মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০
মতামত
স্বভাব বংশগত নাকি পরিবেশগত?
মিজানুর রহমান
Published : Tuesday, 17 November, 2020 at 11:04 PM
স্বভাব বংশগত নাকি পরিবেশগত? অনেক কিছুই আবিষ্কার বা উন্মোচিত হচ্ছে বিজ্ঞানের বদৌলতে, কিন্তু মানবপ্রকৃতি সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে। অদ্ভুত ও রহস্যময় হচ্ছে মানবপ্রকৃতি। চেহারায় মানুষের যেমন ভিন্নতা রয়েছে, তেমনি স্বভাব ও আচরণের দিক থেকেও আমরা মানুষেরা একে অপরের চেয়ে আলাদা। নানান স্বভাবের মানুষ আমাদের চারপাশে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে যদি আমাদের নিজস্ব স্বভাব পর্যালোচনা করি, তবে তা অবশ্যই অবাক হবার মতো। প্রত্যেক মানুষ অন্তত একশ’টি আলাদা স্বভাব ধারণ করে আছেন তার জীবদ্দশায়। পুরানো স্বভাব যেমন থেকেই যায় আমাদের মনের অবচেতনে, তেমনি নতুন নতুন স্বভাব বা আচরণও আমরা প্রতিদিন আয়ত্ত করি। এভাবে আমরা দৈনন্দিন নানা স্বভাব বা আচরণে অভ্যস্ত হয়ে যাই। ফলে আমরা আমাদের মনের অজান্তেই ‘স্বভাবসুলভ’ আচরণ করি। বর্তমান সময়ে মনোবিজ্ঞানের বিশাল ক্ষেত্রে মানব স্বভাব ও আচরণের বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
মানুষের আচরণ ও স্বভাব নিয়ে মনোবিজ্ঞানে দুই ধরনের আলোচনা আছে। এক পক্ষের মত হচ্ছে মানুষের আচার-ব্যবহার, স্বভাব-চরিত্র, তার দৈহিক গঠন, বৃদ্ধি ও বিকাশে বংশগতির প্রভাব দায়ী। অন্য পক্ষ বলছেন এক্ষেত্রে পরিবেশের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। আবার কেউ কেউ উভয় প্রভাবকেই আমলে নিয়েছেন।
১৯৬৯ সালে বিখ্যাত সমাজ-মনোবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস গ্যাল্টন এক গবেষণার মাধ্যমে এ বিষয়ে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, মানব বিকাশ একমাত্র বংশগতির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। আবার মানব বিকাশে পরিবেশের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। বংশগতিবাদীরা মনে করেন, মানব আচরণে প্রভাব বিস্তারকারী মূল এবং একমাত্র শক্তি হলো বংশগতি অর্থাৎ উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জৈবিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য। এদিকে পরিবেশবাদীরা মনে করেন, মানব বিকাশে প্রভাব বিস্তারকারী মূল এবং একমাত্র উপাদান হলো পরিবেশ। মানব আচরণে প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান দুটির প্রাধ্যান্য নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়, যা বংশগতি ও পরিবেশ বিতর্ক নামে পরিচিত। তবে আধুনিক সময়ে মনোবিজ্ঞানীরা এই মত পোষণ করেন যে, মানববিকাশ ও আচরণে বংশগতি ও পরিবেশের একক ফল নয়। এটা হচ্ছে বংশগতি ও পরিবেশের সম্মিলিত ক্রিয়ার ফল।
মানব স্বভাব ও আচরণে ফ্রান্সিস গ্যাল্টনের মতের সূত্র ধরে নিউইয়র্ক কারাগারের এক কর্মকর্তা আর.এল. ডাগডেল জেলখানার অপরাধীদের পর্যবেক্ষণে বংশগতির প্রভাব লক্ষ্য করেন। তিনি একটি পরিবারের ইতিহাস পর্যালোচনা করে বংশগতির পক্ষে তার মত প্রকাশ করেন। ডাগডেল ওই পরিবারের একজন খারাপ লোকের সূত্র ধরে তার পাঁচ পুরুষের মোট ১ হাজার ৬৬৭ জনের তথ্য খুঁজে বের করেন। সেই তথ্যানুযায়ী ওই পরিবারের অধিকাংশ মানুষই সমাজবিরোধী আচরণের কারণে অভিযুক্ত ছিলেন। আমেরিকার জুলিয়ানা গর্ডার নামে এক মনোবিজ্ঞানী মার্টিন কালিকক নামের এক ব্যক্তির পারিবারিক ইতিহাস পর্যালোচনা করেন। তিনি দেখতে পান, মার্টিন কালিককের দু’জন স্ত্রীর মধ্যে একজন ছিলেন বুদ্ধিমতী অন্যজন স্বল্প বুদ্ধির। বুদ্ধিমতী স্ত্রীর বংশে জন্ম নেওয়া ৪৯৬ জনের মধ্যে প্রায় প্রত্যেকেরই স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা, সদাচরণ, সুস্বভাব ও নৈতিকতা সম্পন্ন হয়েছে এবং জীবনের নিজ নিজ ক্ষেত্রে তারা প্রতিষ্ঠাও লাভ করেছে। অন্যদিকে কালিককের দ্বিতীয় স্ত্রী যে কিনা স্বল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ছিল, তার পরবর্তী প্রজন্মে ১৪৩ জন ক্ষীণ বুদ্ধিসম্পন্ন, ৪৬ জন স্বাভাবিক বুদ্ধির, ৩৬ জনের অবৈধ সন্তান, ৩৩ জন গনিকা, ২৪ জন মাদকাসক্ত, ৩ জন মৃগী রোগী, ৮২ জন বিভিন্ন যৌন রোগাক্রান্ত, ৩ জন সমাজবিরোধী এবং ৮ জন কুখ্যাত আসামি হয়েছিলো তাদের জীবনে।
আমেরিকার বিজ্ঞানী জন ব্রোডাস ওয়াটসন মানব বিকাশে বংশগতির চাইতে পরিবেশের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি শিশুদের কামারের গরম ধাতুর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, কামার যেমন গরম লোহার টুকরা তার হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে যে কোনো রূপ দিতে সক্ষম। তেমনি শিশুরা পিতামাতা ও অন্যদের প্রভাবে বিকশিত হতে থাকে। বংশগতি অনুসরণকারী বিজ্ঞানীদেরকে ওয়াটসন বলেন, ‘আমাকে একজন স্বাস্থ্যবান ও সুগঠিত শিশু দাও, আমি তাদের আমার বিশেষ জগতে লালন-পালন করব এবং ক্রমাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যে কোনো ধরনের বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলবো।’ ১৯০৬ সালে প্রকাশিত তার এক প্রবন্ধে তিনি প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, মানুষের বৈজ্ঞানিক চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ নির্ভর করে লোক বসতি, পরিবেশগত সুবিধা, আর্থিক সঙ্গতি এবং আর্দশ প্রতিষ্ঠানের ওপর।
মানবস্বভাব ও আচরণে বংশগতিবাদ ও পরিবেশবাদের বিতর্ক থেকে সৃষ্টি হয়েছে একটি আধুনিক মতবাদের। আধুনিক মতবাদে মানবস্বভাব ও আচরণে বংশগতি ও পরিবেশ উভয়েরই সমান গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞানী কার্ট স্টার্ন মানববিকাশে বংশগতি ও পরিবেশ উভয়ের প্রভাবকে প্রমাণ করতে গিয়ে ‘রাবার ব্যান্ড’-এর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বংশগতি রাবার ব্যান্ডের মতো, যার বিস্তৃত হওয়ার ক্ষমতা বেশি বা কমও হতে পারে। এক্ষেত্রে পরিবেশ সেই রাবার ব্যান্ডকে কতখানি টেনে লম্বা করতে পারে তার ওপর নির্ভর করবে মানবীয় বিকাশ।’ এই মতকে প্রতিষ্ঠা করেছেন মনোবিদ স্যান্ডিফোর্ড। তিনি বলেন, বংশগতি ও পরিবেশ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। মানুষের বংশগত সম্ভবনা থাকে তা বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন, ব্যক্তির সম্ভাবনার বিকাশ হবে কি হবে না কিংবা কতখানি হবে তা নির্ধারণ করবে পরিবেশ। মনোবিজ্ঞানী কার্নি ল্যানডিস এ বিষয়ে দিয়েছেন মজার তথ্য। তিনি বলেন, বংশগতি আমাদের মূলধন সরবরাহ করে আর পরিবেশ সেই মূলধনকে বিনিয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। সুতরাং মানব বিকাশে বংশগতি ও পরিবেশ উভয়ের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবেনা। মনোবিজ্ঞানী এল রাউচ চমৎকার বলেছেন, গধহ রং ধ ঢ়ৎড়ফঁপঃ ড়ভ যরং হধঃঁৎব ধহফ হঁৎঃঁৎব. অর্থাৎ মানুষ তার প্রকৃতি ও পরিচর্যা সৃষ্ট।
বিজ্ঞানের কথা হলো অনেক। এবার আমরা চোখ ফেরাই আমাদের চারপাশে। নানান স্বভাবের হাজারো মানুষ আমরা দেখি প্রতিদিন। মোটাদাগে ভালো মানুষ আর খারাপ মানুষ এই দুই ভাগে আমরা মানুষকে ভাগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। প্রচলিতভাবে যে মানুষটি সৎ, সত্যবাদী, অপরের বিপদে এগিয়ে আসেন, সুন্দর ব্যবহার করেন, তাকে আমরা ভালো মানুষ বলি। আর যে মানুষটি অসৎ, মিথ্যাবাদী, আবেগহীন, অন্যকে বিপদে ফেলে, খারাপ ব্যবহার করে তাকে আমরা খারাপ মানুষ বলি। মানুষ মাত্রই ভালো আর খারাপের মিলে এক প্রাণী। মানবআচরণবীদদের মতে মানুষের স্বভাব মোট পাঁচ ধরনের। এই পাঁচ ধরনের মধ্যে রয়েছে: নিষ্ক্রিয়, আক্রমণাত্মক, দৃঢ়প্রত্যয়ী, নিষ্ক্রিয়-আক্রমণাত্মক ও পরিবতর্নশীল স্বভাব।
দার্শনিক প্লেটো বলেছেন- ‘আকাঙ্খা, আবেগ এবং জ্ঞান- এই তিনটি বিষয়ই মানব স্বভাবের উৎস।’ প্লেটোর কথার সূত্র ধরেই বলতে হয়, মানব স্বভাব বা আচরণ জীবনব্যাপী পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণের মতো একটি বিষয়। মানবস্বভাব ও আচরণ মূলত নির্ভর করে তার পরিবার, সমাজ, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে। স্বভাবের ভিন্নতা সময়, স্থান ও সমাজভেদে কখনও গৃহীত হয় বা কখনও গৃহীত হয় না। সাধারণত মানুষের স্বভাব প্রায় একই রকম। কিছু স্বভাব আছে যেগুলো আমরা আমাদের অবচেতন মনে করে থাকি, অনেক আচরণ আমরা বুঝে শুনেই করে থাকি। আমাদের আচরণের ভালো দিকগুলো আমরা নিজেরা বুঝি। আর খারাপ দিকগুলো যারা বুঝি, তারা সেগুলো চাইলেই শোধরাতে পারি।
‘মিথ্যা’ বলা খারাপ স্বভাবগুলোর মধ্যে হয়তো প্রথম দিকেই থাকবে। মিথ্যা বলা যতটা সহজ মনে হয়, আদৌ কি ততটা সহজ? এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ প্রতিদিনের বলা কথার ত্রিশ শতাংশের বেশি মিথ্যা কথা বলতে পারে না। আর এই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা হয় অন্যের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে। মানুষের গড় স্বভাবের মধ্যে আরেকটি হচ্ছে হিংস্রতা। আমাদের অতীত বর্তমান পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, মানুষ সৃষ্টির আদি থেকেই জীবন রক্ষার খাতিরে হোক বা নিজ ইচ্ছা চরিতার্থের জন্য হোক, হিংস্রতা আমাদের জিনের মধ্যেই রয়েছে। পরিবার ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে হয়তো এই হিংস্রতা কারও কারও কম, কারও কারও বেশি। চুরি করা মানবস্বভাবের আরেকটি বিশেষ দিক। চুরির প্রবণতা কম-বেশি আমাদের সবার মধ্যেই রয়েছে। চুরির প্রবণতাও আমাদের জিনবাহী বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। একটি সুপার শপে আগত ৪৩ হাজার মানুষের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা যায় যে, ১১ শতাংশ মানুষ কিছু না কিছু চুরি করেছে। অনেকে চুরি করেছে প্রয়োজনে, আবার অনেকে চুরি করেছে, অপ্রয়োজনে। ‘প্রতারণা’ মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবের মধ্যে অন্যতম। একে অন্যের প্রতি প্রতারণাপূর্ণ আচরণ যেমন করি, তেমনি প্রতারণা করি আমরা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। ‘পরচর্চা’ মানুষের সাধারণ স্বভাবের মধ্যে অন্যতম। নিজেদের দোষ-গুণের আলোচনা বাদ দিয়ে আরেকজন মানুষকে নিয়ে আমরা আলোচনা করতে বেশি পছন্দ করি। যারা অন্যকে নিয়ে কারণহীন চর্চা করেন, তারা মূলত নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার করতেই এমনটা করে থাকেন বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। ‘খারাপ অভ্যাসের প্রতি ঝোঁক’ মানুষের আরেকটি সাধারণ স্বভাব। মানুষের কোনো কিছুর প্রতি যদি আসক্তি থেকে থাকে, তবে আমরা সেই আসক্তির পক্ষে নানা যুক্তি দেখিয়ে সেই অভ্যাসকে আঁকড়ে ধরে থাকি। ‘অন্যের ওপর মাস্তানি করা বা গুণ্ডামি’র প্রবণতাও আমাদের আরেকটি সাধারণ স্বভাব। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে যেমন অন্যের ওপর প্রভাব খাটানোর বিষয়টি দেখা যায়, তেমনি অযথা পেশিশক্তির ব্যবহার আমরা সমাজের সর্বস্তরেই দেখতে পাই। ‘জুয়া’র প্রবণতাও আমাদের সাধারণ স্বভাবের একটি অংশ। মানুষ জুয়া খেলতে বা জুয়ায় অংশ নিতে ভালোবাসে।
বাংলায় প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে, ‘ইল্লত যায় না ধুইলে, খাসলত যায় না মরলে।’ অর্থাৎ বলা হচ্ছে মনুষ্য স্বভাব প্রকৃতি অপরিবর্তনীয়। কিন্তু মানুষের স্বভাব অপরিবর্তনীয়-এ কথা বলা সঠিক হবে না। কারণ যুগে যুগে ভালো মানুষ বা মহা-মানবদের দর্শন ধারণ বা অনুসরণ করে মানুষ নিজেকে পাল্টিয়েছে। অসম্ভব হয়তো অনেক কিছুই আছে, তবে প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তির অধিকারী সৃষ্টির সেরা এই মানুষ চাইলেই পারে নেতিবাচক স্বভাবগুলোকে ইতিবাচকভাবে রূপান্তর করতে। যার ভুরি ভুরি উদাহরণ পৃথিবীতে রয়েছে।
লেখক ও সমাজকর্মী
ইমেইল : [email protected]outlook.com
(০১৭১১-৮৭৭০৮৭ শুধুমাত্র এসএমএস)




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft