মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১
মতামত
সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ
পন্ডিতের পাঠশালা
Published : Friday, 27 November, 2020 at 9:44 PM
সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠকথায় বলে, “যা আছে পিন্ডে তা আছে ব্রহ্মান্ডে”। তাহলে মনুষ্য দেহ (পিন্ড) ব্রহ্মান্ডের ক্ষুদ্র সংস্করণ  এটাই কুরুক্ষেত্র। এখানেই কুরু-পান্ডরে যুদ্ধ চলছে র্বদা। মানুষ দ্বিপদ জন্তু। ভাল আর মন্দ (সু আর কু) স্বভাব দ্বারা পরিচালিত। যারা কুপরামর্শ গ্রহণ করে তারা ‘কৌরব’ এবং যারা সুপরামর্শ গ্রহণ করে তারা ‘পান্ডব’। যারা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার অনুগত, তারাই তাঁর অনুগ্রহ পেয়ে জয়লাভ করে। এই পিন্ডেই সৈন্য-সামন্ত, সেনাপতি আর বীরযোদ্ধারা বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। সুবুদ্ধি পরিচালিত হয়ে কর্ম-যজ্ঞে (সংগ্রামে) সতত চেষ্টা চালাতে হবে। সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রচিত্তে যুদ্ধ করে গেলে, জয়লাভ অনিবার্য্য। সেনাপতির বুদ্ধিমত্তা এবং যুদ্ধ কৌশল জয়লাভের সহায়ক। উপযুক্ত সেনাপতি রাজার প্রিয়পাত্র হন। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতির কথাই মান্য করা হয়। ‘মন’ হল সেনাপতি, ‘আত্মা’ রাজা। মনের দ্বারাই দেহ পরিচালিত। মনেই স্বর্গ, মনেই নরক। মনেই সুখ, মনেই দুঃখ অনুভূত হয়। মন খারাপ হলে দেহ অচল হয়। মনোযোগ না দিলে কোন কার্যসিদ্ধ হয় না। মনের দ্বারাই ঈশ্বর অনুভূতি জাগে। মন সতত চঞ্চল এবং বহির্মুখী। সর্বাপেক্ষা দ্রুতগামী এই মনকে স্থির করতে সাধনা বা অভ্যাস প্রয়োজন।
এই মন দেহ খাঁচায় বসবাস করলেও খাঁচার অধীন নয়। ইন্দ্রিয় বন্ধুগণ কুপরামর্শ দেয়। আত্মার অনুগত প্রভুভক্ত মন বুদ্ধি প্রভাবে বীরের মত ইন্দ্রিয়রূপ অশ্বগুলোকে লাগাম ধরে সংযত করতে পারে। সুস্থ মনের অধিকারী দেহ, নিরোগ থাকে। নিরোগ দেহধারীকে সুস্বাস্থ্যবান বলা হয়। নিরোগ দেহধারী ধর্মপথে প্রফুল্লচিত্তে বিচরণ করেন। এই গৃহস্বামী মনেরও সুষম খাদ্যের প্রয়োজন। সংসারের সকল সদস্যকে সযত্নে লালন করে গৃহস্বামীর অনুগত করতে হবে। দেহযন্ত্রের পুষ্টির জন্য খাদ্য প্রয়োজন। নচেৎ হার্ট, লান্স, কিডনি, নার্ভ, গ্লান্ডস্্ অচল হয়ে যাবে। হজম শক্তি শিথিল হলে খাদ্যরস, পিত্তরস, হরমোন ক্ষরিত হবে না। প্রাণশক্তি নিরব হয়ে যাবে। সুস্থদেহ সুস্থ মনের অধিকারী ব্যক্তিরাই জগতে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করে যেতে পারেন। এজন্য মনস্থির, দৃঢ়চিত্ত হতে হবে। ব্রহ্মচর্য্য পালনে মনস্থির হয়, একাগ্রচিত্ত হয়। এই দেহে পরমাত্মার অবস্থান। তাঁকে খুঁজে বের করাই মানুষের কর্তব্য।
সেই অচিন পাখিকে খুঁজে বের করতে মনের সাহায্য নিতেই হবে। মনের একাগ্রতা ভিন্ন সাধন-মার্গে অগ্রসর হওয়া যায় না। এজন্য সাধক মাত্রেই ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন। ব্রহ্মচর্য্য পালনে অমিত শক্তি অর্জিত হয়। এই শক্তিকে ‘ওজঃ’ শক্তি বলে। দেহ মধ্যে ক্ষরিত এই সঞ্জীবনী সুধাকে ‘অমৃত রস’ বলে। এই অবস্থায় সাধক দিব্যদৃষ্টি লাভ করে জ্যোতির্ময়কে অনুভব করেন। যজুর্বেদে বলা হ’লঃ “ওজোহস্যোজো ময়ি ধেহি”- হে। ঈশ্বর তুমি ওজঃ (জীবনীশক্তি স্বরূপ), আমাদের ‘ওজস্বী’ কর। এই ওজঃশক্তি অর্জনে মানুষ মহাতেজস্বী হয়। এই ওজঃশক্তি অর্জন জন্য ব্রহ্মচর্য্য পালন একান্ত আবশ্যক।
ব্রহ্মচার্য্য পালন বৈদিক যুগের সনাতনী পদ্ধতি। ব্রহ্মচার্য্য ব্যাপক অর্থে ব্রহ্মে বিচরণ এবং সাধারণ অর্থে বীর্য্য ধারণ। বীর্য্য মহাবলশালী। মহাপুরুষেরা এবং ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসীগণ এই বীর্য্য ধারণে দেবতা পর্যায়ে উন্নীত হন। এজন্য ভক্তবৃন্দ তাদের চরণে নত হয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, “মন মুখ এক রাখাই সাধনা।” চঞ্চল মন বশে থাকে না। প্রবল ‘কাম’ তাকে পরাস্ত করে। এমনকি মহাপুরুষদেরও এই কামের প্রভাবে পদঙ্খলন হতে পারে। কামজয়ী হতে মনকে একমাত্র ঈশ্বরমুখী করে রাখতে হবে। একমাত্র সংযমী জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি মনকে বশে রাখতে সক্ষম। বীর্য ধারণে সেই শক্তি অর্জিত হয়। এজন্য সনাতনী পদ্ধতিতে সমাজ শাসনে, জীবনকে চারিটি অধ্যায়ে ভাগ করে বাল্য, যৌবন, প্রোঢ় এবং বৃদ্ধ বয়সের সময়োজিত কর্ম নিধারণ করে দিয়েছিলেন। পূর্বে সকলে কর্তব্যজ্ঞানে নিয়ম মেনে চলতেন। অধ্যায়গুলি যথাক্রমে ১) ব্রহ্মচর্য ২) গার্হস্থ্য ৩) বাণপ্রস্থ এবং ৪) সন্ন্যাস। বাল্য থেকে যৌবন আগত সময় অবধি বীর্য ধারণ। যৌবনে সংসারী হয়েও সংযত হয়ে কাম চরিতার্থ করতে হবে। বাণপ্রস্থে প্রতিটি কর্মে আসক্তিহীন এবং বৃদ্ধ বয়সে সর্বস্ব ত্যাগের মনোবৃত্তি অর্জন করা। সুনিয়ন্ত্রিত জীবন পদ্ধতি মেনে চলাটাই ব্রহ্মচর্য্য পালন।
শুক্র বা বীর্য কেন এত মূল্যবান। এজন্য দেহতত্ত্ব এবং শুক্র উৎপাদন প্রক্রিয়া বিষয়ে জ্ঞান আবশ্যক। এই শুক্র নবসৃষ্টি অর্থাৎ সুসন্তানের জন্ম দেয়। সভ্যতা অটুট থাকে। আদর্শ পিতা-মাতা সংযমী না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও অসংযমী হবে। বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে নারী-পুরুষের অবাধ মিলন। নারী স্বাধীনতা, নারী শিক্ষার প্রসারকল্পে কোটি কোটি টাকা অর্থ ব্যয়ে নারীদের নৈতিকতা বর্ধিত হচ্ছে না বরং নারীগণ উচ্ছৃঙ্খল হয়ে সংসারকে গ্লানিময় করে তুলছেন। কাম এবং যৌন প্রবৃত্তির কুফলে সমাজে দুরারোগ্য ব্যাধির প্রসার ঘটে চলেছে। “সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে।” সেই রমনী কুল ‘স্ত্রী-তন্ত্রের’ অধিকার আদায়ে ব্যস্ত। প্রাচীন সংযম রীতি বা ব্রহ্মচর্য্য পালন সম্পূর্ণ তিরোহিত। সংসার চক্র ভেঙে গেলে সভ্যতাই মুখ থুবড়ে পড়বে। প্রাচীন সমাজ নীতির চারিটি স্তম্ভই আজ চূর্ণ-বিচূর্ণ। কলিতে ধর্ম ‘একপাদ’ অর্থাৎ ব্রহ্মচর্য্য, বাণপ্রস্থ, সন্ন্যাস পালিত হয় না, কেবলমাত্র সংসার ধর্ম (গার্হস্থ্যনীতি) পালিত হয়। সেই একটি খুঁটি ভেঙে গেলে মানুষে আর পশুতে প্রভেদ থাকবে না। এজন্য মনুষ্য সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে ‘সংযম’ অবশ্য পালনীয়। সংযুমের অর্থ হচ্ছে ব্রহ্মচর্য্য পালন বা রেত-ধারণ। সাধনার মূল কথাই হচ্ছে “ধৃতবীর্য্য” হওয়া। ধৃতবীর্য্য ব্যক্তি মহাজ্ঞানী এবং মহাশক্তিধর হতে পারেন।
দেহতত্বেও সেই বিজ্ঞানটির যথাসাধ্য বর্ণনা দিতে চেষ্টা করব। স্রষ্টা হলেন অরূপের সমষ্টিভাব (ঈড়হপবহঃৎধঃবফ ভড়ৎস) এবং তাঁর সৃষ্টি হ’ল ব্যষ্টিভাব (উরংঃৎরনঁঃবফ ভড়ৎস). উপনিষদ বলছে “পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে”- পূর্ণ থেকে পূর্ণই হয়। ক্ষুদ্র পরমাণুতেও সেই ব্যষ্টি ও সমষ্টিভাব রয়েছে। যথা ঊষবপঃৎড়হ ও চৎড়ঃড়হ ভগবদ্্ সত্ত্বার স্থুল ও সূক্ষ্মভাব ঊহবৎমু এবং গধঃঃবৎ দ্বারা বিশ্বময় বিরাজিত। দেহকোষ স্থুলের ব্যষ্টিরূপ। দেহকোষস্থ শক্তি হচ্ছে সূক্ষ্মের ব্যষ্টিভাব। স্বয়ং আত্মা হচ্ছে সূক্ষ্মের সমষ্টিভাব। এজন্য এই পিন্ড বা দেহতত্ত্ব বিষয়ে অবগত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। জন্মান্তর বাদে আত্মা পুনরায় এই পঞ্চভূতকে আশ্রয় করে সমষ্টি ও ব্যষ্টির খেলায় মত্ত।
মানুষের দেহ গঠনের মূল উপাদান কয়েকটি কোষের সমন্বয়। শুক্রকোষ  এবং গর্ভকোষ মিলিত হয়ে ভ্রণে পরিণত হয়। এই ভ্রণ বহু প্রণালীর মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে মূল বস্তু ধংস এ পরিণত হতে ‘কোষভাঙ্গা’ প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকে পূর্ণ থেকে পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়ে একটি পরিপূর্ণ দেহে পরিণত হয়। কোষ রহস্যে ধংস হচ্ছে ‘ব্যষ্টি’ রূপ এবং  হচ্ছে ‘সমষ্টি’ রূপ।
মাতৃগর্ভে এই শুক্রাণু ও অন্ডাণুর মিলন প্রক্রিয়ার মূল শক্তি ‘বায়ু’। এজন্য আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বায়ুকে মূলত পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন (ক) প্রাণ (খ) অপান (গ) উদান (ঘ) সমান ও (ঙ) ব্যান। এগুলির সূক্ষ্ম বিভাগ নাগ, কুর্ম, কৃকর, দেবদত্ত ও ধনঞ্জয়। স্থুল বিভাগের পঞ্চ বায়ুকে ‘পঞ্চপ্রাণ বায়ু’ বলা হয়। এগুলির অবস্থান যথাক্রমে- প্রাণ-হৃদয়ে অপান-তলপেটে, সমান-নাভিতে উদান-কন্ঠে এবং ব্যান-মস্তিস্কে। মৃত্যু হলে লোকে বলে ঐ ব্যক্তির প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। ব্রাহ্মণগণ অন্ন গ্রহণের পূর্বে এই পঞ্চ বায়ুকে উৎসর্গ করে জল গন্ডুস খেয়ে আহার শুরু করেন। ধর্মীয় অনুশাসনে দেহরক্ষা পদ্ধতি সনাতন রীতি। (চলবে)...




সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft