিযোগের বিষয়ে উপাধ্যক্ষ আমির হোসেন বলেন, পরিস্থিতির শিকার হয়ে এক সময়ে কিছু মানুষের সাথে মিশতে হলেও আমি কখনই কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলাম না। কেউ তার প্রমান দিতে পারবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বলেই মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের প্রতিষ্ঠিত কলেজের উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব দীর্ঘ সময় ধরে পালন করে চলেছি। তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ মিথ্যা বলেও তিনি দাবি করেন। ‘ম্যানেজ’ নয় বরং যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে তিনি অধ্যক্ষের পদের জন্য আবেদন করেছেন বলেও জানান।




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft