
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নে গত এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বিষখালী, কাঠিপাড়া ও বলভদ্রপুর গ্রামে দুই শতাধিক নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে রাধা রানী দাস (৪২) নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৃহস্পতিবার আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ. স. ম. মাহাবুবুল আলম। এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল হোসেন মুফতিসহ ১০ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম তাঁর সঙ্গে ছিলেন। এর আগে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও এলাকা পরিদর্শন করেন।
সরেজমিনে জানা গেছে, বনগ্রাম ইউনিয়নের বিষখালী, কাঠিপাড়া ও বলভদ্রপুর গ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশেষ করে বিষখালী গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই দুই থেকে তিনজন করে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্তরা পিরোজপুর জেলা সদর হাসপাতাল, বাগেরহাট সদর হাসপাতাল, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অনেকেই আবার বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা গ্রহণ করছেন।
সোমবার দুপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেবাশীষ দাসের স্ত্রী রাধা রানী দাস (৪২) মারা যান। একই গ্রামের আশীষ কৈবর্ত্য, মিলন কৈবর্ত্য, দীপঙ্কর কুণ্ড, সীতা রানী দাস, আরাধন চক্রবর্তী, উজ্জ্বল চক্রবর্তী, শিপন কৈবর্ত্য, বিপুল কৈবর্ত্য ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যসহ অনেকে বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্কুলশিক্ষার্থী অন্তি দাস, শায়ন্তিকা কৈবর্ত্যসহ প্রায় প্রতিটি পরিবার থেকেই একজন বা একাধিক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবারও অন্তু দাস, বিশ্বজিৎ দাস, স্বর্ণা দাসসহ কয়েকজন চিকিৎসার জন্য খুলনায় গেছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সাধন কুমার চক্রবর্তী এবং আক্রান্তদের স্বজন মনি শংকর দাস, দেবাশীষ দাস, অনাদি দাস ও বৃষ্টি কৈবর্ত্য জানান, প্রথমদিকে কয়েকজনের জ্বর, বমি ও মাথাব্যথার উপসর্গ দেখা দিলে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে দ্রুত গ্রামজুড়ে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দূরে হওয়ায় অনেকেই প্রথমে পিরোজপুর ও বাগেরহাট সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অবস্থার অবনতি হলে তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে ওই গ্রামের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী খুলনায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় খাল খননের পর বিভিন্ন স্থানে পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে মশার প্রজনন বেড়ে যাওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপও বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা মশক নিধনে স্প্রে কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং মেডিকেল টিমের মাধ্যমে এলাকায় ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল হোসেন মুফতি বলেন, বিষখালী গ্রামে ডেঙ্গুর বিস্তারের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে মেডিকেল টিম আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছে। তাঁর নির্দেশনায় এলাকাভিত্তিক মেডিকেল টিম গঠন করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বলেন, বনগ্রাম ইউনিয়নে ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জেলা প্রশাসকসহ তিনি নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আক্রান্ত এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শনিবার থেকে ফগার মেশিনের মাধ্যমে মশক নিধন কার্যক্রম শুরু হবে এবং উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে এ অভিযান চলমান থাকবে।
সিভিল সার্জন ডা. আ. স. ম. মাহাবুবুল আলম বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল টিম স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে একটি বিশেষ টিম মাঠে কাজ করবে। এছাড়া মশক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদারে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।ৃ
মন্তব্য করুন