মতামত
শিরোনাম: কেশবপুরে আ’লীগের ৮ ও বিএনপির ৪ কাউন্সিলর       ইউপি নির্বাচনে যাবে না বিএনপি       ধুলিয়ানী ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমানের ইন্তেকাল       নড়াইলের প্রথম নারী মেয়র আঞ্জুমান আরার দায়িত্ব গ্রহণ        ভোট কেন্দ্রে সমর্থকের কান্ড       যশোর পৌরসভায় নৌকার পক্ষে প্রচারণা       পুলিশি ধাওয়া খেয়ে আসামি পুকুরে লাফ দিয়ে অজ্ঞান        হাত তোলা থেকে ইভিএম-সব আমলেই ভোট দিলেন তারা        কেশবপুরে দ্বিতীয়বার মেয়র হলেন রফিকুল       যশোরে একদিনে তিন হাজার মানুষের টিকা গ্রহণ      
জননন্দিত খালেদুর রহমান টিটো
গগণ হরকরা
Published : Friday, 22 January, 2021 at 12:13 AM, Count : 261
জননন্দিত খালেদুর রহমান টিটোদেশজুড়ে খুঁজে দেখলে হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন নেতা পাওয়া যাবে যারা নিজেদের ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্বগুণ, জনহিতকর কর্মকান্ড, দেশসেবার মাধ্যমে মানুষের কাছে নিজেদেরকে যথার্থ জননেতায় পরিণত করতে পেরেছেন। আমার প্রাণের শহর যশোরে যুগে যুগে আক্ষরিক অর্থে যে কজন জননেতা আবির্ভূত হয়েছেন তাদেরই একজনকে গত এগারোই জানুয়ারি অন্তিম শয়নে শায়িত করে এসেছি আমরা। তিনি যশোরের আপামর জনগণের প্রাণের মানুষ, যশোরবাসীর হৃদস্পন্দন জাগানো কণ্ঠস্বর, জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত খালেদুর রহমান টিটো। এখনকার দিনে তিনিই সম্ভবত সেইসব গুটিকয়েক রাজনীতিকদের মধ্যে একজন যার নামের আগে যতই বিশেষণ যোগ করি, অত্যুক্তি করা হবেনা। যশোরবাসীর আরও দুজন প্রাণের মানুষ মরহুম জননেতা আলী রেজা রাজু ও মরহুম জননেতা তরিকুল ইসলামকে হারাবার পর যার মুখ চেয়ে যশোরবাসী দিন অতিবাহিত করতো, সেই শেষ রত্নটিকেও কারবালায় শায়িত করে এসে আমরা অতল শোকে মুহ্যমান। সপ্তাহকাল অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও শোক বাঁধ মানছে না।
একজন নেতার মাঝে যেসব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন, টিটো সাহেবকে তার কোনোটি দিতেই স্রষ্টা কার্পণ্য বোধ করেননি। সদা হাস্যজ্বল মুখ, সুঠাম শারীরিক গড়ন, হৃদয় আলোড়নকারী কণ্ঠস্বর, অসাধারণ বাগ্মীতা সব কিছু মিলিয়েই পরিপূর্ণ একজন নেতা ছিলেন তিনি। সর্বস্তরের কর্মীদেরকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে জানতেন তিনি। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতির ধারক। বর্তমানের অসুস্থ রাজনীতিতে প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, দমন, নিপীড়ন এসব নিন্দনীয় আচরণগুলোর কোনোটিই টিটো সাহেবের ডিকশনারিতে ছিলোনা। তিনি কখনোই কাউকে প্রতিপক্ষ ভাবতেন না, প্রতিটি মানুষকেই তিনি আপন ভাবতেন। সকল মতের মানুষকে সাথে নিয়ে কিভাবে চলতে হয়, তার অনন্য উদাহরণ ছিলেন খালেদুর রহমান টিটো। এভাবেই কালের পরিক্রমায় তিনি নিজেই পরিণত হয়েছিলেন একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। দল মতের উর্ধ্বে উঠে সকলের কাছে তিনি পরিণত হয়েছিলেন রাজনৈতিক অভিভাবকে। নিজেকে জাহির করবার জন্য বিলবোর্ড রাজনীতি করবার প্রয়োজন ছিলোনা তার, কেননা বিলবোর্ডে নিজের ছবি লাগিয়ে অন্যরা যখন যশোরবাসীকে নিজের মুখ চেনাতে ব্যস্ত, টিটো সাহেব ততদিনে এই যশোরের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তিনি ছিলেন ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। যশোরের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিতকরণে তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর।
খালেদুর রহমান টিটো- একটি আবেগের নাম, ভালোবাসার নাম, হৃদয়ের স্পন্দন। কারো কাছে তিনি রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু, কারো কাছে তিনি রাজনৈতিক সহকর্মী টিটো ভাই, কারো কাছে পিতৃসম টিটো চাচা, আবার অগণিত মানুষের কাছে তিনি শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় মিশে থাকা টিটো সাহেব। তিনি ছিলেন একজন ফুলটাইম পলিটিশিয়ান। অসংখ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রাজনীতির হাতেখড়ি হয়েছে তাঁরই হাত ধরে। এই শহরের মানুষদের তিনি আত্মার আত্মীয় মনে করতেন। পরম মমতায় বুকে টেনে নিতে পারতেন সবাইকে। রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের আজকের এই কলিযুগে যখন একজন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরও পাইক-পেয়াদা-সৈন্য-সামন্ত না নিয়ে রাস্তায় নামতে ভয় পান, সেখানে সাংসদ থাকা অবস্থায়ও পায়ে হেঁটে, রিকশায় চড়ে শহরে ঘুরে বেড়ানো টিটো সাহেব ছিলেন অনন্য একজন ব্যক্তি। প্রায়ই বিকেলে দেখা যেত শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। যে এলাকাতেই যেতেন সেখানকার মানুষের খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করতেন। অসুস্থ নেতাকর্মীকে দেখতে যাওয়া, প্রবীণদের খোঁজখবর নেয়া, দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়া মানুষের জানাজায় অংশ নেয়া-এসবই ছিলো তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সাংসদ থাকা অবস্থায়ও প্রায়ই তিনি পায়ে হেঁটে কারবালায় আসতেন; নামাজ আদায় ও আপনজনদের কবর জিয়ারত শেষে রিকশায় করে বাড়ি ফিরতেন। সব বয়সের, সব শ্রেণী-পেশার, সব ধর্মের, সব দলের মানুষের সাথে তিনি কি দারুণভাবে, নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে মিশতে পারতেন- ভাবতেই অবাক লাগে!
এখনকার দিনে একজন সরকারদলীয় পাতিনেতারও অর্থবিত্তের তল যেখানে খুঁজে পাওয়া যায়না, সেখানে সাবেক মন্ত্রী এবং সরকার দলীয় সাংসদ হয়েও টিটো সাহেব সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। সাংসদ থাকা আর না থাকা- তাঁর এই দুই জীবনযাপনের মাঝে কোনো তফাতই ছিলোনা। বাস করতেন ষষ্ঠীতলার পৈত্রিক বাড়িতে। তাঁর বাড়ির নীচতলার বারান্দাটি ছিলো মানুষের কাছে খুব আপন জায়গা। একজন নেতার কাছে সাধারণ মানুষ সবার প্রথমেই যে জিনিসটি চায় তা হলো সুখে দুঃখে নেতার সংস্পর্শ। টিটো সাহেব কখনই জনগণকে তাঁর সংস্পর্শে আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেননি। সাংসদ খালেদুর রহমান টিটোর কাছে সরাসরি যাওয়ার পথটি যতটা সহজগম্য ছিলো এখনকার সাংসদরা তো দূরে থাক, অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতাদের কাছেও তা কি কল্পনাও করা যায়? সম্ভবত তিনিই ছিলেন যশোরের জীবিত শেষ রাজনীতিবিদ যার কাছে মানুষ প্রাণখুলে মনের কথা বলে হৃদয় হালকা করে ঘরে ফিরতে পারতো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে যখন তাঁর কাছে গিয়েছিলাম- বলেছিলেন, “এখন সরকারি চাকরীতে অসৎপথে প্রবেশের রমরমা সময় চলছে। কখনো অসদুপায়ে চাকরীতে প্রবেশের চেষ্টা করবেনা, সারাজীবন আত্মগ্লানিতে পুড়ে মরবে”। সততার কি দারুণ দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি! শেষ যেদিন তাঁর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো, সেদিনের কথাগুলো দারুণভাবে নাড়িয়ে দেয়। সারাজীবন তাঁর বাড়ির বারান্দা দিনরাত সাক্ষাৎপ্রার্থী নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভীড়ে গমগম করতো। জীবনের পড়ন্তবেলায় এসে সেই গমগমে ভাবে বেশ ভাটা পড়েছিলো। এই শূন্যতা হয়তো নির্মমভাবে আঘাত করতো তাঁকে। ভীষণ আক্ষেপ নিয়ে সেদিন আমাকে বলেছিলেন, “আমাদের সমাজের মানুষ খুব ক্ষমতার কদর করতে শিখেছে। যতক্ষণ তুমি ক্ষমতায় আছো, ততক্ষণ  তোমার চারপাশে মানুষের ভীড় আছে”। এরপর নিজের শূন্য বারান্দার দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে বলেছিলেন, “আর যখন তোমার ক্ষমতা নেই, আমার মতো ঘর শূন্য হয়ে যাবে”।
খালেদুর রহমান টিটো ছিলেন সুস্থধারার রাজনীতির একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; তাঁর ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, মানবিক গুণাবলী ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন পদ্ধতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে অণুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাঁর এই মহাপ্রয়াণে পর্বতের মতো মহৎ ব্যক্তিত্ব, সাগরের মতো বিশাল হৃদয়ের অধিকারী, মানবিক গুণাবলীতে পরিপূর্ণ, জনহিতৈষী রাজনীতিবীদকে হারালাম আমরা। জীবদ্দশায় এই অঞ্চলের আনাচে কানাচে তিনি জনতার মাঝে মায়া ছড়িয়েছেন। ভালোবাসার জালে বন্দী করেছেন অসংখ্য মানুষকে। ভালবাসার সওদাগর ছিলেন তিনি। তাঁর শেষযাত্রায় অগণিত মানুষের অশ্রুসিক্ত নয়নে অংশগ্রহণই  সেটা প্রমাণ করেছে।





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft