শিরোনাম: প্লে-অফে মুম্বাই       জুভেন্টাসকে হারালো বার্সা       বিষমুক্ত সবজি চাষের মডেল যশোরের লেবুতলা       যশোরে ৫৩ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ       এবার রায়পুর কলেজের প্রভাষক অমলেন্দুকে স্থায়ী বরখাস্তের আবেদন       নয়ন হত্যা মামলার আসামিদের হুমকিতে শঙ্কায় বাদীর পরিবার       ইডা কোন নিয়ম কওদিনি বাপু!       মুজিব সড়কে সন্ত্রাসীদের হামলায় দু’ ভাই আহত       এহসান এসের বিরুদ্ধে আরও দু’ মামলা       যশোরে ইজিবাইক ও রিকশা চুরির ঘটনায় মামলা      
অনধিকারের অচলায়তনে বন্দী নারী
মাহমুদা রিনি :
Published : Sunday, 6 September, 2020 at 12:18 AM

অনধিকারের অচলায়তনে বন্দী নারী মেয়েটি কোন প্রতিকার চায়নি। আমাকে শুভাকাঙ্খী মনে করে তার গল্প বলেছিল। সে হয়তো বুঝেছে এইসব ঘটনার কোন প্রতিকার হয় না। নারীর জন্য সমাজে চলমান নিত্য- নৈমিত্তিক ব্যাপার এসব। প্রতিকার চাইলে হয়তো সামান্য কিছু এদিক ওদিক হতে পারে। কিন্তু মূল সমস্যার অচলায়তন অনেক গভীরে। এগুলো জীবন থেকে নেয়া গল্প। সাদামাটা সাধারণ জীবনের নির্যাস মাত্র। এরকম গল্পের কোন স্থান-কাল-পাত্রও হয় না। এ গল্প ছড়িয়ে আছে দেশের আনাচ-কানাচে সর্বত্র।
মেয়েটি শ্যামবর্ণ, ছিপছিপে গড়নের বেশ মিষ্টি দেখতে। বছর সাতেক হলো বিয়ে হয়েছে। হিন্দু পরিবারের বউ। পাঁচ বছরের একটি কন্যাসন্তানও আছে। বিয়ের পর থেকেই মেয়েটি জেনে আসছে তার স্বামীর অন্য এক মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে এবং তার প্রমাণ সে প্রতিদিনই পায়। শ্বশুর শাশুড়ী, দেবর সবাই মোটামুটি ভালো, কিন্তু বরের সাথে কথা বলতে গেলেই মার খেতে হয়। তবুও মেয়েটি উদয়াস্ত পরিশ্রম করে সংসারে টিকে আছে। এইরকম সময়ে মেয়েটির মনে চিন্তা আসে যে ওর একটি মাত্র কন্যা সন্তান। এখানে উল্লেখ্য যে হিন্দু ঘরের নারীদের ছেলে সন্তান না থেকে শুধু কন্যা থাকা নিঃসন্তান থাকার চেয়েও অধিক বিড়ম্বনার। কারণ হিন্দু নারী পিতৃগৃহে বা স্বামী গৃহে উত্তরাধিকার বা অধিকার সুত্রে কোন সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। মেয়েটি সিদ্ধান্ত নেয় সে আরেকটি সন্তান নেবে। যদি একটা পুত্রধন হয় তাহলে তার বদৌলতে মেয়েটি এবং ওর কন্যাটিও এজন্মের মতো ভবতরী পার হতে পারে। যাইহোক স্বামীর বিনা অনুমতিতে সে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি থেকে বিরত থাকে এবং গর্ভধারণ করে। এই হলো মেয়েটির অপরাধ। শ্বশুর শাশুড়ী ভালোভাবে নিলেও স্বামী কোনভাবেই এটা মনে নিতে পারে না। কারণ বউয়ের সাথে যে ভালো সম্পর্ক সেটা বাইরে প্রকাশ হয়ে যাবে। প্রেমিকা জেনে গেলে নাখোশ হবে। তাই যেকোন ভাবে বাচ্চাটিকে নষ্ট করে ফেলতে হবে। সেভাবেই মেয়েটির উপর চরম অত্যাচার করে। মেয়েটির জীবন সংশয় হবার উপক্রম হয়। এইসময় মেয়েটির বাবা-মা আইনের সাহায্য নিতে চাওয়ায় এবং পরিবারের অন্য সকলে ভয়ভীতি দেখানোর ফলে পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়। এখন মেয়েটি ও তার গর্ভের সন্তান মোটামুটি ভালো আছে। এই ঘটনার কয়েকদিন পরে আমার সাথে মেয়েটির কথা হয়। আমি খুব মন দিয়ে শুনি ওর কথা। কারণ ও হয়তো শুধু এই কথাগুলো কারো সাথে শেয়ার করে একটু শান্তি পেতে চেয়েছে এবং বার বার বলেছে, একটু আশীর্বাদ করবেন আমার যেন আমার একটা ছেলে সন্তান হয়। কাওকে ওর কথা বলতে পারার মধ্যে এই আশীর্বাদ টুকুই ওর চাওয়া। আমি জিজ্ঞাসা করেছি, তুমি যখন প্রথম থেকেই জানো তোমার স্বামীর অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্ক, তখন প্রথম দিকেই চলে গেলে না কেন? তোমার বাবা-মা আছেন, তুমি একটাই মেয়ে। মোটামুটি লেখাপড়াও জানো। তাহলে সব জেনেশুনে এখানে থেকে গেলে কেন? মেয়েটি যে উত্তর দিল সেটাই আমি জানাতে চেয়েছি সমাজ, সরকার, দেশের নীতি নির্ধারকদের।
এতখানি লেখার সেটাই আসল কারণ। মেয়েটি বললো আমার বাবা-মা নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের। আমাকে আই.এ. পাশ করিয়েছেন। আমার ভাই টা লেখাপড়া করছে, তারও অনেক খরচ। আমার বিয়ের সময় চার লাখ টাকা নগদ যৌতুক দিয়েছেন। সোনার গহনা দিয়েছেন আরো দুই লাখ টাকার। অন্যান্য খরচ তো আছেই। আমার বাবা-মায়ের তো আর কিছু করার সামর্থ্য নেই। আমি কি করে তাদের কাছে ফিরে যাই! হিন্দু ঘরের মেয়ে জানেন তো একবার বিয়ে হয়ে গেলে স্বামীর ঘরই শেষ আশ্রয়, বাবার ঘরে ফিরে যাওয়ার মুখ আর থাকে না। আমি জানতে চাইলাম, যে চার লাখ টাকা তোমার বিয়েতে তোমার বাবা-মা দিলেন সেই টাকাটা কোথায়? তখন মেয়েটি বললো সেই টাকা দিয়ে ওর স্বামী তার নিজের নামে জমি কিনেছে। এমন ঘটনা শুধু হিন্দু নারীদের ক্ষেত্রেই যে ঘটে তা নয়। অসংখ্য মুসলিম মেয়ের সাথেও এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটছে হরহামেশাই। কিন্তু মুসলিম মেয়েদের ক্ষেত্রে তবু দিনশেষে কিছুটা হলেও পায়ের তলায় মাটির একটু ঠাই তারা পায়। ঠিক একই অবস্থায় হিন্দু ধর্মের মেয়েরা অনেকখানি পিছিয়ে আছে। তারা পিতা, স্বামী, পুত্রের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
এই কয়েক দিন আগে পর্যন্তও যত অবস্থাপন্ন ধনী পরিবারের গৃহিণী হোক না কেন যদি কোন কারণে স্বামীর অকালমৃত্যু হয় আর যদি পুত্র সন্তান না থেকে শুধু কন্যা সন্তান থাকে তাহলে তো কথায় নেই! রাতারাতি রাজরানী থেকে নিঃস্ব আশ্রয়হীন বা পরনির্ভরশীল আশ্রিতা বনে যেতে হয়। এমনকি বাবার উপার্জিত বা সঞ্চিত অর্থও কন্যা ভোগ করতে পারে না। এখন অবশ্য স্ত্রী এবং কন্যা যদি অবিবাহিতা থাকে তাহলে কিছু সম্পত্তি ভরণপোষণ বাবদ জীবনস্বত্ব হিসাবে ভোগ করতে পারে। এমনকি যদি স্বামীর আর কোন ওয়ারিশ না থাকে তবুও কন্যা সম্পত্তির মালিক হতে পারবে না। কন্যার ঘরের পুত্র সন্তান ঐ সম্পত্তির ওয়ারিশ হবে। যে কারণে পরিবারে পুত্র সন্তান থাকা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।
যাইহোক এসব নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করলে হয়তো লেখা আরো জটিল হয়ে উঠবে সেটি আমার কাম্য নয়। এ ধরনের ঘটনা নতুন কোন বিষয় নয়। আমাদের সমাজে আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। হিন্দু- মুসলমান ধর্মাধর্ম নিয়ে কোন আলোচনা করতেও আমি চাইছি না। আমি শুধু নারীদের অসহায়ত্বের কথা বলতে চাইছি। মানুষ হিসেবে সমমর্যাদা বা অধিকার নিয়ে কথা বলাই আমার উদ্দেশ্য। হিন্দু ধর্মের পুরোধা বা ধর্ম বিশারদগন যে সময়ে এই নীতিনির্ধারণী নিয়ম চালু করেছিলেন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে হয়তো তার যথেষ্ট কারণ ছিল। ভূসম্পত্তি গোত্র বা গোষ্ঠীর বাইরে না যাওয়াই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করা হতো। এক্ষেত্রে ভূসম্পত্তি কে একটি বৃক্ষ যদি মনে করা হয় তাহলে তার ডালপালা যতই বিস্তার লাভ করুক না কেন বৃক্ষটি এক কান্ড বিশিষ্টই থাকে। কন্যা সন্তান গোত্রের বাইরে বা গোত্রান্তর হওয়ার কারণে কন্যাকে সম্পত্তি দিলে সম্পত্তিও অন্য গোত্রে চলে যাবে। সেক্ষেত্রে গহনাদি বা নগদ অর্থ কন্যার জন্য বরাদ্দ করা হতো যাকে স্ত্রী ধন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিষয়টি এভাবে চিন্তা করেই হয়তো এই নিয়মের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে পুরো পৃথিবী জুড়েই আর্থসামাজিক পরিবেশ অনেকখানিই পরিবর্তন হয়েছে। যৌথ পরিবার গুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। পরিবারে সন্তানের সংখ্যাধিক্যও কমে এসেছে।
যৌথ পরিবার গুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। পরিবারে সন্তানের সংখ্যাধিক্যও কমে এসেছে। একসময়ের সহমরণ, বিধবা বিবাহের বৈপরীত্যের মতো কঠিন নিয়মও ভেঙে ভেসে গিয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও মেয়েদের সম্পত্তিতে অধিকার ও বিবাহ রেজিষ্ট্রেশন আইন পাশ হয়েছে। শুধুমাত্র আমাদের দেশের অভাগী মেয়েরা আজো সেই মান্ধাতার আমলের নিয়মে বাধা পড়ে আছে। হিন্দু নারীদের সম্পত্তিতে অধিকারের বিপক্ষেও অনেক যুক্তি আছে। তারা হয়তো প্রহসনের শিকার হতে পারে। এদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কম হওয়ায় অথবা মেয়েরা নিজের সম্পত্তি রক্ষা করতে পারার মত যোগ্য হয়ে উঠেছে কিনা সেটাও হয়তো বিবেচ্য বিষয় হতে পারে। তাদের ধর্মান্তরিত করে সম্পত্তি হাতিয়ে নেয়ার চক্রান্তও হতে পারে ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় নিয়ে চিন্তা করেই হয়তো এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারছেন না সমাজ বা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা। কিন্তু আমরা সাধারণ অবস্থা থেকে যতটুকু বুঝি, সন্তান পিতামাতার অবর্তমানে সম্পত্তির অধিকার পায়। সেক্ষেত্রে এসব যুক্তি কতটুকু প্রযোজ্য তা ভাববার বিষয়। আর ধর্মান্তরিত হলে সম্পত্তি পাবে না সহায়ক হিসাবে এমন দাবিও আসতে পারে। যদি আশঙ্কা অনুযায়ী এমন কোন ঘটনা ঘটে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নতুন করে ভাবতে হবে। সর্বোপরি মাথা দরজায় ঠেকতে পারে ভেবে মাথা কেটে ফেলাই একমাত্র সমাধান নয়। তারপরও দু’একটা ঘটনা যদি ঘটেও তার জন্য আপামর নারী সমাজের চিরন্তন দুর্ভোগ সমর্থন করা যায় না।
বিধবাবিবাহ আইন পাশের আগেও এমন অসংখ্য পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি উত্থাপিত হয়েছিল। সর্বশেষ বিধবা বিবাহ সমাজের জন্য সুফলই বয়ে এনেছে। সম্প্রতি বিধবা নারী স্বামীর সম্পত্তির অংশ পাবে এই মর্মে একটি রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। তার বাস্তবায়ন হতে এখনো অনেক পথ বাকি। আমরা সর্বান্তকরণে চাইছি এটি আইন হিসাবে সংসদে পাস হোক এবং সঠিকভাবে সমাজে বাস্তবায়ন হোক। এই রায়টি নারীর অধিকার আদায়ে একটি ধাপ মাত্র। এখনো অনেক পথ যেতে বাকি। আগামী দিনে নারী নিজেই স্বাবলম্বী হোক, পিতা, স্বামী সন্তান কারো মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজের দায়িত্ব নিজেই বুঝে নিক তেমনটাই আশা এবং শুভকামনা রইলো নারী সমাজের প্রতি। নারীর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বা পুরুষের সমমর্যাদায় এগিয়ে চলার যুদ্ধে সহায়ক শক্তি হিসেবে সমাজ, সরকার, রাষ্ট্র সর্বোপরি আপামর জনসাধারণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানাই।









« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft