মতামত
শিরোনাম: বোয়ালমারীতে নিখোঁজ মাদ্রাসা ছাত্রের লাশ উদ্ধার       চট্টগ্রাম নগরীতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে ৪ দোকান       সোমবার থেকে যেসব মোবাইল বন্ধ হয়ে যাবে        রাণীনগরে ইয়াবাসহ গ্রেফতার-২       বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে দেশে বিরাজনীতিকরণ চলছে : জিএম কাদের       আবদুল গাফফার চৌধুরী হাসপাতালে ভর্তি       গুগল ও অ্যাপল ৮ লক্ষাধিক অ্যাপ সরিয়েছে       ফাইজারের আরও ২৫ লাখ টিকা কাল আসছে        চার অপহরণকারীকে মেরে জনসমক্ষে ঝোলাল তালেবান       মিরসরাইয়ে ১মাস ধরে নিখোঁজ মা-ছেলে      
নুরজাহান ইসলাম নীরাকে স্মরণ
২০ বছরের স্মৃতি ভিজিয়ে দিচ্ছে চোখের পাতা
আনোয়ার হোসেন বিপুল
Published : Friday, 11 June, 2021 at 10:00 PM, Count : 1535
২০ বছরের স্মৃতি ভিজিয়ে দিচ্ছে চোখের পাতা বড্ড অসময়ে চলে গেলেন নুরজাহান ইসলাম নীরা আপা। ঘটনার দুই দিন আগেও উপজেলা পরিষদে এক সাথে মিটিং করেছি। এখন সময়ে-অসময়ে তার সাথে আমার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক নানা স্মৃতি আমাকে তাড়া করছে। মাঝে মধ্যে আনমনা হয়ে পড়ছি; ভিজে যাচ্ছে চোখের পাতা। তার সাথে ২০ বছরের স্মৃতি আমাকে অস্থির করে তুলছে।
একই আদর্শের রাজনীতি করার কারণে শুধু নয়, নীরা আপা ছিলেন আমার আত্মার আত্মীয়। কখনো ছোট ভাইয়ের মতো শাসন করেছেন, কখনো মাথায় হাত বুলিয়েছেন পরম মমতায়। আবার কখনো উপদেশ দিয়েছেন অধিকারের অভিভাবক হিসেবে। আমার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন ও এরিনকে বিয়ে করার বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন সরাসরি।
নীরা আপা ছিলেন যশোরের সত্যিকার অর্থে গণমানুষের নেত্রী। নব্বইয়ের দশকে তিনি যশোর পৌরসভায় পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাঠের নেত্রী হিসেবে তাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। ঠিক মনে করতে না পারলেও সম্ভবত ২০০১-০২ সাল হবে। আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে। সরকার বিরোধী কর্মসূচিতে রাজপথ প্রকম্পিত করতেন নীরা আপা। আমি তখন বয়সে নবীন হলেও বড় ভাই ছাত্রলীগনেতা কামাল হোসেন পলাশের সাথে মিছিলে যেতাম। ওই সময় দড়াটানায় এক মিছিলে পুলিশ আমাদের উপর হামলা করে। পুলিশী হামলার মধ্যেও আমি শ্লোগান অব্যাহত রাখি। বিষয়টি নজরে আসে নীরা আপার। তিনি বড় ভাই পলাশকে বলেন, ‘পলাশ তোর ভাই বিপুলকে নিয়ে আমার সাথে দেখা করিস।’ পরদিন সকালে পলাশ ভাই আমাকে নিয়ে নীরা আপার বাসায় যান। আজও চোখ বন্ধ করলে স্পষ্ট শুনতে পাই ‘তুই পারবি, রাজনীতি তোকে করতেই হবে।’ দেখতে পাই সামনে বসিয়ে এক হাত মাথায় রেখে অন্য হাতে আমার মুখে পাকা পেপে তুলে দিচ্ছেন।
এক পর্যায়ে আমি যশোর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাই। আমার এই সাফল্যে যারা বেশি খুশি হয়েছিলেন তাদের মধ্য অন্যতম নীরা আপা। নীরা আপা ছিলেন সত্যিকার অর্থে মাদকবিরোধী। তিনি মাদককে অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। আমাকে তিনি শুরু থেকে মাদকের সাথে সম্পর্ক আছে এমন কাউকে বন্ধু হিসেবে নির্বাচন না করার পরামর্শ দিতেন। আমি তার নির্দেশ মেনে মাদক তো দূরের কথা, কখনো সিগারেট হাতে নিয়েও দেখিনি। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তিনি আমাকে ডেকে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কথা বলেন। নীরা আপার সেই নির্দেশ আজও আমি মেনে চলছি। আপা আপনি আজ নেই। কিন্তু উপর থেকে দেখুন আপনার বিপুল আজও আপনার উপদেশ-নির্দেশ মেনে চলছে।
স্মরণে আসছে, সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনে নীরা আপার দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি। তিনি তখন ঢাকায়। মানবতার মা, জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনা ৪০ বছরের রাজপথের নেত্রী নীরা আপাকে মূল্যায়িত করলেন। বিষয়টি ঘোষণা হলে আমি তাকে ফোন করি। তিনি সরাসরি আমার ঢাকার বাসায় চলে আসেন। দুই ভাই-বোন মিলে মিষ্টি খাই। পরে তিনি যশোরে আসেন। কিন্তু আসলে ঘটে এক ‘কলঙ্কিত’ ঘটনা। গ্রুপ রাজনীতির হীনমানসিকতার শিকার হন আমার বড় বোন নীরা। তাকে যশোর বিমানবন্দর থেকে ইজিবাইকে চড়ে শহরে আসতে হয়। যেখানে নেতা-পাতিনেতাদের জন্য বড় বড় রিসিপশনের ব্যবস্থা হয়, সেখানে নীরা আপাকে একা ইজিবাইকে করে ফিরতে হলো। দৃশ্যটি আজও চোখের সামনে ভেসে উঠলে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়।
নীরা আপা ছিলেন দৃঢ়চেতা, অনুগত নেতৃত্ব। ওয়ান ইলেভেনের সরকার ক্ষমতায় আসলে অনেকে নিজের ভোল পাল্টে স্বৈরাচারের পক্ষ নেন। অনেকে আবার পিঠ বাঁচাতে মিরজাফরের ভূমিকায় নামেন। তবে নীরা আপা মফস্বল শহরে থেকেও নেত্রীর প্রতি অনুগত ও দৃঢ়তার পরিচয় দেন। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গণতন্ত্রের মানসকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে আটক করে সেনা সমর্থিত অবৈধ সরকার। সারাদেশে তৈরি হয় গুমট পরিস্থিতি। আমাদের কী করা উচিত বুঝতে পারছি না। তবে কোন কিছু না ভেবেই ছাত্রলীগের ২৪ জন নেতাকর্মীকে নিয়ে আমি শহরে মিছিল বের করি। সেই মিছিল ছিলো নেত্রীকে আটকের প্রতিবাদে যশোরে প্রথম মিছিল। পরদিন সন্ধ্যায় দেখা হয় নীরা আপার সাথে। তিনি আমার টগবগে রক্তকে উসকে দেন। বলেছিলেন, ‘সুসময়ে অনেকে আসে। কঠিন সময়ে রাজপথে থাকার নাম রাজনীতি। নেত্রীকে ভালবাসার প্রমাণ দেয়ার এখনই সময়।’
২০১৯ সাল। নীরা আপা ও আমি এক সাথে সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। আমরা ছিলাম একই প্যানেলে। কিন্তু সেই নির্বাচনে আমাদের অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। ৩১ মার্চ নির্বাচন। এক সাথে পুরো উপজেলা চষে বেড়াচ্ছি। নির্বাচনের দিন সাতেক আগে এক রাতে নীরা আপা আমাকে ফোন করেন। ‘সারাজীবন ওদের জন্য এতো করলাম; এখন মনে হয় ওরা আমাদের দুইজনকেই হারিয়ে দেবে।’ হতাশা আর কান্না মিশ্রিত কণ্ঠ শুনতে পেলাম নীরা আপার। রাত তখন আড়াইটা। কিছু না ভেবেই ‘আমি বাসায় আসছি’ বলে ফোন রেখে দিলাম। তার বাসায় গিয়ে জানতে পারলাম কর্তৃত্ব খর্ব হওয়ার আশঙ্কায় আমাদের হারিয়ে দিতে কী ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র চলছে। অনেক আলোচনা হলো। সিন্ধান্ত হলো পুরো ছক জানার আগ পর্যন্ত বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি এটা কাউকে বুঝতে দেয়া যাবে না। তিনি বললেন, ‘কর্মীদের উপর আস্থা রাখতে হবে। সেটা ঠিকঠাক করতে পারলেই আমরা জয়ী হবো ইনশাল্লাহ। পাশের কাজীপাড়া জামে মসজিদ থেকে তখন ভেসে আসছে ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’। আপাকে বিদায় জানিয়ে সঙ্গীকে সাথে নিয়ে বের হলাম। পেছন থেকে শুনতে পেলাম ‘বাসায় গিয়ে ফজরের নামাজটা পড়ে ঘুমিয়ে পড়িস।’
৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে নুরজাহান ইসলাম নীরাকে কোন অনিময়, দুর্নীতি স্পর্শ করতে পারেনি। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নীরা আপা যশোর সদরকে স্মার্ট উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। এজন্য তার ছিলো নানামুখী পরিকল্পনা। কিন্তু বড্ড অসময়ে আমাদের রিক্ত করে চলে গেলেন নীরা আপা। এখন নীরা আপার ব্যবহৃত উপজেলা পরিষদের চেয়ার আমার চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। হে পরম করুণাময়, আপনি আমার পরম প্রিয় আপা নুরজাহান ইসলাম নীরাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।
লেখক: চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত), সদর উপজেলা পরিষদ, যশোর।





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »


সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
 আমাদের পথচলা   |    কাগজ পরিবার   |    প্রতিনিধিদের তথ্য   |    অন লাইন প্রতিনিধিদের তথ্য   |    স্মৃতির এ্যালবাম 
সম্পাদক ও প্রকাশক : মবিনুল ইসলাম মবিন
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : আঞ্জুমানারা
পোস্ট অফিসপাড়া, যশোর, বাংলাদেশ।
ফোনঃ ০৪২১ ৬৬৬৪৪, ৬১৮৫৫, ৬২১৪১ বিজ্ঞাপন : ০৪২১ ৬২১৪২ ফ্যাক্স : ০৪২১ ৬৫৫১১, ই-মেইল : [email protected], [email protected]
Design and Developed by i2soft