
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডে প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রোববার (৭ জুন) সকাল ১১টা ৩৫ মিনিটে বহুল আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন।
দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এ ঘটনায় গত ১৯ মে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা নিজ বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। ঘটনার পরপরই সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে।
হত্যাকাণ্ডের দিনই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও হেফাজতে নেওয়া হয়।
পরদিন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানাকে প্রধান আসামি এবং স্বপ্না আক্তারসহ কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় মামলা রুজু করা হয়।
তদন্ত চলাকালে ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছে।
দ্রুত তদন্ত শেষে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। এতে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
আদালত ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। পরদিন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ভুক্তভোগীর বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।
৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। স্বপ্না আক্তারও নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পরবর্তীতে ৪ জুন যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক প্রমাণ এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দাবি করে।
বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানান।
মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্কসহ পুরো বিচারিক কার্যক্রম মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে শেষ হয়, যা দেশের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দ্রুততম বিচার প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রায়ের আগে এক গোলটেবিল বৈঠকে রামিসার বাবা বলেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানের হত্যার বিচার চান না; বরং এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা চান যেখানে আর কোনো শিশুকে এ ধরনের নির্মম ঘটনার শিকার হতে হবে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ রায়ের মাধ্যমে শুধু আসামিদের আইনগত পরিণতিই নির্ধারিত হয়নি, বরং শিশু নির্যাতন ও নারী-শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় বিচারব্যবস্থার কঠোর অবস্থানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়।
পরে রামিসার মা মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খোঁজ করতে গিয়ে আসামিদের কক্ষের সামনে তার জুতা দেখতে পান। ডাকাডাকির পর কোনো সাড়া না পেয়ে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই ঘটনায় ২০ মে রামিসার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। সেই মামলার রায়েই আদালত আজ দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন।
মন্তব্য করুন